বাথরুমে কেউ নেই—না বাপি, না রোহন।
সুতরাং বাথরুম সেরে আবার উঠে এলাম দোতলায়। খোলা দরজা দিয়ে উঁকি মারলাম।
ঘরের অবস্থা একইরকম: টিউবলাইট একইভাবে জ্বলছে, সিলিংফ্যানে চলছে, মশারিটাও পড়ে আছে বিছানায়।
বিরক্তির একটা শব্দ করে ঘরের আলো-পাখা নিভিয়ে দিলাম। দরজার পাল্লা টেনে দিয়ে হাঁসকল লাগিয়ে দিলাম আবার।
নিজের ঘরে ফিরে এসে অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে-শুয়ে মশারিটার কথা ভাবতে লাগলাম। কিন্তু কিছুতেই একটা সহজ-স্বাভবিক ব্যাখ্যা দাঁড় করতে পারলাম না।
পরপর তিনদিন—কিংবা বলা ভালো তিনরাত্তির—বেশ নিশ্চিন্তে কাটল। মাঝরাতে উঠে পাশের ঘরের হাঁসকল খুলে দেখেছি কোনও ‘অলৌকিক’ ব্যাপার নেই। জানলা দুটো দিব্যি বন্ধ। এবং মশারিটা ‘ভালো ছেলে’-র মতো টেবিলের ওপরে ভাঁজ করা অবস্থায় ‘শুয়ে’ আছে।
তখন মনে হল, সেদিন রাতে যা দেখেছি সেটা আমার মনের ভুল নয় তো? হয়তো ভাবছিলাম, রোহন কিংবা বাপি হঠাৎ করে কলকাতায় চলে আসতে পারে। মশারিটা টাঙিয়ে দিলে আর ওদের মশার কামড় খেতে হবে না। হয়তো আধোঘুমে এসব নিয়েই স্বপ্ন দেখছিলাম। তারপর স্বপ্নের ঘোরে পাশের ঘরের দরজা খুলে ওসব ভুলভাল জিনিস দেখেছি। হয়তো আমি সে-রাতে ঘোরতর ভাবে ‘ঘুমিয়ে চলা’-র অসুখে পড়েছিলাম।
এসব ভেবে-ভেবে শেষ পর্যন্ত মেনে নিলাম যে, আমি সে-রাতে ভুলই দেখেছি। তাই চারনম্বর রাত্তিরে বেশ নিশ্চিন্ত মনে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম।
কিন্তু সেদিন রাতে যা দেখলাম সেটা বিশ্বাস করা বেশ কঠিন।
বাথরুমে যাওয়ার জন্যে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। করিডরে এসে পাশের ঘরের দরজার সামনে থমকে দাঁড়ালাম। কান পেতে ঠাহর করার চেষ্টা করলাম।
হ্যাঁ—সিলিংফ্যানটা ঘুরছে। পুরোনো পাখার কিচকিচ শব্দ শোনা যাচ্ছে।
তাড়াতাড়ি হাঁসকল খুল দরজার পাল্লা ঠেলে দিলাম ভেতরে।
নীল মশারিটা তক্তপোশে পরিপাটি করে টাঙানো রয়েছে। মশারির ওপাশে জানলা দুটো খোলা। জানলা দিয়ে ঢুকে পড়া বাতাসে এবং সিলিংফ্যানের হাওয়ায় মশারির কাপড় নড়ছে, দুলছে।
দৃশ্যটা দেখামাত্রই আমি সেদিনের মতো হাত বাড়িয়ে সুইচ টিপে দিলাম। দুবার ঝিলিক মেরে টিউবলাইট জ্বলে উঠল।
আর তখনই মনে হল, দরজার হাঁসকল তো বাইরে থেকে বন্ধ ছিল! তা হলে কেউ ভেতরে ঢুকে মশারিই-বা টাঙাল কী করে, আর পাখাই-বা চালাল কী করে?
