কী—কী?—প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন নীতিশ।
দু-নম্বর সমাধানটা হল, আপনার এবং আপনার স্ত্রীর আঙুলের ছাপ একেবারে সেম। নয়তো বলুন না, ড্রয়ারের গা থেকে পাওয়া ছাপের সঙ্গে আপনার আঙুলের ছাপ মিলল কেমন করে? অথচ আপনি বারবার বলেছেন, ড্রয়ারে আপনি হাতও দেননি। মিসেস দত্তর সঙ্গে আপনার ছাপ আমি মিলিয়ে পর্যন্ত দেখেছি। দুটোর মধ্যে কোনও মিলই নেই—। সুতরাং কাইন্ডলি আর-একবার ভাবুন না, মিস্টার দত্ত, ড্রয়ারটায় আপনি হাত দিয়েছিলেন কিনা—।—হোলস্টার থেকে ০.৩৮ পুলিশ স্পেশালটা বের করে উঁচিয়ে ধরলেন সুনীল ধর।
নীল রঙের মশারি
এ ঘটনা কাউকে কখনও বলিনি। কিন্তু এই পাঁচবছর ধরে ব্যাপারটা বুকে চেপে রেখে আমি হাঁপিয়ে উঠেছি। মনে হচ্ছে, এই বুঝি দম বন্ধ হয়ে মারা যাব। যদি যাই, তা হলে এ ঘটনা আর কেউ কখনও জানতে পারবে না। আর আমিও আপনাদের কাছে বিচার চাইতে পারব না। বলতে পারব না, ‘সব তো শুনলেন। এবারে আপনারই বলুন, আমি কোনও অন্যায় করেছি কি না। আমার বন্ধু রোহনকে আমি সত্যি-সত্যিই খুন করেছি কি না। ওকে আমি…।’
নাঃ, আর পারছি না। কেন যেন মনে হচ্ছে, এটাই আমার শেষ সুযোগ। এখন এ কাহিনি না শোনালে পরে আর কখনও—।
ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল একটা নীল রঙের মশারি দিয়ে। সস্তায় এই মশারিটা আমি কিনতে বাধ্য হয়েছিলাম। তাও আমার জন্যে নয়—রোহনের জন্যে। রোহনের চামড়া নাকি প্রজাপতির মতো নরম-সরম। আর আমারটা নাকি গন্ডারের। তাই মশার কামড় আমি গায়ে না মাখলেও রোহন সেটা একেবারে সহ্য করতে পারে না।
চিড়িয়ামোড়ের কাছাকাছি একটা পুরোনো বাড়িতে দুটো ছোট-ছোট ঘর ভাড়া নিয়ে আমি থাকি। ভাড়া নিয়েছিলাম সেই ছাত্রজীবনে—আর এখন চাকরিজীবনে পৌঁছে গেছি। তাই আজকের আগুন বাজারেও ভাড়াটা বেশ কমসমই রয়ে গেছে।
আমার ঘর দুটো পাশাপাশি, দোতলায়। বহুদিন ধরে ওদের দেওয়ালে রং পড়েনি। জায়গায়-জায়গায় নোনা ধরে পলেস্তারা ফেঁপে গেছে।
দুটো ঘরেরই পেছনদিকের দেওয়ালে লোহার গরাদ বসানো একজোড়া ছোট-ছোট জানলা। জানলা দিয়ে তাকালে ফ্রি-তে প্রকৃতি দেখা যায়।
প্রকৃতি বলতে একটা বিশাল পুকুর—তার বেশিরভাগটাই শ্যাওলার সবুজ গুঁড়োয় ঢাকা। তার পাড়ে বড়-বড় নারকোল গাছ—সবসময়েই বাতাসে মাথা নাড়ছে। এ ছাড়া আমার ঘরের খুব কাছাকাছি একটা প্রকাণ্ড আমগাছ। গরমের সময়ে ছেলেছোকরারা তার ডালে-ডালে হনুমানের মতো দাপাদাপি করে।
গাছগুলোর আশপাশ দিয়ে তাকালে আকাশ দেখতে পাই। আর বেশ কয়েকটা রঙিন পাখি রোজ ফ্রি-তে দেখা দেয়।
আমার ঘরজোড়ায় মশা আছে বটে তবে তেমন মারাত্মক কিছু নয়। তা ছাড়া ওরা তো ওই ফ্রি প্রকৃতিরই একটা পার্ট!
