নীতিশের হৃৎপিণ্ড যেন হোঁচট খেল: কী—কী কথা?
সামান্য ব্যাপার। আপনি বলছিলেন না, নোংরার টিনটা রেখে আপনি যখন দোকানে ফিরে আসছিলেন, তখনই ডাকাতটাকে দেখতে পান। কিন্তু খটকাটা কোথায় জানেন? টিনটা আপনি জায়গামতো রাখেননি। মাঝপথেই নামিয়ে রেখে—ভগবান জানেন তারপর কী করেছেন!
ইস—ক্ষুব্ধ হলেন নীতিশ। কী বোকার মতো কাজই না করেছেন! শাবলটা তুলে নেওয়ার সময়ে টিনটা মাঝপথেই নামিয়ে রেখেছিলেন। জায়গামতো রাখার আর সুযোগ পাননি। কী হবে এখন?
ইন্সপেক্টর, দয়া করে আমাকে ভুল বুঝবেন না—মানে, গত পঁচিশবছর ধরে ওই একই জায়গায় টিনটা রাখি তো—তাই মনে হয়েছিল কালও বোধহয় রেখেছি…। ওহ—হ্যাঁ, এখন মনে পড়েছে।..টিনটা নিয়ে যাওয়ার সময় দোকানের দরজা খোলার শব্দ পেয়ে টিনটা মাঝপথেই নামিয়ে রেখে ফিরে আসি—।
যা ইচ্ছে বলুন…কোনও সাক্ষী তো আর নেই! আপনি যা বলবেন, তাই আমাকে মেনে নিতে হবে।—ইন্সপেক্টর হাসলেন: তবে একটা কথা বলে রাখি, সাক্ষী আমি খুঁজে বের করবই। আজই খবরের কাগজে একটা অ্যাড দিচ্ছি—লাস্ট আট তারিখ রাত ন’টা থেকে সাড়ে ন’টার মধ্যে কেউ এই এরিয়ায় কোনও পিকিউলিয়ার ঘটনা দেখেছে কি না। দেখা যাক, কোনও রেসপন্স যদি পাওয়া যায়।—দোকান ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন সুনীল ধর।
চিন্তিত মুখে দরজা বন্ধ করলেন নীতিশ। কাল সকালে আবার কী সংবাদ শুনবেন, কে জানে!
পরদিন দুপুরে ইন্সপেক্টর আবার এলেন।
দত্ত দোকানেই ছিলেন। ওঁকে লক্ষ করে সুনীল বললেন, ‘আপনাকে কতগুলো খবর শোনাব। ভীষণ ইন্টারেস্টিং খবর। প্রথমে দু-চারটে কথা বলে নিই। আপনার পাড়াপড়শির কাছে আমি খোঁজ নিয়েছি। খোঁজ নিয়ে একটু অবাকও হয়েছি। কারণ ওইরকম জাঁদরেল মহিলাকে অনেকদিন আগেই আপনার খুন করা উচিত ছিল। আমার ভেবে অবাক লাগছে, আপনি পঁচিশবছর ওয়েট করলেন কেন?
কী বলছেন আপনি!—প্রতিবাদ করলেন নীতিশ, আপনাকে তো বলেছি, ডাকাতটা কামিনীকে…।
জানি, জানি।—একহাত তুলে বাধা দিলেন ধর তবে ব্যাপারটা কী জানেন, আপনি বড্ড বেশি পারফেক্ট ডেসক্রিপশান দিয়ে ফেলেছেন, মিস্টার দত্ত। আমার মনে হয়, ওইরকম মেন্টাল অবস্থায় যেখানে আপনি লোকটাকে কয়েক মুহূর্তমাত্র দেখেছেন, কারও পক্ষে অত নিখুত বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। ব্যাপারটা একটু অস্বাভাবিক নয়?