একটা ঠান্ডা ভয় আমাকে জাপটে ধরল। মনে হল, ঘরের বাতাস কমে গেছে—আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
আলো জ্বালার জন্যে মশারির ভেতরটা দেখা যাচ্ছিল না। তা ছাড়া বাতাসে মশারির কাপড়ে ঢেউ খেলছিল বলে দেখতে আরও অসুবিধে হচ্ছিল।
হঠাৎই আমার মনে হল, মশারির ভেতরে কেউ যেন নড়ছে। কারণ, কোনও শব্দ-টব্দ না হলেও মশারিটা জায়গায়-জায়গায় ফুলে উঠছিল। মানে, কারও মাথা কিংবা হাত-টাতের আদল বোঝা যাচ্ছিল। যেন মশারির ভেতর থেকে কেউ আমাকে ভালো করে দেখার চেষ্টা করছে, অথবা মশারির দেওয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
আমি একেবারে পাথর হয়ে গেলাম। অবাক ভয়ের চোখে সেই অপার্থিব দৃশ্যের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। আমার কপাল থেকে ঘামের ফোঁটা যে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে সেটা অনুভবে টের পেলাম।
হঠাৎ শ্বাস-প্রশ্বাসের ফোঁস-ফোঁস শব্দ কানে এল। শব্দটা এমন, যেন কেউ হাঁপাচ্ছে।
স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, শব্দটা আসছে মশারির ভেতর থেকেই।
কিন্তু কে রয়েছে মশারির ভেতরে? মশারির ভেতর থেকে সে বেরিয়ে আসতে পারছে না কেন?
জানি, অবাস্তব চিন্তা, কিন্তু তবুও—অকূলপাথারে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো—আমি রোহন আর বাপির নাম ধরে ডেকে উঠলাম। কিন্তু যে-কণ্ঠস্বর আমার গলা দিয়ে বেরিয়ে এল সেটা আমার কাছেই অচেনা ঠেকল।
‘রোহন!…বাপি!’
কোনও সাড়া নেই। তবে শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
‘রোহন! রোহন!’ এবারে বেশ জোরে ডেকেছি: ‘বাপি! বাপি!…বাপি!’
কিন্তু এবারেও কোনও সাড়া নেই। শুধু ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস।
গলা পর্যন্ত ভয়ে টইটম্বুর অবস্থাতেও আমার মধ্যে কী করে যেন একটা মরিয়া ঝোঁক ঝলসে উঠল। মনে হল, মশারিটাই আমার চিরশত্রু। ওটাই বড়-বড় নিশ্বাস ফেলছে।
সঙ্গে-সঙ্গে পাগলের মতো ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম মশারিটার ওপরে। পটপট করে মশারি টাঙানোর দুটো দড়ি ছিঁড়ে গেল। আর আমি শূন্য মশারি বুকে নিয়ে তক্তপোশে আছড়ে পড়লাম।
তারপর পাগলের মতো মশারিটাকে হাতড়াতে লাগলাম। কারও অস্তিত্বের খোঁজে চাপড় মেরে থাপড়ে-থাপড়ে দেখতে লাগলাম ওটার নানান জায়গায়।
কিন্তু কোনও লাভ হল না। কেউ নেই।
এক প্রবল আক্রোশে মশারিটা টান মেরে বিছানা থেকে ছাড়িয়ে নিলাম। তারপর দলাপাকানো মশারিটা হাতে নিয়ে শূন্য বিছানার দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
কেউ কোত্থাও নেই।
শুধু আগের দিনের মতো বালিশে কারও মাথার ছাঁচ চোখে পড়ল। নাকে এল ঘামের গন্ধ। আর বিছানায় হাত রেখে মনে হল যেন বাড়তি উষ্ণতা টের পেলাম।
ভয়ে স্পঞ্জের মতো ফোঁপরা হয়ে গেলাম এবং তার ফাঁকফোকরে ঠান্ডা ভয়ের স্রোত ঢুকে গেল।
আমি বিছানায় বসে পড়লাম। বারবার খোলা জানলা আর দরজার দিকে তাকাতে লাগলাম। মনে হচ্ছিল, কেউ বুঝি আমাকে ফাঁকি দিয়ে কোনওরকমে ওই জানলা কিংবা দরজা দিয়ে সটকে পড়েছে—আবার এক্ষুনি হয়তো আচমকা ফিরে আসবে ঘরে।
