ডক্টর সেন হাসি মুখে কথা বলতে-বলতে নিজের জায়গায় গিয়ে বসল। হাতে তালি দিয়ে হাত ঝেড়ে বলল, ‘এবারে বলো দেখি, তোমাদের গল্পটা শুনি। এ-বাড়িতে তোমরা ঢুকলে কবে?’
শানু, অঙ্কিত, টুনটুন আর দিশা পালা করে ওদের কথা বলতে শুরু করল। কথা বলতে-বলতে ওরা একটু-একটু করে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল, ওদের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পাচ্ছিল।
ওদের কাহিনিতে শেষের রেশ টেনে অঙ্কিত বলল, ‘…তারপর এ-ঘরে ঢুকে আপনাদের দেখা পেলাম।’
‘হ্যাঁ, দেখা পেলে।’ হেসে বলল শিলাদিত্য সেন, ‘তবে আমাদের নাও দেখা হতে পারত। অনেকেই আছে যারা অনেক বছর আগে এ-বাড়িতে ঢুকে পড়েছে— কিন্তু তাদের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়নি।’ ঠোঁট উলটে কাঁধ ঝাঁকিয়ে ডক্টর সেন বলল, ‘হয়তো আর কোনওদিন দেখা হবেও না।’
‘কেন? দেখা হবে না কেন?’ শানু জানতে চাইল।
‘দেখা হবে না, কারণ, এই বাড়িটা থ্রি ডায়মেনশন আর ফোর ডায়মেনশনের মাঝে যাতায়াত করে…ছুটোছুটি করে বেড়ায়…’
‘থ্রি ডায়মেনশনের মানে না হয় বুঝলাম…’ অঙ্কিত বলল, ‘কিন্তু ফোর ডায়মেনশন?’
‘হ্যাঁ-ফোর ডায়মেনশন।’ হাসল ডক্টর সেন: ‘ওই ফোর্থ ডায়মেনশনটাই যত গোলমেলে ব্যাপার। ফোর্থ ডায়মেনশনটা আসলে হল টাইম—সময়। থ্রি ডায়মেনশনাল ওয়ার্ল্ডে শুধু তিনটে ডায়মেনশন—মানে, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা—দিয়ে বোঝা যায় একটা জিনিস আমাদের চোখের সামনে আছে কি নেই। কিন্তু ফোর ডায়মেনশনাল ওয়ার্ল্ডে একটা বাড়তি ফ্যাক্টর—মানে, বাড়তি ডায়মেনশন—এসে যায়: সময়। সেই কারণেই আমাদের থ্রি ডায়মেনশনাল ওয়ার্ল্ডের সব কনসেপ্ট সেখানে খাটে না। স্পেস-টাইমের কারসাজি আর কী! এর বেশি তোমাদের বোঝানো মুশকিল।
‘এই বাড়িটা সেই কারণেই অদ্ভুত। এর ঘরগুলো মাপে, সংখ্যায় আর চেহারায় বারবার পালটায়। এর সিঁড়িগুলো উলটেপালটে যায়। এর যে-কোনও ঘরের জানলা দিয়ে তাকালে বাইরে যে-দৃশ্য দেখা যায় তার সঙ্গে আমাদের কনসেপ্টের কোনও মিল নেই। পুরো ব্যাপারটাই একেবারে অন্যরকম।
‘যদি তোমরা এই ঘর থেকে বেরিয়ে একটু পরেই আবার ফিরে আসো তা হলে হয়তো দেখবে এই ঘরটাই আর খুঁজে পাচ্ছ না—পুরো ভ্যানিশ হয়ে গেছে। আমাদের সঙ্গে তোমাদের আর কখনও হয়তো দেখাই হল না। এটাই হল বাড়িটার ক্যারেকটার…।’ দু-হাত দুপাশে ছড়িয়ে থামল শিলাদিত্য সেন।
‘কিন্তু অন্য সব ব্যাপারগুলো?’ একসঙ্গে প্রশ্ন করে ফেলল দিশা আর টুনটুন। একে অপরের দিকে তাকাল একপলক। তারপর: ‘ওই যে সব ভূতুড়ে ব্যাপারগুলো! চাদরে ঢাকা মূর্তি। ঘরের দেওয়াল ফুলে ওঠা, চুপসে যাওয়া। ওই পুকুরের জলে সাঁতরে বেড়ানো সাপের মতো জিনিসগুলো। তা ছাড়া বাঁশির শব্দ…।’
