এ বাড়ির করিডর বা সিঁড়িতে কোনও আলো নেই। কিন্তু তাতে আমার কোনও অসুবিধে হয় না। রাস্তার লাইট বা অন্যান্য ঘর থেকে ছিটকে আসা আলোয় দিব্যি কাজ চলে যায়। আর আকাশে চাঁদ থাকলে খানিকটা বাড়তি সুবিধে পাওয়া যায়। তা ছাড়া এতবছর এ বাড়িতে থেকে এর করিডর বা সিঁড়ির প্রতিটি ভাঁজ আমার মুখস্থ হয়ে গেছে। তাই রাতে বাথরুমে যাওয়ার সময় কোনওকালেই আমি টর্চ ব্যবহার করি না।
প্রথমে ভাবলাম, চিৎকার করে লোক জড়ো করি। কিন্তু তার পরই মনে হল, এ-পাড়ার চুরি-টুরির সেরকম ট্রাডিশান নেই। শেষে যদি দেখা যায় চোর-টোর কিছু নয়, তা হলে ব্যাপারটা বিতিকিচ্ছিরি হাস্যকর এপিসোড হয়ে দাঁড়াবে। সুতরাং একটিবার দরজার পাশ থেকে উঁকি মেরে দেখি।
পা টিপে-টিপে দরজার খুব কাছে এগিয়ে গেলাম। দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে খোলা পাল্লা দিয়ে উঁকি মারলাম ঘরের ভেতরে। এবং যা দেখলাম তাতে ব্যাপার স্যাপার আমার পছন্দ হল না।
প্রথম কথা, সিলিংফ্যান ঘোরার শব্দ আমি শুনতে পেলাম। আর দেখলাম, ঘরের জানলা দুটো খোলা। খোলা জানলা দিয়ে অন্ধকার গাছের ডালপালা আর খানিকটা আকাশ দেখা যাচ্ছে। বাইরের বাতাসে গাছের পাতা নড়ছে।
অথচ রোজ রাতে আমি ঝড়-বৃষ্টির ভয়ে জানলা দুটো নিজের হাতে ছিটকিনি এঁটে বন্ধ করি। কাল রাতেও করেছি।
জানলা দুটো এমন হাট করে খুলল কে? আশ্চর্য! কোনও চোর নিশ্চয়ই এ কাজ করবে না!
মশারিটা কে যেন দড়ি দিয়ে তক্তাপোশের ওপরে দিব্যি টাঙিয়ে দিয়েছে। আর মশারির ধারগুলো পরিপাটি করে পাতলা তোশকের নীচে গুঁজে দিয়েছে। জানলা দিয়ে ছুটে আসা বাতাস আর সিলিংফ্যানের হাওয়ার মশারির নীল কাপড়ে তিরতিরে ঢেউ খেলে যাচ্ছে।
মশারিটা আমি মোটেই টাঙাইনি। ওটা ভাঁজ করে ঘরের একপাশে দাঁড় করানো একটা ছোট টেবিলে রেখেছিলাম। তা হলে…।
খুব দ্রুত চিন্তা করছিলাম। যুক্তি দিয়ে ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছিলাম। তাতে যেটা মনে হল, নিশ্চয়ই বাপি কিংবা রোহন কাল গভীর রাতে আচমকা এ-বাড়িতে এসে হাজির হয়েছে। নীচের ভাড়াটেরা ওদের চেনে—তাই দোতলায় উঠে আসতে কোনও অসুবিধে হয়নি। তারপর আমাকে অযথা ডেকে ঘুম না ভাঙিয়ে চুপচাপ তক্তপোশে শুয়ে পড়েছে। এবং টেবিলের ওপরে নতুন মশারিটা দেখে বিনা দ্বিধায় সেটা কাজে লাগিয়েছে।
কিন্তু কে এই রাতের কুটুম্ব? বাপি, না রোহন?
এবার ঘরের ভেতরে পা রাখলাম আমি। সুইচ টিপে আলো জ্বালালাম। একইসঙ্গে ডেকে উঠলাম, ‘কে, বাপি?’
