মিস সোম তখন ডাক ছেড়ে কাঁদছেন। তাঁর কান্নামেশানো গলায় উত্তরটা অস্পষ্ট হয়ে গেল। জনতা নানান আলোচনা করতে লাগল। অপেক্ষা করতে লাগল। অবশেষে সংবিত ফিরে পেলেন মিস সোম। বললেন, ‘আমার গয়না! পঞ্চাশহাজার টাকার গয়না! ওঃ—।’ চোখ মুছলেন তিনি: নামার সময় একটা ছেলেকে গয়নার ব্যাগটা ধরতে দিয়েছিলাম। সে ব্যাগটা নিয়ে পালিয়ে গেছে।’
অতএব পরিণতি পুলিশ।
কিছুক্ষণের মধ্যে রেলপুলিশের একজন অফিসার ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হলেন। কৌতূহলী জনতাকে সরিয়ে দিলেন। তারপর মিস সোমকে লক্ষ করে বললেন, ‘আসুন, স্টেশনমাস্টারের ঘরে আসুন।’
স্টেশনমাস্টারের ঘরে তাঁকে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ করা হল। না, সেই যুবকটিকে মিস সোম চেনেন না, তার চেহারার নিখুঁত বর্ণনা দেওয়াও তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তবে বয়েস পঁচিশ-ছাব্বিশ, গায়ের রং ফরসা, হাসিটা মিষ্টি।
এর বেশি মিস সোমের কাছ থেকে কিছুই আদায় করতে পারলেন না অফিসার। তারপর দুজন কৌতূহলী সহযাত্রীর জবানবন্দিও নিলেন তিনি। কিন্তু সেরকম কোনও সূত্র পাওয়া গেল না।
অবশেষে মাথা নাড়লেন অফিসার: ‘আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করব, মিস সোম। কিন্তু এগোনোর মতো তেমন কোনও ক্লু আপনি দিতে পারলেন না। আপনার ঠিকানা আর ফোন নাম্বার রেখে যান। কোনও খোঁজ পেলেই জানাব।’ একটু থেমে অফিসার আবার বললেন, ‘কিন্তু যা-ই বলুন অতগুলো গয়না নিয়ে এভাবে বেরোনো আপনার ঠিক হয়নি।’
‘কী করব? উপায় ছিল না। আমি গয়নাগুলো বিক্রি করতে এসেছিলাম। সেই বিক্রির টাকা দিয়ে ব্যাংকের ধার শোধ করতাম—ওদের কাছে আমার বাড়িটা মর্টগেজ দেওয়া আছে। ধার শোধের জন্যে ওরা আমাকে লাস্ট একমাসের নোটিশ দিয়েছে।’
‘যাকগে, মন খারাপ করবেন না,’ সান্ত্বনার সুরে বললেন অফিসার, ‘মনে হয় দু-চার দিনের মধ্যে আপনার গয়নার খোঁজ পাওয়া যাবে।’
আলোচনা শেষের ইশারা পেয়েও মিস সোম দাঁড়িয়ে রইলেন। কারণ জানতে সপ্রশ্ন হল অফিসারের দৃষ্টি।
‘আমার কাছে বাড়ি ফেরার পয়সাও নেই।’ লজ্জা-মেশানো নীচু গলায় বললেন মিস সোম।
‘ওহ-হো, আমার তো খেয়ালই ছিল না।’ তিনি ঘুরে তাকালেন স্টেশনমাস্টারের দিকে। স্টেশনমাস্টার আলোচনা সবই শুনেছেন। তিনিই মিস সোমের বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করে দিলেন।
ফিরতি গাড়িতে মিস সোমকে ট্রেনে তুলে দিলেন অফিসার। মিস সোম তখনও আপনমনে বিড়বিড় করছেন, ‘এত চমৎকার ছেলেটা। কে বলবে তার মনে এই ছিল।’
মিস সোমের গয়না গেল, সেইসঙ্গে বাড়িটাও। তাঁর চোখে জল এল আবার। অফিসার তখনও তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, ‘মনখারাপ করবেন না। আপনার গয়না ঠিকই ফিরে পাবেন।’
সবুজ ঘাসের লনে ঝরাপাতার শব্দ, রাতের বাতাস তাদের চঞ্চল করে করে তুলেছে। বিশাল বাড়িটা অন্ধকার—চুপচাপ।
সদর দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন মিস সোম। দরজা বন্ধ করলেন। বিশাল দেওয়াল-ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে ক্লান্তিকর ছন্দে: টিক-টিক-টিক।
আলোর সুইচের দিকে হাত বাড়াতেই চেয়ারের পাশে রাখা টেবিল-ল্যাম্পটা জ্বলে উঠল। চেয়ারে বসে থাকা পঁচিশ-ছাব্বিশের যুবকটি, ট্রেনে মিস সোমের ব্যাগটা যে সরিয়েছিল, হাসল মিষ্টি হাসি।
গায়ের চাদর নামিয়ে দিয়ে মিস সোম বললেন, ‘সেকি, এর মধ্যেই তুই ফিরে এসেছিস, তুষার?’