আমার বাপি মাঝে-মাঝে কলকাতায় কাজে এলে আমার কাছেই থাকে। মশার কামড় খেয়ে দু-চারবার আমার কাছে কমপ্লেইন করেছে বটে, কিন্তু আমি তেমন গা করিনি। আবার দেড়শো-দুশো টাকা খরচ করব! বাপিকে বুঝিয়েছি, ‘এক-দুটো রাতের তো ব্যাপার! কয়েল জ্বেলে চাদর মুড়ি দিয়ে ম্যানেজ করে নাও।’
কিন্তু রোহন অন্য জিনিস। ও ম্যানেজ করতে নারাজ। ও শিলিগুড়ির কোন একটা ফার্মে ঢুকেছে। সেখান থেকে অডিটের কাজে প্রায়ই ওকে কলকাতায় পাঠায়। আর এসে ও আমার আস্তানাতেই ওঠে। তারপর কাজ মিটে গেলে কেটে পড়ে।
আমার দু-ঘরে দুটো সস্তার তক্তাপোশ আছে। তার ওপরে বিছানা-বিছানা ভাবওয়ালা যে-লেয়ার দুটি পাতা আছে তাকে টোস্টে মাখানো মাখনের লেয়ারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। তবে থিকনেস ওই মাখনের মতো হলেও সফটনেস তার মতো নয়। এ নিয়েও রোহনের কাছে আমাকে কথা শুনতে হয়। সত্যিই, ও খলিফা জিনিস!
তো ওর উৎপাতেই মশারিটা কিনেছিলাম এবং দামটা শেয়ার করার জন্যে ও জোর করে একশোটা টাকাও আমার হাতে আগাম গুঁজে দিয়েছিল।
মশারিটা শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ের একটা দোকান থেকে কিনেছিলাম। দোকানে অনেক মশারি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার পর বিরক্ত এবং ক্লান্ত দোকানদার তার কোনও গুপ্ত কোটর থেকে এই নীল রঙের মশারিটা বের করে নিয়ে আসেন।
মশারিটার রং বেশ উজ্জ্বল নীল। সাধারণত এই রঙের মশারি চোখে পড়ে না। আর তার কাপড়টাও দারুণ—রেশম-রেশম ভাব।
ভাবছিলাম দাম বোধহয় অনেক হবে। কিন্তু দোকানদার ভদ্রলোক, কী জানি কেন, মাত্র একশো পঁচিশ টাকায় ওটা আমাকে গছিয়ে দিলেন। বললেন, ‘এরকম জিনিস আর পাবেন না। কম দামে কেনা, তাই মিনিমাম লাভে ছেড়ে দিলাম—।’
তো ওই মিনিমাম লাভে কেনা মশারিটা থেকেই ম্যাক্সিমাম গোলমালের শুরু।
প্রথম রাতে কোনও প্রবলেম হয়নি। কিন্তু দ্বিতীয় রাতে ব্যাপারস্যাপার দাঁড়াল অন্যরকম।
রাতে কোনও একসময় ঘুম ভেঙে গেল। বাথরুম যেতে হবে। আমাদের এজমালি বাথরুম একতলায়। ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে সরু করিডর ধরে ঘুমচোখে পা ফেলে এগোচ্ছি, নজরে পড়ল আমার পাশের ঘরটার দরজার একটা পাল্লা খোলা।
ঘুম চটকে গেল পলকে। রাতে আমি ঘরটায় তালা দিই না, তবে বাইরে থেকে দরজা টেনে হাঁসকল লাগিয়ে দিই। কিন্তু সেটা তো নিজে থেকে আর খুলতে পারে না!
তা হলে কি চোর ঢুকল ঘরে?
কিন্তু ঘরে তো চুরি করার মতো বিশেষ কিছু নেই। তা ছাড়া এই বাড়িটার দোতলায় আমি একা থাকলেও একতলায় চারঘর ভাড়াটে রয়েছে। দোতলায় কাউকে আসতে হলে সেই ঘরগুলো পেরিয়ে আসতে হবে। সেটা চোরছ্যাঁচোড়ের পক্ষে যথেষ্ট ঝুঁকির ব্যাপার। তাই আমার দোতলাটা সবসময়েই নিরিবিলি এবং নিরাপদ।
