রমেশ চোরাই রিভলভার বিক্রি করে। পুরোনো মাস্তান। বয়েস পঞ্চাশের কোঠায়। সবসময় হাসিখুশি। জোড়া জোড়া ভুরুর নীচে বড়-বড় চোখ।
হ্যাঁ, ভালোই কাজ দিচ্ছে।—রমেশের কাছে এগিয়ে গেলেন দত্ত কিন্তু আর একটা ০.২২ আমার দরকার…।
আসুন, ভেতরে আসুন।—চাপা স্বরে আহ্বান জানাল রমেশ।
ভেতরের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল পাত্র, বলল, বসুন—।
এর পরের ঘটনা ভাবতেই নীতিশের গায়ে কাঁটা দেয়। নিতান্ত মরিয়া না হলে মানুষ এসব কাজ পারে না। আর নীতিশ দত্ত যে মরিয়া সেটা ওঁর চেয়ে ভালো আর কে জানে!
রমেশকে আরও দুটো রিভলভার কেনার কথা বলেছেন নীতিশ। দুটোই সাইলেন্সার সমেত হওয়া চাই। একইসঙ্গে তিরিশহাজার টাকা ক্যাশও গুঁজে দিয়েছেন লোকটার হাতে।
তাতে কাজ হল মন্ত্রের মতো। টাকাটা পকেটে পুরুল রমেশ। ওর চোখ লোভে ঝকঝক করে উঠল।
পরশু মাল পেয়ে যাবেন।—রমেশ বলল, বাকি টাকা ক্যাশে নিয়ে আসবেন।
কোথায়?
বেলেঘাটার মোড়ে…বাসস্টপে…রাত ন’টায়। আমি নিজে থাকব—নীল জামা সাদা প্যান্ট পরে…।
রাজি হয়ে গেলেন নীতিশ।
ঠিক ন’টায় দুজনের দেখা হল। হাতে একটা জুতোর বাক্স ঝুলিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় হাজির হলেন নীতিশ।
বাসস্টপে দু-চারজন লোক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। নীতিশ লক্ষ করলেন রমেশ পাত্রর হাতে একটা বড় নাইলনের থলে—জামাকাপড়ে ঠাসা।
নীতিশ কাছে যেতেই রমেশ চাপা গলায় বলল, মাল এনেছেন?
এনেছি—। —বলে হাতে ঝোলানো জুতোর বাক্সটার দিকে ইশারা করলেন। তারপর এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে বললেন, আপনি?
এনেছি। থলের মধ্যে—জামাকাপড়ের নীচে…।
এখানে লোকজন রয়েছে।—ইশারা করে রাস্তার নির্জন দিকটা দেখালেন নীতিশ: চলুন—ওদিকে একটু এগিয়ে যাই…।
খানিকটা হেঁটে কয়েকটা ঝুপড়ি পেরিয়ে গেল দুজনে। তারপর অন্ধকার একটা জায়গা পাওয়া গেল। সেখানে পাশাপাশি দাঁড়ানো দুটো বিশাল ঝুপসি গাছ। তার আড়ালে দাঁড়িয়ে থলেতে হাত ঢোকাল রমেশ। সাইলেন্সার লাগানো একটা রিভলভার বের করল।
টাকা?
