এইভাবে বাড়িটার গোলকধাঁধায় পাক খেতে-খেতে ওরা একটা বিশাল ঘরে ঢুকে পড়ল। ঘরটা মাপে যেমন বড় তেমনই তার ছাদ তিরিশ ফুট উঁচুতে। ঘরে অনেকগুলো বালব জ্বলছে।
ঘরটায় একটা প্রকাণ্ড মাপের যন্ত্র বসানো। যন্ত্রটার হাজাররকম পার্টস। এবং নানানরকম শব্দ করে সেগুলো নড়ছে, কারণ যন্ত্রটা চলছে। অনেকগুলো সরু-সরু কাচের নল দিয়ে রঙিন কেমিক্যাল বয়ে চলেছে। কোনও-কোনও ইস্পাতের নল দিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে। একটা বিরাট ফাঁপা চামড়ার বল যন্ত্রের শব্দের তালে-তালে ফুলে উঠছে, চুপসে যাচ্ছে। তা থেকে ফোঁস-ফোঁস শব্দ হচ্ছে। এই শব্দটাই ওরা মাঝে-মাঝে শুনতে পাচ্ছিল। শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দের মতো মনে হচ্ছিল।
‘এটা কীসের যন্ত্র?’ বিশাল যন্ত্রটা জরিপ করতে-করতে অঙ্কিত বলল।
টুনটুন বলল, ‘কে জানে! পাইপে-পাইপে একেবারে জট পাকিয়ে গেছে।’
দিশা বলল, ‘সময় নষ্ট করে লাভ নেই, দাদাভাই। শানুদার খোঁজ করতে হবে যে…।’
ওরা ঘরটা থেকে বেরিয়ে আসতেই একটা চিৎকারের শব্দ কানে এল। কোনদিক থেকে শব্দটা আসছে সেটা ঠাহর করার চেষ্টা করতে-না-করতেই চিৎকারটা আবার শোনা গেল। ওরা তিনজনে সেদিক লক্ষ্য করে ছুটল।
দুটো ঘর পেরিয়ে তিন নম্বর ঘরে গিয়েই ওরা শানুকে দেখতে পেল। ওকে নিয়ে অদৃশ্য কারা যেন ছিনিমিনি খেলছে। অনেকটা ভলিবল খেলার ঢঙে ওকে নিয়ে লোফালুফি চলছে। কিন্তু সেই শক্তিশালী ‘খেলোয়াড়’-দের কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।
শানু ভয়ে চিৎকার করছিল। ওকে ওইরকম অবস্থায় দেখে অঙ্কিতরাও ভয়ে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল।
সঙ্গে-সঙ্গে খেলোয়াড়রা বোধহয় থেমে গেল। কারণ, শানু ধপাস করে খসে পড়ল পাথরের মেঝেতে। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল।
ওরা ছুটে গেল শানুর কাছে। ওকে ধরে তুলল। ওর কপালে বেশ খানিকটা কেটে গেছে, রক্ত পড়ছে। হাতে দু-জায়গায় ছড়ে গেছে। জামাকাপড় ছিঁড়ে গেছে বেশ কয়েক জায়গায়। বড়-বড় শ্বাস ফেলে হাঁপাচ্ছে। যন্ত্রণায় ‘উঃ! আঃ!’ করছে।
ওরা শানুকে নিয়ে ঘরের বাইরে চলে এল। টুনটুন জিগ্যেস করল, ‘শানুদা, তুমি কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে?’
‘জানি না। আমি তো সারাক্ষণ তোদের খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। এই বাড়িটা যেন কেমন। সবকিছু গুলিয়ে যায়।’
অঙ্কিত বলল, ‘চল, সবাই মিলে এবার বেরোনোর চেষ্টা করি—।’
ওরা দল বেঁধে রওনা হল। নীল আলোয় বেরোনোর পথ খুঁজতে লাগল।
ঠিক তখনই একটা বাঁশির সুর ভেসে উঠল বাতাসে। অদ্ভুত মিঠে সুরটা গোটা বাড়িটায় কেঁপে-কেঁপে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
ওরা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
‘কে বাঁশি বাজাচ্ছে?’ টুনটুন বলে উঠল।
‘জানি না।’ অঙ্কিত বলল,’তবে এই বাঁশির সুরটা সবাইকে টেনে নেয় বলে শুনেছি।’
‘টেনে নেয় মানে?’
