বিশ্বনাথ আর সময় নষ্ট করলেন না। চুপিসারে ব্রতীনের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। দরজাটা আলতো করে টেনে ভেজিয়ে দিলেন। তারপর চলে এলেন রাস্তায়।
ওঁর প্রথম বাইটের অ্যাডভেঞ্চার বেশ নিশ্চিন্তেই শেষ হল বলা যায়। তাই বাড়ি ফেরার পথে বিশ্বনাথ হালকা মনে রেণুকণার সঙ্গে ঠাট্টা-ইয়ারকিতে মেতে উঠলেন। শুধু ওঁর মুখের ভেতরে একটা আঁশটে গন্ধ লেগে ছিল। গন্ধটা বিশ্বনাথের খুব একটা খারাপ লাগছিল না।
তিতলির সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়াটা বিশ্বনাথের জীবনে একটা অলৌকিক ঘটনা। আর দেখা হলও এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে।
রাত তখন প্রায় এগারোটা। চৌরঙ্গি এলাকার বারগুলো তখন সবে সন্ধে শুরু করেছে। প্রতিটি বারের বাইরে লাল-নীল-সবুজ নিওন সাইন। তার পাশেই হলোগ্রাম ছবিতে প্রায়-নগ্ন ক্যাবারে নাচের বিজ্ঞাপন। হলোগ্রাম-নর্তকী সুরের ঝংকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শরীরের নানান প্রত্যঙ্গ নাচিয়ে চলেছে। আলো আর সুরের মেলা জাঁকিয়ে বসেছে রাস্তাটায়।
বিশ্বনাথ আপনমনে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। চারপাশের প্রাপ্তবয়স্ক জগৎ দেখছিলেন।
বারগুলোর বাইরে মানুষজনের জটলা। কেউ হাসি-ঠাট্টায় মেতে আছে। কেউ চাপা গলায় বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছে, কেউ-বা ঢলানি সঙ্গিনীর কোমর জড়িয়ে ধরে অসভ্যতায় মেতেছে।
আনমনা হাঁটতে-হাঁটতে ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামটা সবে ছাড়িয়েছেন, হঠাৎই দেখলেন একটা গাড়ি ছুটে এসে একটা গাড়ির গায়ে রুক্ষভাবে ধাক্কা মারল। ধাতু আর প্লাস্টিক ভেঙে পড়ার শব্দ হল। তারপর চেঁচামেচি।
জায়গাটায় আলো বেশি ছিল না। কিন্তু বিশ্বনাথের দেখতে কোনও অসুবিধে হচ্ছিল না। অন্ধকারে দেখতে পাওয়ার ক্ষমতাটা ওঁর দিনকেদিন জোরালো হয়েছে। চশমা ব্যবহার করা ছেড়ে দিয়েছেন সপ্তাহদুয়েক আগেই। আলোক আর পারমিতা এতে অবাক হলেও কোনও মন্তব্য করেনি।
বিশ্বনাথ দেখলেন, প্রথম গাড়ির ড্রাইভিং সিট থেকে চট করে রাস্তায় বেরিয়ে এল একটি মেয়ে। তারপর পাশের একটি সরু রাস্তা ধরে প্রাণপণে ছুট লাগাল।
পিছনের গাড়ির দরজা খোলা-বন্ধের শব্দ হল। তিনটি লোক নেমে পড়েছে গাড়ি থেকে। নেমেই ধাওয়া করেছে ঊর্ধ্বশ্বাস ছুটে পালানো মেয়েটিকে।
বিশ্বনাথের ভেতরে একটা ভ্যাম্পায়ার জেগে উঠল। তিনি ছুটলেন লোকগুলোর পিছনে।
শরীরের এই জোর কোথা থেকে পেলেন সে-প্রশ্নের উত্তর দিকে পারেননি মালাকার। শুধু বলেছেন, ‘দেখুন, এটাকে আমরা বলি এক্স-ফ্যাক্টর। হিউম্যান ফ্যাক্টর, চান্স ফ্যাক্টর, আননোন ফ্যাক্টর—এইসব মিলেমিশেই এক্স-ফ্যাক্টর তৈরি। তবে এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই—শুধু বলব, এনজয় ইয়োর নিউ লাইফ, বাট প্লে ইট সেফ। বুঝতেই তো পারছেন…।’
এখন সেই এক্স-ফ্যাক্টর নিয়েই ছুটছিলেন বিশ্বনাথ।
রাস্তার দুপাশে পুরোনো আমলের বড়-বড় বাড়ি। তার সীমানায় বিশাল-বিশাল অন্ধকার গাছ। গাছের অচেনা ফুলের গন্ধ বিশ্বনাথের নাকে আসছিল।
রাস্তা নির্জন বলে ছুটন্ত পায়ের শব্দ দিব্যি শুনতে পাচ্ছিলেন। এ ছাড়া আরও শব্দ কানে আসছিল। কুকুরের ঘেউঘেউ, গাছের পাতার খসখস, রাতপোকার ডাক। অপারেশানের পর থেকে এরকম কত সূক্ষ্ম শব্দই যে শুনতে পান!
