‘এতসব কথা আপনি জানলেন কী করে?’ দিশা ডক্টর সেনকে প্রশ্ন করল।
বিষণ্ণভাবে হাসল ডক্টর সেন। বলল, ‘আমি এখানে আছি বহুবছর। আমার স্টাডিরুম আছে এ-বাড়িতে। কিন্তু ওই ডায়মেনশনের গন্ডগোলের জন্য ঘরটা এখন দেখাতে পারছি না। আমি এই বাড়িটার ব্যাপারে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে স্টাডি করেছি, রিসার্চ করেছি—তারপর ধীরে-ধীরে সব জানতে পেরেছি। এককথায় বলতে গেলে এই বাড়িটা একটা জাদুকর। নানারকম ইলিউশান তৈরি করতে পারে ও।’
‘কী করে এই বাড়ি থেকে বেরোনো যায় আপনি জানেন না?’ দিশা জানতে চাইল।
‘না, জানি না। শুধু এটুকু বলতে পারি—চোখের সামনে যা দেখছ তা সবসময় সত্যি নয়—আসলে একটা ইলিউশান। এ-কথাটা মনে রেখো। এই যে আমরা ছ’জন তোমাদের সামনে রয়েছি—আমরা আসলে নেই—বহুদিন আগেই ”নেই” হয়ে গেছি। আমরা একসময় বাঁশি বাজাতাম…একসময়…।’
ডক্টর সেনের কথাগুলো ধীরে-ধীরে প্রতিধ্বনির মতো শোনাতে লাগল। একটা ঝোড়ো ঘূর্ণিপাক কোথা থেকে যেন আচমকা এসে ঘরে ঢুকে পড়ল। ওদের চোখের সামনে ডক্টর সেন আর তার পাঁচ সঙ্গী পাউডারের মতো গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে ঝরে গেল, মিলিয়ে গেল। আর একইসঙ্গে ঘরের আলোগুলো সব নিভে গেল।
টুনটুনরা দেখল, অন্ধকার ঘরে আবার সেই নীলচে গোধূলি-আলো। ঘরের শেষ প্রান্তের দেওয়ালে চারটে খোলা জানলা। জানলা দিয়ে রাতের আকাশ চোখে পড়ছে। তারায় ভরা ঝকঝকে গাঢ় নীল আকাশ।
কী ভেবে টুনটুন সবাইকে ডেকে নিয়ে ছুটে গেল সেই খোলা জানলাগুলোর কাছে। একটা জানলা দিয়ে মুখ বের করে তাকাল।
সেই একই দৃশ্য। ডাইনে, বাঁয়ে, ওপরে-নীচে শুধু আকাশ আর আকাশ। তারা আর তারা। ফোর ডায়মেনশন। ওলটপালট।
ডক্টর সেনের কথা মনে পড়ল ওর।
‘চোখের সামনে যা দেখছ তা সবসময় সত্যি নয়—আসলে একটা ইলিউশান।’
এই তারা ভরা আকাশ কি তা হলে ফোর ডায়মেনশনের মায়া? কী আছে এই আকাশের আড়ালে? বাঁচার পথ নেই তো?
টুনটুন ভেতরে-ভেতরে পাগল হয়ে যাচ্ছিল। কিছু একটা তো করতে হবে। হবেই। নইলে এই বাড়িতে প্রেতাত্মার সংখ্যা বাড়বে শুধু।
মা-বাপির কথা মনে পড়ল ওর। চোখে জল এসে গেল। কিন্তু সামনে তো আর কোনও পথ খোলা নেই। ভয় পেলে চলবে না।
ও চোখের জল মুছে নিল। শানুদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘শানুদা, যদি একটু পরে নীচের দিক থেকে আমার ডাক শুনতে পাও তা হলে সঙ্গে সঙ্গে তোমরা সবাই জানলা দিয়ে লাফিয়ে পড়বে—।’
‘কী বলছিস তুই?’ শানু চেঁচিয়ে উঠল।
‘কী করছ? কী করছ? পাগলামো কোরো না—।’ অঙ্কিত।
‘টুনটুনদা! টুনটুনদা!’ দিশা।
কিন্তু তার আগেই টুনটুন খোলা জানলা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে শূন্যে।
নীচের তারা ভরা আকাশ ওর জন্য আঁচল পেতে রয়েছে। ঠিক এই কথাটাই মনে হল টুনটুনের। ও যেন খোলা প্যারাশুটের মতো ভাসতে-ভাসতে নীচে নামতে লাগল।
একটু পরেই ভেজা গাছপালা আর জল-কাদায় ওর শরীরটা আছড়ে পড়ল। কানে এল ব্যাঙের ডাক।
পৃথিবীটা এত সুন্দর আগে কখনও মনে হয়নি টুনটুনের। মনে হয়নি ব্যাঙের ডাক এ-ত মিষ্টি।
ও পাশ ফিরে তাকাল চারপাশে। বেশ খানিকটা দূরে তিনটে সার্চলাইট জ্বেলে অনেক মানুষ ভিড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
টুনটুনের গায়ে আলো এসে পড়েছিল। ওকে দেখতে পেয়েই লোকজন হইহই করে লাফিয়ে উঠল।
টুনটুন শরীরের সব শক্তি জড়ো করে চেঁচিয়ে উঠল, ‘দিশা। অঙ্কিতদা! শানুদা!’
