বাহান্ন বছরের মিস সোম তাঁর বাইশ বছরের প্রতিবিম্বের প্রশংসা করলেন। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে উৎকর্ণ হলেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই প্রত্যাশিত শব্দটা শুনতে পেলেন।
ঢং।
এ-বাড়ির প্রাচীন দেওয়াল-ঘড়িতে পনেরোমিনিট অন্তর-অন্তর ঘণ্টা বাজে। কালো ব্যাগটা তুলে নিয়ে সদর দরজা খুলে বাইরে এলেন। ব্যাগটা মেঝেতে নামিয়ে রেখে সদর দরজায় তালা দিলেন। সিঁড়ি নেমে এসে দাঁড়ালেন ঝরাপাতা ছাওয়া লনে।
রাস্তায় পা দিতেই একটা খালি ট্যাক্সি চোখে পড়ল। ড্রাইভার গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে একটা বিড়ি টানছিল। মিস সোম ট্যাক্সির কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই সে বিড়িটা ফেলে দিয়ে মিটার ডাউন করল। তারপর হাত বাড়িয়ে পিছনের দরজা খুলে ধরল। ছোট্ট ব্যাগটাকে দু-হাতে শক্ত করে ধরে ট্যাক্সিতে উঠলেন তিনি। ড্রাইভার নিজের আসনে বসতেই মিস সোম বললেন, ‘রেল স্টেশান।’
স্টেশনের বাইরে সাইকেল-রিকশার স্ট্যান্ডের কাছে ট্যাক্সি এসে থামল। ড্রাইভার নেমে পিছনের দরজা খুলে ধরে মিস সোমকে নামতে সাহায্য করল। তিনি তখনও কালো ব্যাগটাকে বুকে আঁকড়ে আছেন। ভাড়া নেওয়ার পর মিটার তুলতে-তুলতে ড্রাইভার ভাবল, বুড়ির ব্যাগের ভেতর ক’লাখ টাকা আছে কে জানে।
মিনিটদশেক পরেই একটা ট্রেন হাঁপাতে-হাঁপাতে স্টেশনে এসে ঢুকল। টিকিট কাটাই ছিল। কামরায় উঠে জানলার ধারে একটা সিট পেলেন মিস সোম। আয়েস করে বসে কালো ব্যাগটাকে কোলের ওপরে রাখলেন, আঁকড়ে ধরে রইলেন দু-হাতে। তাঁর এই অদ্ভুত আচরণে কামরার অন্য যাত্রীরা একটু অবাক হল। তাঁরা মুখ টিপে হাসতেও লাগল—তবে একজন বাদে। এই ‘একজন’ মিস সোমের সঙ্গেই ট্রেনে উঠেছে—একই স্টেশন থেকে। ছেলেটির বয়েস পঁচিশ-ছাব্বিশ। পরনে সাধারণ পরিষ্কার পোশাক। ট্রেন ছাড়তেই সে নিজের সিট ছেড়ে মিস সোমের পাশে গিয়ে বসল।
বৃদ্ধা ঘুরে তাকাতেই যুবকটি হাসল—সরল হাসি। উত্তরে ভদ্রতাবশে হাসলেন মিস সোম, এবং আবহাওয়া এবং ট্রেন-লেট-এর ব্যাপার নিয়ে দু-চারটে কথাও বললেন।
‘এর মধ্যেই বেশ শীত পড়ে গেছে। গতবার এ সময়ে তো রীতিমতো গরম ছিল।’ কথাপ্রসঙ্গে বলল যুবকটি।
‘কিন্তু এ সময়টা বেশ ভালো লাগে। ঠিক শীতও নয়, অথচ শীত-শীত আমেজ।’ খুশিমাখা গলায় বললেন মিস সোম।
সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল যুবক। ট্রেন তখন ছুটে চলেছে ধু-ধু প্রান্তর চিরে।
গোধুলি পা বাড়ায় সন্ধের দিকে। প্রকৃতির শীত নিবারণ করতে ক্রমে কালো কোট হাতে এগিয়ে আসে রাত। কখনও পাহাড়, কখনও বুড়ো গাছ দুরন্ত গতিতে জানলার পাশ দিয়ে ছুটে যায়। ট্রেন সুষম ছন্দে দোলে এপাশ-ওপাশ। শোনা যায় ইঞ্জিনের মিষ্টি গম্ভীর হুইসল-এর শব্দ।
একইসঙ্গে মিস সোমের ক্লান্ত শরীর দুলতে লাগল। চোখ বুজে এল। কোলের ওপরে রাখা কালো ব্যাগের ওপর শিথিল হয়ে এল হাতের বাঁধন। কিন্তু সে মুহূর্তের জন্য। আচমকা সোজা হয়ে বসলেন তিনি। ব্যাগটা শক্ত হাতে চেপে ধরে চকিতে চারপাশে তাকালেন। যাত্রীদের দেখলেন, দেখলেন পাশে বসা যুবকটিকে। সে তখন জানলা দিয়ে বাইরের ছায়া-অন্ধকারের দিকে চেয়ে আছে।
পরক্ষণেই তাঁর দিকে ঘুরে তাকাল যুবকটি। হাসি মুখে বলল, ‘ঘুম পেয়ে থাকলে ঘুমিয়ে নিন না—আপনাকে দেখে ক্লান্ত মনে হচ্ছে।’
সর্বনাশ! তা হলে ছেলেটা দেখেছে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম!
