না…মানে, একটা কাজে আটকে পড়লাম—তাই তক্ষুনি বন্ধ করা হয়ে ওঠেনি—।
দোকানের বাইরে লোক গিজগিজ করছে। খবর পেয়ে এই রাতবিরেতেও সবাই ছুটে এসেছে।
সেই ভিড়ের মধ্যে থেকে এগিয়ে এল সেই শেষ খদ্দের। ইন্সপেক্টরের দিকে তাকাল: উনি ঠিকই বলেছেন, স্যার। আমি যখন বেরিয়ে যাই তখন উনি কৌটোগুলো সাজিয়ে রাখছিলেন।
তাই বুঝি?—ঝকমক করে উঠল ইন্সপেক্টরের চোখ। কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন দত্তর দিকে। তারপর অপেক্ষমাণ কনস্টেবলকে বললেন, এই, সব লোকগুলো হটাও—।
মুহূর্তে দোকান ফাঁকা করে ইন্সপেক্টর দরজা বন্ধ করে দিলেন।
আসুন, মিস্টার দত্ত, এখানটায় বসা যাক—আর-একবার শোনা যাক আপনার গল্পটা।
নীতিশ ইন্সপেক্টরের কাছে এসে বসলেন।
ওদিকে তখন ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্টরা তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। চষে ফেলছে গোটা দোকানটা।
বলুন, মিস্টার দত্ত—গোড়া থেকে বেশ ধীরেসুস্থে বলুন। যেন কোনও ভুল না হয়।
নীতিশ দত্ত ওঁর গোল-গোল চোখ তুলে তাকালেন ঠিক কীভাবে যে শুরু করব বুঝতে পারছি না।…ওই ভদ্রলোক—মানে, আমার শেষ খদ্দেরটি চলে যাওয়ার পর আমি সদর দরজা ভেজিয়ে দিই। তারপর রোজকার মতো নোংরার টিনটা জায়গামতো রেখে ফিরে আসতেই দেখি একটা লোক রিভলভার উঁচিয়ে ধরেছে আমার ওয়াইফের দিকে। আমাকে দেখতে পেয়ে ইশারায় কাছে যেতে বলল। আমাদের দুজনকে রিভলভারের ডগায় দাঁড় করিয়ে ক্যাশভরতি ব্যাগটা তুলে নিল। ঠিক এময় সময় কামিনী ড্রয়ারে রাখা ওর রিভলভারটা লুকিয়ে বের করতে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে ডাকাতটা গুলি করল—ওঃ! কামিনী পড়ে যেতেই লোকটা খিড়কি দরজা দিয়ে ছুটে পালাল। কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম। তারপর এক হ্যাঁচকায় কামিনীর হাতের মুঠোয় ধরা রিভলভারটা টেনে নিয়ে ছুটলাম। পেছনের সরু গলিটায় পৌঁছেই লোকটাকে দেখতে পেলাম। সঙ্গে-সঙ্গে গুলি করলাম—দুবার—। মনে হল লোকটা একটু টলে পড়ল—তারপরই মিলিয়ে গেল—। দু-হাতে মুখ ঢাকলেন নীতিশ। তিনি জানেন, ওঁর এই হাবাগোবা, ভালোমানুষ চেহারাটাই ইন্সপেক্টরকে ভাবিয়ে তুলেছে সত্যিই তিনি খুন করেছেন কি না।
সুনীল ধরের কথায় ওঁর চমক ভাঙল, ডাকাতটার চেহারার একটা বর্ণনা দিতে পারেন, মিস্টার দত্ত?
