‘ক’বছর?’ তুষার মাথা নাড়ল, ‘অদ্দিন কে অপেক্ষা করবে! তা ছাড়া তোমার এই গয়না চুরি করে ইনশিওরেন্স কোম্পানিকে ঠকানোর প্ল্যানটাও তো আমারই, তরুপিসি। আমি না থাকলে কী করে—।’
‘হ্যাঁ, তুই না থাকলে, তোর মদ-জুয়া-পয়সা ওড়ানোর বদ নেশা না থাকলে, আজ আমি যা করলাম তা আমাকে করতে হত না।’ কঠিন স্বরে মুখিয়ে উঠলেন তরুলতা সোম, ‘তোর মতো লোভী অকৃতজ্ঞ আমি দুটি দেখিনি।’
‘হ্যাঁ লোভী,’ স্বীকার করল তুষার, ‘এবং চালাক।’ হেসে যোগ করল ও, ‘এরকম স্বভাব আমি কার কাছ থেকে পেলাম তাই ভাবছি।’
ব্রেসলেটটা ব্যাগে ভরে রাখলেন বৃদ্ধা, সেইসঙ্গে গয়নাগুলোও। তারপর ফিরে তাকালেন ভাইপোর দিকে।
‘কত চাস?’
‘এই তো আমার লক্ষ্মী পিসি। না, বেশি লোভ করব না। ইনশিওরেন্সের হাফ টাকা হলেই চলবে।’
‘আর বাকি হাফ আমি মারা গেলে পর। গয়নাগাটি আর বাড়িটার কথা তো বাদই দিলাম। হুম। তা ইনশিওরেন্স কোম্পানি টাকাটা দেওয়া পর্যন্ত তো অপেক্ষা করবি, নাকি?’
‘ধৈর্য ধরতে চেষ্টা করব!’ দাঁত বের করে হাসল তুষার।
ওকে বসিয়ে রেখে দেরাজে গয়নাগুলো তুলে রাখতে গেলেন মিস সোম, গজগজ করতে লাগলেন আপনমনে, ‘লোভের একটা সীমা থাকা দরকার, লোভের একটা…।’
আধঘণ্টা বাদে তিনি তুষারকে ডাকলেন রান্নাঘরে। খেতে। তিনি নিজে শুধু চা খেলেন।
‘এখনও রাগ পড়েনি, তরুপিসি?’ হেসে জানতে চাইল তুষার, ‘নাও, একটা টোস্ট অন্তত খাও।’
‘খিদে নেই।’ বলে তুষারের গোগ্রাসে খাওয়া দেখতে লাগলেন মিস সোম।
লোভী এবং চালাক। বড্ড বেশি লোভ, তবে সেই অনুপাতে ততটা চালাক নয়, ভাবলেন তিনি, মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।
তুষার ভাবল, ‘পিসিটা আমার মন্দ নয়। টাকাটা-পয়সাটা চাইলে রাগ করে বটে, কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গেই আবার রাগ পড়ে যায়।’ তারপর মালকড়ি দিয়ে দেয়।
দেওয়াল-ঘড়ির ঘণ্টার শব্দ হল।
তুষারের খাওয়া শেষ হয়ে আসে। পাঁউরুটি সে পছন্দ করে, মিষ্টি খেতেও ভালোবাসে, মাখনও তার প্রিয়। যেটা সে পছন্দ করে না সেটা তার তরুপিসি মাখনের সঙ্গে যত্ন করে মিশিয়ে দিয়েছেন—সেঁকো বিষ।
নিখুঁত খুনের অ্যানাটমি
অনেক ভেবেচিন্তে নীতিশ দত্ত ঠিক করলেন, তাঁর স্ত্রীকে স্বর্গের সিঁড়ি দেখাবেন। প্রত্যেকেরই একটা সহ্যের সীমা আছে। সে-সীমা অতিক্রম করলে কারও পক্ষেই ধৈর্য ধরা সম্ভব নয়। সুতরাং বর্তমান ক্ষেত্রে তিনিও অধৈর্য হয়ে উঠেছেন…।
কামিনীর সঙ্গে নীতিশের বিয়ে হয়েছে পঁচিশবছর। এখন ষাটের কোঠায় পৌঁছে তাঁর মনে হয়েছে, কামিনীর এতদিনকার অবিচারের প্রতিফল হিসেবে ওকে খুনই করা উচিত। বিয়ের পর থেকেই বউয়ের বুড়ো আঙুলের তলায় তাঁকে জীবন কাটাতে হয়েছে। একমুহূর্তের জন্যও কোনও কথার প্রতিবাদ করতে পারেননি। কামিনীর কথায় উঠেছেন, বসেছেন। অনেক সময় মন বিদ্রোহ করতে চেয়েছে, কিন্তু পারেনি। মেরুদণ্ড কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়েছে। আসলে স্ত্রীকে তিনি ভীষণ ভয় পান। অন্তত পাড়াপড়শিরা তাই জানে। স্ত্রীর বহু অত্যাচার তিনি মুখ বুজে সহ্য করেছেন। তাই আজ রাতে কামিনীকে এই চরম শাস্তি দিতে চান—।