‘না, না ঘুম পায়নি। হঠাৎই কেমন একটা ঝিমুনি এসেছিল। তা ছাড়া আপনার সঙ্গে কথা বলতে-বলতে ঘুমিয়ে পড়াটা আমার ঠিক হয়নি।’ মিস সোমের স্বরে ভদ্রতা মেশানো লজ্জা।
‘তাতে কী হয়েছে।’ হাসিমুখেই বলল যুবক, ‘কোথায় নামবেন আপনি?’
‘রূপনগর।’
‘আমিও ওখানেই নামব।’
কাকতালীয়?
রাত নেমেছে। দূরে ছুটে চলা আলোর বিন্দু মাঝে-মাঝে আঁধারে হারিয়ে যায়। আবার ফিরে আসে। মিস সোম আনমনা হয়ে পড়েন।
তাঁর চমক ভাঙে যুবকের কথায়।
‘রূপনগরে কোথায় যাবেন?’
‘স্টেশানের কাছাকাছি—’ ব্যাংকে যাব সে-কথা বলা ঠিক হবে না।
‘আত্মীয়ের বাড়ি?’
এত প্রশ্নও করতে পারে ছেলেটা?
‘না, একটা জরুরি কাজে।’ কালো ব্যাগের ওপর শক্ত হল মিস সোমের হাত।
ট্রেন থামল রূপনগরে।
যাত্রীরা ধাক্কাধাক্কি করে এগোল দরজার দিকে।
হুড়োহুড়ির মধ্যে নিজেকে, গায়ের চাদর, না কালো ব্যাগ, এই তিনটের মধ্যে কোনটা আগে সামলাবেন ভেবে পাচ্ছিলন না মিস সোম। সেই যুবকটি এগিয়ে এল তাঁকে উদ্ধার করতে, দিন না, ব্যাগটা আমি ধরছি।’
দ্বিধা। কিন্তু সে মুহূর্তের ভগ্নাংশের জন্য।
তারপর ব্যাগটা যুবকটির হাতে তুলে দিয়ে গায়ের চাদর সামলাতে-সামলাতে ট্রেন থেকে নামলেন মিস সোম।
তাঁর খোটখাটো ভঙ্গুর শরীর নিয়ে সবার শেষে নামতে বাধ্য হয়েছেন। তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে হেরে গেছেন প্রতিযোগিতায়। এবার স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে তিনি পরপোকারী যুবকটির আশায় আশেপাশে তাকালেন। কিন্তু হতাশ হলেন।
কারণ যুবকটিকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। হতবুদ্ধি চোখে অন্য যাত্রীদের ক্রমশ চলে যেতে দেখলেন মিস সোম। হুইসল দিয়ে ছেড়ে গেল ট্রেন, এবং অকস্মাৎ দু-হাতে মুখ ঢাকলেন তিনি। এক বিকৃত কান্নার চিৎকার বেরিয়ে এল তাঁর ঠোঁট চিরে।
প্ল্যাটফর্মে তখনও কাছাকাছি যাঁরা দাঁড়িয়ে ছিলেন সে-চিৎকারে চমকে উঠলেন। একজন দুজন করে ভিড় জমে গেল মিস সোমের চারপাশে। অসংখ্য প্রশ্ন তাঁকে লক্ষ্য করে ছুটে আসতে লাগল।
