লোকটা বিরক্ত হয়ে বিশ্বনাথের দিকে ঘুরে তাকাল। এবং বিশ্বনাথের চেহারা দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।
কোন আক্কেলে এই বুড়োটা এই সংঘর্ষে নাক গলাচ্ছে?
বিশ্বনাথের বুকে সজোরে ধাক্কা দিল লোকটা। কাঁচা খিস্তি দিয়ে বলে উঠল, ‘আবে সুড্ডা লাল্লু, ফাট। সালা রাস্তা মাপ—নইলে দোকানের ঝাঁপ খুলে দেব।’
কথা বলার সঙ্গে-সঙ্গে প্রায় আট ইঞ্চি লম্বা একটা ছুরি বের করে ফেলেছে লোকটা।
রাস্তার আলোয় ওকে ভালো করে দেখলেন বিশ্বনাথ।
এমনিতে ভদ্রলোকের মতো চেহারা, তবে কুতকুতে চোখে শয়তানির ছাপ রয়েছে। চোয়াল চওড়া, কাঠের মতো শক্ত। মুখ থেকে অশ্রাব্য গালিগালাজ আর মদের গন্ধ বেরোচ্ছে।
বোঝাই যাচ্ছিল, এসব কাজে লোকটা পুরোনো পাপী।
মেয়েটা বাকি দুজনের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছিল আর ‘ছেড়ে দাও! ছেড়ে দাও!’ বলে চিৎকার করছিল। দুজনের একজন পিছন থেকে মেয়েটাকে কষে জাপটে ধরে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে আসছিল।
অল্প সময়ের মধ্যে সবকিছু বিশ্বনাথের নজরে পড়েছিল। এও খেয়াল করেছিলেন, এত হইচই সত্ত্বেও কোনও লোক অকুস্থলে এসে হাজির হয়নি। বরং দু-একজন রাতচরা মানুষ যা চোখে পড়ছিল তারা চলার গতি বাড়িয়ে দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাচ্ছিল।
প্রথম লোকটা বিশ্বনাথকে লক্ষ্য করে ছুরিসমেত হাত চালাল। ছুরির ধারালো ডগাটা বিশ্বনাথের বুক ছুঁয়ে গেল।
গায়ের জামাটা চিরে গেল কিনা বিশ্বনাথ বুঝতে পারলেন না, তবে একটা জ্বালা টের পেলেন।
সঙ্গে-সঙ্গে এক অদ্ভুত কাণ্ড করলেন। সামনে গলা বাড়িয়ে লোকটার ছুরি ধরা হাতে ভয়ংকর এক কামড় বসালেন। বাইটের নিয়ম মতো একটা কামড় বড়জোর পাঁচ সেকেন্ড। কিন্তু এখন বিশ্বনাথ নিয়ম-টিয়ম সব ভুলে গেলেন। কচ্ছপের কামড়ের মতো চোয়াল চেপে রইলেন—যেন মেঘ না ডাকলে ছাড়বেন না।
লোকটা কিছুক্ষণ ঝটপট করল। কামড় ছাড়ানোর জন্য হাতটা একবার ঝাঁকুনি দিল। কিন্তু ওই পর্যন্তই।
তারপরই লোকটা ফুটপাথের ওপরে খসে পড়ল। যন্ত্রণার চেঁচাচ্ছিল, কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে-চিৎকার জড়িয়ে গিয়ে আলতো হয়ে শেষ পর্যন্ত থেমে গেল।
বিশ্বনাথ অদ্ভুত ভাঙা গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ওকে ছেড়ে দাও!’