রোজকার মতো দোকান খুলে কাউন্টারের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন নীতিশ। পাঁচটা বেজে গেছে। বাইরে আলো কমে এসেছে। গত পঁচিশবছর ধরে এ নিয়মের হেরফের হয়নি। সকাল আটটা থেকে দুপুর একটা। আবার বিকেল পাঁচটা থেকে ঠিক রাত ন’টা। আজ দোকান খুলে থিতু হয়ে বসতেই এসে ঢুকল চুনি মণ্ডল। নীতিশকে দেখে হাসল: দত্তবাবু, আমার এক পাউন্ড রুটি লাগবে…আর মিসেস কোথায় গেলেন?—চোখ নাচাল চুনি।
কামিনী ঘুমোচ্ছে, এক্ষুনি আসবে।—এক পাউন্ড রুটি চুনির দিকে এগিয়ে দিলেন নীতিশ। পয়সা দিয়ে বাইরে পা বাড়াল মণ্ডল। দরজার কাছ থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, দত্তদা, হিসেবের খাতায় দামটা টুকে রাখুন। নয়তো বউদি এসে ধমক লাগাবে’খন।—হেসে বেরিয়ে গেল সে।
রাগে আপাদমস্তক জ্বলে গেল নীতিশের। না, অবাক হওয়ার কিছু নেই। গত পঁচিশবছর ধরেই এ ধরনের কথা তাঁকে শুনতে হচ্ছে…।
কী হল? ঘুমোচ্ছ নাকি! এত বয়স হল, তবু একটা জ্ঞানগম্যি নেই? বলি, দামটা খাতায় তুলবে কে—হ্যাঁ?—বাজখাঁই গলার চিৎকারে চমকে ফিরে তাকালেন নীতিশ। কামিনী দত্ত এসে দাঁড়িয়েছে দোকানে। মোটাসোটা ফুটবলের মতো চেহারা। দু-চোখে ক্রুর চাউনি।
ওহ—হ্যাঁ। একদম ভুলে গেছি।—তাড়াতাড়ি পেনসিল বাগিয়ে এক পাউন্ড রুটির দাম খাতায় টুকতে লাগলেন।
কামিনী দত্ত আগুনঝরা দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে রইল গোবেচারি স্বামীর দিকে। গোল-গোল পেঁচার মতো চোখে রিমলেস চশমা। ঝাঁটা গোঁফ। ছোট চেহারা। গালের চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে! ষাট বছরেই যেন যমের ঘরে পা বাড়িয়ে রেখেছেন। কিন্তু কামিনী জানে না মনে-মনে কী কুটিল অভিসন্ধি এঁটেছে তার এই থুত্থরে বুড়ো স্বামী।
ন’টা বাজতেই সোজা হয়ে বসলেন নীতিশ। ঠিক এই মুহূর্ত থেকেই ওঁর অভিনয় শুরু হবে। তিনি জানেন স্ত্রী হত্যার প্রথম সন্দেহভাজন ব্যক্তি মৃতার স্বামী। এসব জেনেও তিনি ভয় পাননি। এমনভাবে কাজটা ওঁকে সারতে হবে, যাতে কাকপক্ষীও না সন্দেহ করে। এখনকার কাজগুলোর ওপরেই নির্ভর করবে ওঁর এই অদ্ভুত খুনের সাফল্য।
কামিনী এক কোণে বসে রোজকার বিক্রির হিসেব কষছিল। দোকানের শেষ খদ্দের যখন দোকান ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন ব্যস্ততার ভান করলেন নীতিশ। দোকানের টুকিটাকি কাজ নিয়ে পড়লেন। অন্যান্য দিন শেষ খদ্দেরের পিছন-পিছন গিয়ে তিনি সদর দরজা বন্ধ করেন। কিন্তু আজ তা করলে চলবে না। কারণ, আজ তিনি সদর দরজা বন্ধ করবেন না।