তারপরই ও জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
নিঃসঙ্গ শঙ্খচূড়
চিঠিটা পড়ে ছিল টেবিলেই। মিস সোম সেটা আর খুললেন না, খোলার প্রয়োজন ছিল না,অনেকদিনের আশঙ্কা আজ সত্যি হয়েছে। যে-খারাপ খবরটার জন্য এতদিন ধরে ভয় পেয়েছেন আজ সেই খবর বয়ে নিয়ে এসেছে চিঠিটা। ব্যাংক এবার তাঁর বাড়িটার দখল নেবে। কিন্তু দখল নিতে চাইলেই তো আর পাওয়া যায় না! এটা তাঁর নিজের বাড়ি—এবং তাই-ই থাকবে। তাঁর হাতে যে ধার শোধ দেওয়ার মতো টাকা আছে তা নয়, তবে সোনাগয়না কিছু আছে। সেই সুন্দর জড়োয়া গয়নাগুলোই বাড়িটাকে বাঁচাবে।
সূক্ষ্ম কাজ করা মেহগনি কাঠের দেরাজের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। একটা টানা খুলে বের করলেন চোখধাঁধানো ঝিকমিকে জড়োয়া গয়নাগুলো। সেগুলো সযত্নে ভরে ফেললেন একটা ছোট্ট কালো ব্যাগে—পঞ্চাশহাজার টাকার গয়না। ‘দেখি, কী করে ওরা আমার বাড়ির দখল নেয়,’ ফিসফিস করে বললেন তিনি। জানলা দিয়ে দু-চোখ মেলে দিলেন বাইরে।
নীচের ঘাস-ছাওয়া লনে ঝরাপাতা হাওয়ায় উড়ে যায়, ঝোপের ফাঁকে উড়ে যায় ব্যস্ত চড়ুই, প্রায়-রিক্ত গাছের প্রশাখা থেকে ঝরে পড়ে নিঃসঙ্গ একটা হলুদ পাতা, তার বুকে হেমন্তের পরোয়ানা অদৃশ্য অক্ষরে লেখা।
মিস সোমের দৃষ্টি তখন অন্যমনস্ক। তাঁর মনোযোগ দেওয়াল-ঘড়ির বেজে চলা ঘণ্টার দিকে—ঘণ্টার শব্দ গুনছেন তিনি। অবশেষে সেই ছন্দোময় শব্দ থামল।
বেরোনোর সময় হল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি এগোলেন দরজার দিকে। দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে সিঁড়ি নামতে শুরু করলেন।
নীচের বসবার ঘরে আলোছায়ার খেলা। একটা চেয়ারে পড়ে থাকা কাশ্মীরি শালটা তুলে নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নিলেন। হেমন্ত মানেই শীতের পূর্বাভাস। দুঃসময়ের ইশারা।
বসবার ঘরের আয়নায় নিজেকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন মিস সোম। আয়নার অন্ধকার দিঘিতে ভাসছে তাঁর ফরসা মুখ। সে-মুখের বয়েস এই মুহূর্তে যেন তিরিশবছর কমে গেছে। অনেক, অনেক দিন আগে, যখন দেওয়ালের লাগোয়া আইভি গাছটা এই এতটুকু ছিল, তখন তাঁর মুখের ছায়া আয়নায় এমনটিই দেখাত। এখন সেই আইভি গাছ গোটা বাড়িটাকে আঁকড়ে ধরেছে, ছেয়ে গেছে সারা দেওয়ালে।