কোনও সাড়া নেই।
আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়েই মশারির ভেতরটা দেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আলো জ্বালার ফলে মশারির নীল রঙের ঘন বুনট পেরিয়ে ভেতরটা দেখা যাচ্ছে না। তবে আবছা একটা আভাস মতন পাওয়া যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন মশারির ভেতরে কেউ শুয়ে আছে।
আমি আবার ডেকে উঠলাম, ‘কে, রোহন?’
এবারে আগের চেয়ে জোরে ডেকেছি, কিন্তু তাও কেউ উত্তর দিল না। কিংবা ঘুমের ঘোরে ডাক শুনতে পেল না।
ভৌতিক কিংবা অলৌকিকে আমার ছিটেফোঁটাও বিশ্বাস নেই। অন্তত কোনওকালে ছিল না। কিন্তু এখন যে একটু গা-ছমছম করছিল না তা নয়।
আমি কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম।
খোলা জানলা দিয়ে বাতাস ঢুকছিল। আমগাছের পাতা খসখস শব্দ তুলছিল। আমার মনে হচ্ছিল, মশারিটা যেন একটা প্রাণী—থম মেরে কীসের জন্যে যেন অপেক্ষা করছে।
আমি আবার বাপি আর রোহনের নাম ধরে ডাকলাম। তারপর আর একবার।
মশারি তবুও চুপচাপ। মশার পিনপিন শব্দ কানে এল। আমি একদৃষ্টে মশারিটার দিকে তাকিয়ে। মশারিটাও মনে হল ওর অদৃশ্য চোখ দিয়ে আমাকে দেখছে।
কিছুক্ষণ এভাবে কেটে যাওয়ার পর টের পাচ্ছিলাম, আমার কপাল, গলা, ঘাড় ঘেমে উঠেছে।
আমি টেনশানে আর থাকতে পারলাম না। হঠাৎই দুঃসাহসের একটা ঝটকা খেলে গেল আমার মাথায়। সেই ঝটকায় ক্ষিপ্ত পাগলের মতো ছুটে গেলাম মশারিটার দিকে। হ্যাঁচকা টানে মশারিটা তুলে ধরলাম শূন্যে। টানাহ্যাঁচড়ায় একটা দড়ি পট করে ছিঁড়ে গেল। আর দলাপাকানো মশারিটা খামচে ধরে আমি বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।
কারণ, মশারির ভেতরে কেউ নেই। বিছানা শূন্য!
অবাক চোখে বিছানার দিকে তাকিয়ে যখন এই মাঝরাতের হেঁয়ালির উত্তর ভাবছি, তখন হঠাৎই নাকে একটা গন্ধ পেলাম।
গন্ধটা অনেকটা যেন হালকা ঘামের গন্ধ।
একইসঙ্গে বিছানায় হাত দিয়ে সামান্য উষ্ণতা টের পেলাম। যেন বিছানায় এতক্ষণ ধরে কেউ শুয়ে ছিল—এইমাত্র উঠে চলে গেছে।
মাথার বালিশের দিকে তাকিয়েও যেন মাথার গোল ছাপের একটা আদল চোখে পড়ল। বালিশের কাছে ঝুঁকে পড়ে জোরে শ্বাস টানলাম। নারকোল তেলের গন্ধ নাকে ভেসে এল।
সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কপালে গলায় হাত বুলিয়ে ঘাম মুছলাম।
ভূত-প্রেত কিছুই দেখিনি অথচ তাও আমি এত ভয় পাচ্ছি কেন? হতে তো পারে, রোহন কিংবা বাপি সত্যিই হয়তো এসেছে—তারপর উঠে বাথরুমে গেছে।
নিজেকে ভুল বোঝানোর চেষ্টায় আমার ভেতরে একটা লড়াই চলছিল। বেশ বুঝতে পারছিলাম, যুক্তি ক্রমশ হেরে যাচ্ছে কুসংস্কারের কাছে।
একটু পরে আমি মশারিটা ফেলে দিলাম বিছানায়। মনে সাহস জড়ো করে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলাম। করিডর ধরে এগোলাম বাথরুমের দিকে।
কিন্তু যা আন্দাজ করছিলাম তাই।