হাসল ডক্টর সেন। সকলের মুখের ওপরে একপলক নজর বুলিয়ে বলল, ‘বলছি—সব বলছি। আমার যেটুকু জানা আছে সেটুকু অন্তত ঠিকঠাকভাবে বলার চেষ্টা করছি। দ্যাখো, প্রথমেই বলেছি, ”ওয়েলকাম টু দ্য অ্যামেজিং ওয়ার্ল্ড অফ স্পেস-টাইম অ্যান্ড সুপারন্যাচারাল…। এর মধ্যে স্পেস-টাইমটা যতটা সহজে পেরেছি এক্সপ্লেইন করেছি—বাকিটা সুপারন্যাচারাল—মানে, অলৌকিক—এলাকার ব্যাপারস্যাপার।’ গলার স্বর সিরিয়াস করে ডক্টর বলে চলল, ‘তোমরা কি জানো, এ-বাড়িতে ঢোকার পর কত লোক এখানে মারা গেছে? এই অদ্ভুত স্পেস-টাইমের মধ্যে সেইসব বন্দি প্রেতাত্মারা ঘুরে বেড়ায়। কখনও তাদের দেখা যায়—কখনও যায় না। এ ছাড়া সবশেষে রয়েছে এই প্রাগৈতিহাসিক বাড়িটা। তোমরা কি বললে বিশ্বাস করবে, এই বাড়িটা জীবন্ত! যে-যন্ত্রপাতির ঘর তোমরা দেখেছ ওটা আসলে বাড়িটার হার্ট-লাংস—আর এনার্জির সোর্স। বাড়িটার শ্বাস নেওয়ার শব্দ তোমরা সর্বক্ষণ শুনতে পাচ্ছ। যে-ঘরে অঙ্কিত দেওয়ালের গায়ে আটকে গিয়েছিল, ওটা এই বাড়িটার স্টমাক—পাকস্থলী।
‘আমি জানি, এগুলো অবিশ্বাস্য সব ব্যাপার—কিন্তু সত্যি। একটা জীবন্ত প্রাচীন বাড়ি, যেটা ভূতুড়ে, স্পেস-টাইমে থ্রি ডায়মেনশনাল ওয়ার্ল্ড আর ফোর ডায়মেনশনাল ওয়ার্ল্ডের মধ্যে হরবখত যাতায়াত করে! তোমরাই বলো, এরকম একটা বাড়ির সঙ্গে লড়াই করে পারা যায়!
‘আর ওই যে বাঁশির ব্যাপারটা। ওই বাঁশিগুলো সব হাড় দিয়ে তৈরি। কীভাবে ওগুলো বাজে, কে বাজায়—সেটা আমি আজও ঠিকঠাক উদ্ধার করতে পারিনি। তবে ওই বাঁশির আওয়াজে সম্মোহনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। সেই ঢেউ চুম্বকের মতো শিকারকে টেনে নিয়ে আসে এই বাড়িতে। তার শরীর থেকে কী এক কায়দায় সব হাড় বের করে নেওয়া হয়—বাড়িটাই বের করে নেয়—অথচ মানুষটা তখনও বেঁচে থাকে। জলে সাপের মতো সাঁতার কাটে, গাছপালার ডালে শরীরটাকে জড়িয়ে রাখে। আমার ধারণা, বাড়িটা নিজে বাঁশি বাজায়। তার সঙ্গে ওই সরীসৃপ-মানুষগুলোও কখনও-কখনও বাজায়। এইভাবে বেশ কিছুদিন বেঁচে থাকার পর একদিন…একদিন ওরা আমার মতো…’ সোফায় বসে থাকা নানান বয়েসি পাঁচজন মানুষের দিকে ইশারায় দেখাল ডক্টর সেন, ‘…বা আমাদের মতো হয়ে যায়।’ একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ঘরের ছাদের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল। কিছুক্ষণ পর মুখ নামিয়ে টুনটুনদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমরাও এককালে সাঁতার কাটতাম, বাঁশি বাজাতাম। বাড়িটার বাঁশি তৈরির নেশা থেকেই যত সমস্যা।’