এ প্রশ্নের জন্য নীতিশ তৈরিই ছিলেন, জবাব দিলেন, মোটা গোঁফ। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। বড় জুলপি। ডান ভুরুর ওপর একটা লম্বা কাটা দাগ। গর্তে বসা ছোট চোখ। থ্যাবড়ানো নাক। তার পাশে একটা আঁচিল—।
চমৎকার, চমৎকার,—পেনসিল আর নোটবই হাতে উঠে দাঁড়ালেন সুনীল: নিখুত বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু মিস্টার দত্ত, একটা কথা আপনাকে গোড়াতেই জানিয়ে রাখা ভালো: কোনও ম্যারেড মহিলা মারা গেলে, মানে খুন হলে, আমরা তাঁর হাজব্যান্ডকেই প্রথম সন্দেহ করি। আমিও সন্দেহ করব আপনাকেই— যদিও আপনার চেহারা দেখে মনে হয়, একটা মশা মারতেও আপনি দশবার চিন্তা করবেন। কিন্তু কে জানে…! যাকগে, আজ আমি চললাম। কাল আবার দেখা হবে, এই দোকানে। কোনও খুন-টুন হলে আমি তন্নতন্ন করে খুনি খুঁজে বেড়াই। ওটা আমার একটা ম্যানিয়া…।
পরদিন সন্ধেবেলা ইন্সপেক্টর একাই এলেন। নীতিশ দোকান খোলেননি। ঠিক করেছেন স্ত্রী মারা গেছেন বলে দিন-সাতেক বন্ধ রাখবেন।
আসুন, মিস্টার ধর। কোনও খবর পেলেন ওই লোকটার?—আগ্রহ ফেটে পড়ছে নীতিশের গলায়।
স্থির চোখে নীতিশের দিকে চেয়ে রইলেন ইন্সপেক্টর, বললেন, বোধহয় আপনার ডেসক্রিপশানের কোনও লোকই পৃথিবীতে নেই—।’
চমকে উঠলেন নীতিশ: তার মানে? তার মানে কী, ইন্সপেক্টর?
আজ সারাটা দিন ধরে আমাদের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের পঁয়তাল্লিশজন অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। না, আপনার বর্ণনা মতো কোনও লোকের ছবিই আমাদের ফাইলে নেই। তা হলে আর বাকি থাকে মাত্র দুটো সম্ভাবনা এক, ডাকাতটা এ-লাইনে নতুন। দুই, ডাকাতের ব্যাপারটা পুরো গাঁজাখুরি। মানে, আপনার বানানো।—মুচকি হেসে থামলেন, সুনীল।
কী—কী বলতে চান আপনি?—রাগে নীতিশের চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে।
উত্তেজিত হবেন না, মিস্টার দত্ত। আমি তো আগেই বলেছি, যত অসম্ভব আর অবাস্তব মনে হোক না কেন, আপনাকেই আমি সন্দেহ করি। আর রিভলভারের ছাপ আমরা পরীক্ষা করেছি। তাতে আপনার প্রিন্ট ছাড়াও মিসেস দত্তর পার্শিয়াল প্রিন্ট পাওয়া গেছে। হয়তো আপনার কথাই সত্যি: মিসেস দত্ত গুলি খেয়ে পড়ে যাওয়ার পর আপনি রিভলভারটা নিয়ে ডাকাতটাকে তাড়া করেন। কিন্তু আমার মনে হয়, ডেডবডির হাতে রিভলভারটা চেপে ধরে প্রিন্ট তৈরি করা এমন কিছু অসম্ভব নয়—কী বলেন?…সত্যি, মিস্টার দত্ত, খুনটা যদি আপনিই করে থাকেন তবে আপনাকে সাবাশ দিতে হয়।
আবার ব্যাপার কী জানেন? আপনার কথামতো একটা গুলি পেছনের গলির দেওয়ালের গা থেকে আমরা পেয়েছি। দ্বিতীয়টা পাইনি। হয়তো লোকটার গায়েই ওটা লেগেছে। এখানকার সব ডাক্তার আর হসপিটালকে আমরা অ্যালার্ট করে দিয়েছি। কোনও গুলির চোট খাওয়া লোক যদি তাদের কাছে যায়, তবে তারা যেন সঙ্গে-সঙ্গে খবর দেয়। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি। যদি আপনার কথামতো কোনও ডাকাত ও-কাজটা করে থাকে, তবে আমরা যেভাবে হোক মালকে ভেতরে ঢোকাবই। শুধু একটু খাটতে হবে এই যা। আর সে-লোক যদি আপনি হন, তবে তো হাতের কাছেই আপনাকে পাওয়া যাবে—। দরজার দিকে পা বাড়ালেন ধর হ্যাঁ, একটা কথা—। ইন্সপেক্টর ঘুরে দাঁড়ালেন।
