যেতে-যেতে থমকে দাঁড়াল শেষ খদ্দের! মিস্টার দত্ত, ন’টা তো বেজে গেল, দোকান বন্ধ করবেন না?
হ্যাঁ—হ্যাঁ—। হাতের কাজটা সেরে নিই, এখুনি বন্ধ করছি।—মনে-মনে ব্যাটাকে প্রাণ খুলে গালাগাল দিলেন। পরের চরকায় কেন তেল দিতে আসছ বাবা। দোকান বন্ধ করি কি না করি তাতে তোমার কী?
খদ্দেরটি বেরিয়ে যেতেই সদর দরজাটা ভেজিয়ে দিলেন নীতিশ।
কী হল কী? যাওয়ার সময় উনি কী বলে গেলেন শোনোনি? কানে কি গজাল গেঁথে বসে আছ? দরজাটায় খিল লাগিয়ে ছিটকিনি এঁটে তালা-টালা মারো। হোপলেস কোথাকার।—খেঁকিয়ে উঠল কামিনী।
হ্যাঁ—লাগাচ্ছি। আগে ঘরটা ঝাঁট দিয়ে নোংরাগুলো বাইরে ফেলে আসি, তারপর বন্ধ করছি।—চুপচাপ ঝাঁটা দিয়ে কাজ শুরু করলেন নীতিশ। নোংরাগুলো একটা টিনে ভরে (গত পঁচিশবছর ধরে এই একই কাজ করে আসছেন তিনি) দোকানের পিছনদিকের খিড়কি দরজা খুলে বেরোলেন। সামনে একফালি খোলা জায়গা। ঘুটঘুটে অন্ধকার।
মুহূর্তের মধ্যে নীতিশ তৎপর হয়ে উঠলেন।। কোথায় গেল ষাটবছরের বৃদ্ধের জড়তা! টিনটা ফেলে রেখে অন্ধকার কোণ থেকে একটা শাবল তুলে নিয়ে ছুটে বেরোলেন।
দোকানের পিছনে একটা সরু অন্ধকার গলি। রাত আটটার পরই গলিটা একদম ফাঁকা হয়ে যায়। আর এখন তো রাত ন’টা!
গলিটা নির্জন—খাঁ-খাঁ করছে। ছুটে গেলেন গলির একমাত্র ম্যানহোলটার কাছে। শাবলের চাড় দিয়ে লোহার ঢাকনাটা তুলে একপাশে সরালেন। তারপরই আবার ছুটে চললেন দোকানের দিকে। শাবলটা আগের জায়গায় ঠক করে নামিয়ে রেখে হাঁপাতে-হাঁপাতে দোকানে গিয়ে ঢুকলেন।
এতক্ষণ ধরে কি ওই নোংরাগুলো গিলছিলে? কখন থেকে…এ এ কী!
আতঙ্কে বিস্ফারিত হয়ে উঠল কামিনী দত্তর দু-চোখ, যেন কোটর ছেড়ে লাফিয়ে বেরিয়ে আসবে।
কারণ, নীতিশের হাতের পাঞ্জায় ধরা একটা গাঢ় নীল রঙের অটোমেটিক রিভলভার। তার নলটা তাক করে আছে কামিনীর দু-চোখের ঠিক মাঝখানে। পরক্ষণেই—গুড়ুম—।
কামিনী লুটিয়ে পড়তেই একহাতে ওর শরীরটা ধরে ফেললেন নীতিশ। সাবধানে শুইয়ে দিলেন কাউন্টারের পিছনে। রিভলভারটা পকেটে পুরে ফেললেন। ক্যাশের সমস্ত টাকা একটা ব্রিফকেসে ভরতি করে তালা এঁটে দিয়েছিল কামিনী। এক হ্যাঁচকায় সেটাকে তুলে নিয়ে ছুটে চললেন ম্যানহোলের দিকে।
ঢাকনাটা খোলাই ছিল। রিভলভার এবং টাকার ব্যাগটা ওর ভেতরে ফেলে ঢাকনা বন্ধ করে তিনি আবার দোকানে ফিরে এলেন।
খুব সতর্কভাবে নীতিশকে প্রত্যেকটি কাজ করতে হবে। এইবার শুরু হল কাজের দ্বিতীয় পর্যায়।
সাড়ে তিনবছর আগে নীতিশের দোকানে একবার ডাকাত পড়েছিল। শীতের সময় রাত আটটা নাগাদ ব্যাপারটা হয়েছিল। তখন কামিনী বাধা দেওয়ায় ডাকাতদলের একটা লোক গুলি চালায়। সেই গুলিতে কামিনী বাঁ-হাতে চোট পায়। তারপর থেকেই ওর বাঁ-হাতটা সামান্য বেঁকা।