বাকি দুজনের মধ্যে যার হাতে কাজ কম ছিল সে একটা ছোট টর্চ বের করে বিশ্বনাথকে তাক করে বোতাম টিপল।
আসলে লোকটা বোতাম টিপেছিল কৌতূহল আর বিস্ময়ে। কারণ, আধো-আঁধারিতে বিশ্বনাথকে দেখে ওর কমজোরি প্রৌঢ় বলেই মনে হয়েছিল। তার সঙ্গে মোকাবিলায় সঙ্গীর এই হাল লোকটা মানতে পারছিল না।
কিন্তু টর্চের আলো বিশ্বনাথের মুখের ওপরে পড়তেই পলকে সবকিছু মেনে নিল।
বিশ্বনাথের ঠোঁটের কোণ থেকে রক্তের রেখা গড়িয়ে নেমে এসেছে থুতনির দিকে। বুকের কাছে জামাটা রক্তে ভেজা। মানুষটার চোখে অমানুষিক দৃষ্টি। আর ঠোঁট সামান্য ফাঁক করে থাকায় রক্ত মাখা দাঁত দেখা যাচ্ছে, সেইসঙ্গে জিভেরও খানিকটা।
ফুটপাথে পড়ে থাকা সঙ্গীর দিকে ঘুরে গেল টর্চের আলো। আর সেই মুহূর্তে বিশ্বনাথ ঝাঁপিয়ে পড়লেন প্রাণের মায়া ভুলে।
ওই যে মাথার ভেতরে রেণুকণা বলছিলেন, ‘…নতুন জীবনটাকে ভালো কাজে লাগানোর চেষ্টা করো…।’
ভয় পাওয়া লোকটা হাত বাড়িয়ে আক্রমণটা ঠেকাতে চেষ্টা করেছিল। বিশ্বনাথ পাগলের মতো ওর ডানহাতের কড়ে আঙুলটা কামড়ে ধরলেন। দু-হাতে আঁকড়ে ধরলেন শত্রুর ডানহাত। এবং এক ঝটকায় হাতটাকে বেঁকিয়ে দিলেন অন্যদিকে।
‘মটাস’ শব্দ হল একটা। বিশ্বনাথ আঙুল ভাঙার শব্দ আগে কখনও শোনেননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা।
এবার লোকটার চিৎকারের পালা।
ওর হাত থেকে টর্চ ছিটকে পড়ল। সাঁড়াশি দিয়ে গলা চেপে ধরা শুয়োরের মতো বীভৎস আর্তনাদ করে উঠল। ছুটও লাগাল একইসঙ্গে।
নিজের অজান্তেই বিশ্বনাথ দাঁত খিঁচিয়ে তেড়ে গেলেন সামনের দিকে। তিননম্বর লোকটা বুঝল গল্প শেষ। তাই একটুও দেরি না করে মেয়েটাকে ছেড়ে দিয়ে পালাল।
বিশ্বনাথ বাঁ-হাতের পিঠ দিয়ে মুখের রক্ত মুছে নিলেন। মাথা ঝুঁকিয়ে হাঁপাতে লাগলেন। লজ্জায় গ্লানিতে একেবারে মরে যাচ্ছিলেন। পাগলের মতো এসব কী করলেন তিনি? ওই তো লোকটা পড়ে রয়েছে ফুটপাতে! বেঁচে আছে, না মরে গেছে? যদি সিক্রেট পুলিশ দেখে ফেলে এখন!
বিশ্বনাথ কী এক লজ্জায় মেয়েটার দিকে তাকাতে পারছিলেন না। বোকার মতো মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। ঠান্ডা বাতাস ওঁকে ঘিরে খেলা করতে লাগল। বাতাস বলছিল, ‘শীত আসছে। বিশ্বনাথের গা শিরশির করছিল। একইসঙ্গে হালকা মদের গন্ধ নাকে আসছিল। বুঝলেন, মেয়েটা নেশা করেছে।
‘শিগগির পালিয়ে চলুন! পুলিশ দেখতে পেলে কেলেঙ্কারি হবে।’
মেয়েটার কথায় বিশ্বনাথ যেন জেগে উঠলেন। মেয়েটা ওঁর হাত ধরে টান মারল: ‘শিগগির ছুট লাগান! এদিকে—।’
অন্ধকার রাস্তা ধরে দৌড়তে শুরু করল মেয়েটি। আর ওর পিছন-পিছন বিশ্বনাথ।
একটু পরেই ওরা বড় রাস্তায় পৌঁছে গেল।
মেয়েটার গাড়িটা জায়গামতো দাঁড়িয়ে। তবে যে-গাড়িটা ওঁকে ধাক্কা মেরেছিল সেটাকে দেখা গেল না।
ঝটপট গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ল মেয়েটি। উলটোদিকের দরজাটা খুলে দিয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকল বিশ্বনাথকে: ‘কুইক!’
বিশ্বনাথ সিটে বসে দরজা বন্ধ করেছেন কি করেননি এক হ্যাঁচকায় গাড়িটা এগিয়ে গেল সামনের দিকে। তারপর ফাঁকা রাস্তা ধরে বিপজ্জনক গতিতে ছুটে চলল।