সত্যি, এই জীবনটা একদম নতুন—মানে, নতুন ধরনের।
গত দু-মাসে বেশ কয়েকজন ক্লায়েন্টকে সন্তুষ্ট করেছেন বিশ্বনাথ। তাই হাতে টাকাও এসেছে ভালোই। আর যতই টাকা এসেছে বিশ্বনাথের স্বাধীনচেতা মন ততই মাথাচাড়া দিয়েছে। আলোক আর পারমিতার শাসন থেকে অল্প-অল্প করে বেরিয়ে এসেছেন বাইরে।
এখন খুশিমতন বাইরে বেরোন, পছন্দসই খাবার মাঝে-মধ্যে কিনে খান, হলে গিয়ে সিনেমাও দেখে ফেলেন টুকটাক।
আলোক বা পারমিতার বেশিরভাগ অভিযোগেরই কোনও উত্তর দেন না। এক কান দিয়ে ঢোকান, অন্য কান দিয়ে বের করে দেন। আর ভিক্টরকে একটু সামলে চলেন। কারণ, এখন ওঁকে দেখলেই ভিক্টর কেমন যেন লোম খাড়া করে চাপা গরগর শব্দ করতে থাকে। ঠোঁট পিছনে টেনে ধারালো দাঁতের পাটি হিংস্রভাবে মেলে ধরে।
যত যা-ই হোক, নতুন জীবনটার মধ্যে যে একটা রোমাঞ্চ আছে সেটা বিশ্বনাথ স্বীকার করেন।
এখন, অন্ধকার রাস্তা ধরে ছুটে যেতে-যেতে, সেই রোমাঞ্চটাই টের পাচ্ছিলেন।
একটু পরেই রাস্তাটা একটা গলির মুখে এসে পড়ল। আর তখনই লোক তিনটে মেয়েটাকে ধরে ফেলল।
মেয়েটা ভয়ে চিৎকার করে উঠল। রাস্তার আলোয় ওর ভয় পাওয়া ফরসা মুখ ঝলসে উঠল।
বিশ্বনাথ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বড়-বড় শ্বাস নিতে লাগলেন।
এতক্ষণ একটা ঝোঁকের মাথায় ছুটে এসেছেন। বয়েসটার কথা ভাবেননি। এখন যেন হঠাৎই খেয়াল হল, ওরা তিনজন, আর বিশ্বনাথ একা।
লোক তিনটে তখন মেয়েটাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। আর মেয়েটা প্রতিবাদ আর যন্ত্রণার চিৎকার করে উঠছিল বারবার।
রেণুকণা যে পাশেই ছিলেন বিশ্বনাথ টের পাননি। হঠাৎই শুনলেন ওঁর চাপা ফিসফিসে গলা: ‘কী হল, যাও—মেয়েটাকে বাঁচাও…।’
‘ওরা তিনজন—আর আমি একা…।’ কাতর গলায় মিনমিন করে বললেন বিশ্বনাথ।
খিলখিল করে হাসলেন রেণুকণা: ‘আরে পাগল! ওরা মানুষ—আর তুমি ভ্যাম্পায়ার! এই নতুন জীবনটাকে ভালো কাজে লাগানোর চেষ্টা করো। যাও!’
এই আদেশের পর আর কোনও কথা চলে না।
বিশ্বনাথ চোখের পলকে ছুটে চলে গেলেন জটলার কাছে। সামনে যে-লোকটাকে পেলেন তার হাত ধরে এক টান মারলেন।