কামিনী এমনিতে দজ্জাল, ডাকাবুকো। ওর সাহসের কোনও কমতি নেই। ওরা বেজায় বড়লোক। তা ছাড়া ওর রিলেটিভরা এক-একজন কেউকেটা। ফলে ওই ডাকাতির ঘটনার পর কামিনী বেঁকে বসল। বলল, লাইসেন্স করা একটা রিভলভার ওর চাই-ই চাই।
ওর বায়না মিটতে তেমন দেরি হল না। ওর এক মামা ডেপুটি পুলিশ কমিশনার। তিনিই কীভাবে যেন কলকাঠি নেড়ে আদরের ভাগ্নীকে একটি রিভলভারের লাইসেন্স করিয়ে দিলেন। ০.২২ ক্যালিবারের ছোট্ট বন্দুক। সেটা সবসময় কাউন্টারের নীচে একটা ড্রয়ারে রাখা থাকে—চোর-ডাকাত ঠেকানোর জন্য। এই বন্দুকটাই নীতিশকে আজকের এই প্ল্যান জুগিয়েছে।
চটপট ড্রয়ার খুলে সেই রিভলভারটা বের করলেন নীতিশ। যা করার জলদি করতে হবে। হাতে একদম সময় নেই।
রিভলভারটা ভালো করে মুছে অতি সাবধানে কামিনীর ডেডবডির ওপরে ঝুঁকে পড়লেন। স্ত্রীর প্রাণহীন নিশ্চল ডানহাতটা টেনে নিয়ে রিভলভারের বাঁটের ওপর চেপে ধরলেন ওর হাতের পাঁচ আঙুল। তারপর রিভলভারটা তুলে নিয়ে নিজের মুঠোয় বাগিয়ে ধরে ছুটলেন। লক্ষ্য পিছনের সরু গলি…।
হুড়মুড় করে গলিতে পৌঁছে (এসবই অভিনয়ের অংশ) খুব নিখুঁতভাবে কাজগুলো করতে হবে নীতিশকে। কারণ, স্ত্রী মারা গেলে স্বামীকেই প্রথম সন্দেহ করা হয়। সুতরাং একমুহূর্ত থমকে দাঁড়ালেন। পরক্ষণেই গলির অন্ধকার দিকটা লক্ষ্য করে ফায়ার করলেন—একবার-দুবার—রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে ভেসে এল গুলির শব্দ—গুড়ুম-গুড়ুম—।
রিভলভারটা নামিয়ে শ্লথ পায়ে টলতে-টলতে দোকানে ফিরে এলেন নীতিশ। এসে দেখেন যা ভেবেছেন ঠিক তাই। তাঁদের ওপরতলার ভাড়াটে, বৃদ্ধ কুমার চক্রবর্তী, নেমে এসেছেন দোকানে। হতভম্বের মতো চারপাশে তাকাচ্ছেন—।
এই যে, নীতিশ—কী হয়েছে? কীসের একটা আওয়াজ পেলাম মনে হল। তোমার ওয়াইফ কোথায়?
নীতিশ টলতে-টলতে কাউন্টারের পিছনে গেলেন। হাত থেকে রিভলভার খসে পড়ল। জল ভরা চোখে ঝাঁপিয়ে পড়ল কামিনীর মৃতদেহের ওপরে। চমকে উঠে কাউন্টারের এপাশে এলেন চক্রবর্তী: ও গড—নীতিশ, কী করে এসব হল? শিগগিরই পুলিশে খবর দাও—।
নীতিশ ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। চোখের জল মুছে এগিয়ে গেলেন দোকানের টেলিফোনটার দিকে…।
তার মানে আজ আপনি ন’টার সময় দরজা বন্ধ করেননি?—নীতিশের দিকে ক্রুর দৃষ্টি মেলে ধরলেন ইন্সপেক্টর সুনীল ধর: অথচ বছরের পর বছর ঠিক ওই সময়েই আপনি দরজা বন্ধ করে এসেছেন।—ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত নয়, মিস্টার দত্ত?