‘ট্রেনের হাজার চাকার চেয়ে চারচাকা জোরে ছোটে,’ তুষার উত্তর দিল, ‘তা রূপনগরে কেমন কাটল?’
‘দারুণ। ঠিক প্ল্যান মতো সবকিছু হয়েছে। রেলপুলিশের আদিখ্যেতা আর ধরে না। আমার ফেরার টিকিটের ব্যবস্থা করে অফিসার নিজে আমাকে ফিরতি ট্রেনে তুলে দিয়েছে। বলেছে, তোকে ধরবার জন্য দারুণ চেষ্টা করবে।’
‘কিন্তু কোনওদিনই পারবে না।’ তুষার শব্দ করে হাসল।
‘যা চেহারার বর্ণনা দিয়েছি তা দিয়ে তো নয়ই।’ বৃদ্ধা হাসিমুখে বললেন, ‘ওঃ, পুরো ব্যাপারটা কী সহজ! ভীষণ সোজা, নারে, তুষার?’
‘তা সত্যি, তরুপিসি। তোমার মতো একজন সরল নিষ্পাপ বুড়িকে দেখে যে-কেউই ঠকত—ওই অফিসার তো দূরের কথা।’
বিজয়ীর হাসি হাসলেন তরুলতা সোম। তারপর এগিয়ে গিয়ে টেবিলের ওপরে রাখা কালো ব্যাগটা তুলে নিলেন। ব্যাগটা টেবিলে তুষারই রেখেছিল। তিনি বললেন, ‘আহা রে আমার সোনার গয়না! তোদের ছেড়ে কি আমি থাকতে পারি?’ ব্যাগটা বলিরেখাময় গালে চেপে ধরলেন তিনি। চোখ বুজে বললেন, ‘এখন ওই ইনশিওরেন্সের টাকাটা—।’
‘পঞ্চাশহাজার টাকা,’ বলল তুষার, ‘অনেক টাকা।’
‘ব্যাংকের ধার শোধ দিয়েও অনেক থাকবে। তিনি ইনশিওরেন্স কোম্পানি আবার সন্দেহ করে বসবে না তো?’
‘করলে করুক, কিন্তু টাকা না দিয়ে ওদের পথ থাকবে না।’ সহজ সুরে বলল তুষার ‘অনিচ্ছে থাকলেও হাসিমুখে ওরা এসে টাকাটা তোমাকে গুনে-গুনে দিয়ে যাবে।’
‘হুঁ, তা দেবে।’ বৃদ্ধা হাসলেন। ব্যাগ খুলে একটা-একটা করে গয়না টেবিলে রাখলেন: ‘কী দারুণ গয়নাগুলো! প্রাণ থাকতে এগুলো বিক্রি করা যায়!’
‘সুন্দর তাতে সন্দেহ নেই, তবে আমার পছন্দ মালটিচ্যালেন টিভি।’
‘তা ঠিক। যার পছন্দ তার কাছে। কিন্তু এটা দ্যাখ।’ একটা পাথর বসানো অপূর্ব ব্রেসলেট তুলে ধরলেন বৃদ্ধা।
‘মালটিচ্যানেল টিভি এবং ক্যাশ টাকা।’ তুষার বলে চলল।
‘টিভি তো এই সেদিন কিনেছিস।’ মনে করিয়ে দিলেন তরুলতা সোম: ‘আর ক্যাশ টাকা? সে তো সময় হলেই আসবে। আমি আর ক’বছর আছি, বল?’