‘মানে, হিপনোটাইজ বা ওরকম কিছু একটা করে বলে শুনেছি। বাঁশির এই সুরের ফাঁদে পড়ে অনেকে নাকি এই বাড়িটায় ঢুকে পড়েছে—আর বেরোতে পারেনি। তাদের আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি…।’
শানু ভয়ে-ভয়ে বলল, ‘আমাদের কী হবে?’
দিশা বলল, ‘ভয় পেলে চলবে না, শানুদা। যে করে হোক, এ-বাড়ি থেকে আমাদের বেরোতে হবে।’
ওরা আবার চলতে শুরু করল। কখনও সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল, কখনও নামতে লাগল। নানান ঘরে ঢুকতে লাগল—যে-কোনও দরজা পেলেই সেটা দিয়ে ঢুকে পরীক্ষা করতে লাগল বেরোনোর পথ পাওয়া যায় কি না। একইসঙ্গে অদ্ভুত বাড়িটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগল।
হঠাৎই একটা বড় মাপের ঘরে ঢুকে ওরা অবাক হয়ে গেল।
ঘরটা কোনতলায় ওরা জানে না। কারণ, এ-বাড়িতে ‘একতলা, দোতলা, তিনতলা’ শব্দগুলোর যে কোনও মানে নেই সেটা এতক্ষণে ওরা হাড়ে-হাড়ে বুঝে গেছে।
ঘরটায় ঝকঝকে আলো। একেবারে আধুনিক ড্রইংরুমের ধাঁচে সাজানো। লম্বা-লম্বা সোফা। মাঝে বড় মাপের সেন্টার টেবিল। টেবিলে ফুলদানি। রঙিন সুগন্ধি ফুলে সাজানো। ছাতা ধরা গন্ধটা আর টের পাওয়া যাচ্ছে না।
সোফাগুলোয় ছ’জন মানুষ বসে রয়েছে। তাদের বয়েস নানারকম। তবে সবচেয়ে বেশি বয়েসি মানুষটির মাথায় ধবধবে সাদা চুল, গালে সাদা দাড়ি, চোখে হাই পাওয়ারের চশমা। কেতাদুরস্ত পোশাকে ফিটফাট মানুষটি উচ্চতায় খাটো। তার ফরসা চামড়ায় অসংখ্য ভাঁজ।
ওদের দেখতে পাওয়ামাত্রই হাসি মুখে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। হাত সামনে বাড়িয়ে ওদের দিকে এগিয়ে আসতে-আসতে বলল, ‘ওয়েলকাম টু দ্য অ্যামেজিং ওয়ার্ল্ড অফ স্পেস-টাইম অ্যান্ড সুপারন্যাচারাল…।’
থতমত খেয়ে ওরা চারজনই ভদ্রলোকের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করল। কিন্তু অবাক চোখে হাঁ করে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
ভদ্রলোক বলল, ‘আমার নাম ডক্টর শিলাদিত্য সেন। লেখাপড়ার ডাক্তার। বহু বছর ধরে এই সময়ের ফাঁদে আটক রয়েছি। কবে ছাড়া পাব জানি না।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ডক্টর সেন: ‘নেহাত ভাগ্যচক্রে তোমাদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। নইলে এই বাড়িটার যা কারবার! কখন যে থ্রি ডায়মেনশনে থাকে আর কখন যে ফোর ডায়মেনশনে চলে যায় তার ঠিক নেই। এসো, এসো—বোসো—।’
একটা খালি সোফা দেখিয়ে ওদের বসতে বলল শিলাদিত্য সেন। ওরা চুপচাপ বসে পড়ল।
ওদের মন থেকে ভয়টা ধীরে-ধীরে সরে যেতে লাগল। আর একইসঙ্গে পেটের খিদে টের পেল ওরা। এই অদ্ভুত বাড়িতে ওদের কত সময় কেটে গেছে কে জানে!