কোনও উত্তর না দিয়ে জুতোর বাক্সটা রমেশের দিকে এগিয়ে দিলেন নীতিশ। রিভলভারটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখলেন। সেফটি ক্যাচ খুলে চেম্বারটা চেক করতে-করতে পকেটে হাত ঢোকালেন। আঙুলে তিনটে গুলির ছোঁয়া টের পেলেন।
রমেশ তখন জুতোর বাক্সের একটা কোনা ছিঁড়ে টাকার বান্ডিলগুলো ছুঁয়ে দেখছে। ওর ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি।
তিনটে গুলি বের করে চেম্বারে ভরে নিলেন নীতিশ। তারপর রমেশের বুকে সাইলেন্সারের নল ঠেকিয়ে গুলি করলেন। পরপর দুবার।
চাপা দুটো ভোঁতা শব্দ হল। রমেশ খসে পড়ে গেল মাটিতে। জুতোর বাক্স আর থলে—দুটোই ওর হাত থেকে পড়ে গেল।
রিভলভারটা ভালো করে জামায় মুছে ওটা প্যান্টের পকেটে ঢোকালেন নীতিশ। পরে সুযোগ-সুবিধে মতো ওটা খালের জলে ফেল দেবেন। সূনীল ধরের বাবার সাধ্যি নেই ওটার আর খোঁজ পায়। এইসঙ্গে চোরাই রিভলভারের গল্পও শেষ।
তিনদিন পর ইন্সপেক্টর এলেন। একদিন ভীষণ বৃষ্টি হয়েছে। তাই দোকান ছেড়ে নীতিশ কোথাও যাননি।
সুনীল ধরের মুখে শুধু হতাশা। দেখে খুশি হলেন নীতিশ। নিজের গালে দুবার হাত বুলিয়ে নীতিশের চোখে চোখ রাখলেন সুনীল ধর, বললেন, আপনার ভাগ্য ভালো, মিস্টার দত্ত। আমাদের হাতে আর কোনও ক্লু আসেনি। টাকার ব্যাগটা আমরা খুঁজে পাইনি—বোধহয় বৃষ্টিতে ভেসে নদীতে গিয়ে পড়েছে। আর রিভলভার যার কাছ থেকে কেনা হয়েছে সে-লোকটি মারা গেছে।
কিন্তু ভেবে দেখুন তো, মিস্টার দত্ত, যদি ওই লোকটা—মানে, রমেশ পাত্র—মারা না যেত? হয়তো রিভলভারটার খদ্দেরকে আমরা খুঁজে পেতাম, তাই না? না মশাই, আপনি বুড়ো হলে কী হবে, আপনার মাথায় বুদ্ধি আছে। আমার মতো লোককে আপনি বুদ্ধির খেলায় হারিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য যদি খুন দুটো আপনি ধরে থাকেন। সরি, মিস্টার দত্ত, আপনার ওয়াইফের মার্ডারারকে আমি ধরতে পারলাম না। আমাদের হাতে আর কোনও ক্লু নেই—সুতরাং, দিস কেস রিমেইনস আনসলভড—সো লঙ—। ইন্সপেক্টর চলে গেলেন।
নীতিশ দত্তর মুখে ফুটে উঠল ক্রুর, বাঁকা হাসি…।
কিন্তু ঘণ্টাখানেক পরেই হন্তদন্ত হয়ে ফিরে এলেন ইন্সপেক্টর, বললেন, মিস্টার দত্ত, আমার রুমালটা কি ফেলে গেছি…ওঃ—এই তো!…থ্যাংকু ইউ।
ও, ভালো কথা। একটা ছোট্ট কথা আপনাকে জিগ্যেস করব। আপনি বলেছিলেন, কামিনী দেবীই ড্রয়ার খুলে রিভলভারটা বের করেছিলেন। তাই তো?
হ্যাঁ—।
আপনি ওই ড্রয়ারটা খোলেননি?
না, না। কতবার বলব। কামিনী ছাড়া কেউ ওই ড্রয়ারে হাতই দিত না।—নীতিশের স্নায়ুতন্ত্রী যেন ছিঁড়ে পড়বে।
০.২২ রিভলভারটা আপনার স্ত্রী-ই বের করেছিলেন, আপনি নয়—এই তো?
ওহ—ইন্সপেক্টর, প্লিজ বিলিভ মি।—উত্তেজনায় নীতিশের মুখ-চোখ লাল হয়ে উঠল।
তা যদি হয়, তবে ভারি আশ্চর্য ব্যাপার ঘটেছে।—হাসলেন ধর। ড্রয়ারটায় মাত্র একসেট ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে। সেটা আমরা মিলিয়েও দেখেছি। ব্যাপারটার মাত্র দুটো সমাধান আমাদের সামনে আছে। এক, ওই ড্রয়ারে আপনি ঘটনার দিন হাত দিয়েছিলেন। হয়তো ০.২২টা বেরও করেছিলেন। যা আপনি সম্পূর্ণ অস্বীকার করছেন। আর দু-নম্বর সমাধানটা একটু পিকিউলিয়ার আর ইয়ে….কষ্টকল্পিত। তবে একেবারে অসম্ভব নয়। আপনাকে বলেছিলাম, আই লিভ নো স্টোন আনটার্নড অ্যাবাউট আ মার্ডার…। তাই হঠাৎই এই আশ্চর্য ব্যাপারটা আমার নজরে এল…।