যাকগে, এবার আসল খবরটা শুনুন। গত ৮ তারিখে রাত ন’টা বেজে সাতমিনিটের সময় পেছনের গলিটা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন অশোক রায়। হঠাৎ গাড়ির হেডলাইটের আলোয় একটা অদ্ভুত জিনিস তিনি লক্ষ করেন। গলির ম্যানহোলের ঢাকনাটা খোলা—একপাশে সরানো। হয়তো কোনও গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করতে পারে ভেবে তিনি গাড়ি রেখে মিনিট-দশেক পরে পায়ে হেঁটে ম্যানহোলটার কাছে ফিরে আসেন—কিন্তু…।
নীতিশের মুখে সীমাহীন উৎকণ্ঠা।
মুচকি হেসে ইন্সপেক্টর হাতের একটা ভঙ্গি করলেন, বললেন, কিন্তু সেই ঢাকনাটা এবার বন্ধ ছিল। অর্থাৎ, কোনও কারণে কেউ ওই ঢাকনাটা খুলেছিল। কিন্তু কেন? সেটা জানার জন্যে আমরা ওটা তন্নতন্ন করে লোক দিয়ে সার্চ করিয়েছি। তাতে পাওয়া গেছে এই রিভলভারটি।
পকেট থেকে একটা রিভলভার বের করে দেখালেন ধর, বললেন, ব্যালিস্টিক রিপোর্টে জানা গেছে, এটা থেকেই আপনার মিসেসকে গুলি করা হয়েছিল। রিভলভারটা চোরাই—কিন্তু এটা কোথা থেকে বিক্রি করা হয়েছে সেটা একটু খোঁজ করলেই জানা যাবে।
হৃৎপিণ্ডের উত্তালগতি কি কিছুতেই শান্ত হবে না? নীতিশ ভয় পেলেন। যদি পুলিশ বের করে ফ্যালে কার কাছ থেকে তিনি ওই রিভলভারটা কিনেছিলেন! যদি সে নীতিশের কথা বলে দেয়! ওঃ—তিনি আর ভাবতে পারছেন না!
কিন্তু ইন্সপেক্টর, ওই ম্যানহোল থেকে আপনারা আর কিছু পাননি?
ঠিক এই প্রশ্নটাই আপনার কাছ থেকে এক্সপেক্ট করছিলাম। আপনি ঠিক সেই কতাটা ভেবেছেন দেখছি। হ্যাঁ, ক্যাশ ভরতি ব্যাগটাও আমরা ওখানে পাব বলে ভেবেছিলাম—কিন্তু পাইনি। ওটা পাওয়া গেলে বোঝা যেত আসল ব্যাপারটা। ব্যাগটা যদি টাকাভরতি থাকে, তবে ম্যানহোলের ঢাকনা আপনিই সরিয়েছিলেন। গর্তের ভেতরে ফেলে দিয়েছিলেন ব্যাগ আর রিভলভারটা। কিন্তু ব্যাগটা যদি খালি থাকে, তবে বুঝতে হবে ব্যাপারটা ডাকাতটারই কাজ। মানে, বুঝতে পারছেন, আমাদের হাতে দুটো ক্লু। টাকাভরতি ব্যাগ আর রিভলভার। রিভলভারটায় কোনও প্রিন্ট আমরা পাইনি। বোধহয় ড্রেনের জলে নষ্ট হয়ে গেছে। তবুও…আপনার একসেট প্রিন্ট তো আমাদের কাছে আছে…ওগুলো ম্যাচ করিয়ে…। ইন্সপেক্টর আর কথা শেষ করলেন না।
ইন্সপেক্টর চলে যেতেই তৎপর হয়ে উঠলেন নীতিশ। যদি ওরা সেই লোকটাকে খুঁজে বের করে, তার কাছে যায়, তা হলেই সর্বনাশ!
আর দেরি না করে শোওয়ার ঘরে গেলেন। তোশকের নীচে রাখা ছিল কয়েকটা ০.২২ বোরের গুলি। কামিনীই কিনে এনেছিল ওর রিভলভারের জন্য। গোটাতিনেক পকেটে পুরলেন। তারপর নীচে এসে খিড়কি দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লেন। চুপিসাড়ে নিঃশব্দে…সরু গলিটা ধরে দ্রুতপায়ে এগিয়ে চললেন…।
এই যে মিস্টার দত্ত, কী মনে করে? রিভলভারটা কেমন কাজ দিচ্ছে?— উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠল রমেশ পাত্র।
ব্যাটা তা হলে ওঁকে চিনতে পেরেছে। ভাগ্যিস সুনীল ধর আগে খবর দিয়েছিলেন!
