ওর মাথা গুলিয়ে গেল। অঙ্কিতকে বলল, ‘এ-বাড়িটার দিকগুলো কেমন যেন জট পাকানো। এই যে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলাম—সেটা কি উঠে এলাম, নাকি নামলাম?’
অঙ্কিত বলল, ‘আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। ওই দ্যাখো, জলের মধ্যে কী!’
টুনটুন অঙ্কিতের ইশারা লক্ষ্য করে তাকাল। পুকুরের কালচে জলে আলোড়ন। কিছু একটা জলের ওপরে এসে শরীরটা আবার পাক খাইয়ে জলের গভীরে তলিয়ে গেল।
টুনটুন পুকুরের ঘাটের কাছে এগিয়ে গেল। আলোটা এখন আরও কমে গেছে বলে মনে হল। তারই মধ্যে ও নজর চালিয়ে দেখতে চেষ্টা করল। কোথায় গেল প্রাণীটা? যদি ওটা সত্যিই কোনও প্রাণী হয়।
একটু পরে প্রাণীটাকে দেখতে পেল টুনটুন। একটা নয়—অন্তত চার-পাঁচটা। জলে ঝটাপটি তুলে সাঁতরে বেড়াচ্ছে। তবে মাছের মতো নয়—সাপের মতো। মাথায় কালো রঙের চুল বা সেরকম কিছু রয়েছে। লম্বা তেলা মাছের শরীর। দুপাশে দুটো পাখনার মতো। আর লেজও একটা নয়—দুটো।
টুনটুন আর অঙ্কিত অবাক হয়ে প্রাণীগুলোকে দেখতে লাগল। সাপের মতো, অথচ সাপ নয়। এ কোন আশ্চর্য সরীসৃপ!
ঠিক তখনই ওরা দেখল, উলটোদিকের ঘাটের সিঁড়ির ধাপ বেয়ে ওপরে উঠছে দুটো সরীসৃপ। ভেজা ন্যাকড়ার মতো নরম ওদের শরীরে সিঁড়ির ধাপের আদলে ভাঁজ পড়েছে।
ওদের বিস্ময় ভরা চোখের সামনে সরীসৃপ দুটো এগিয়ে গেল একটা স্তম্ভের কাছে। ওটার গায়ে পাক খেয়ে লেপটে রইল।
টুনটুনের মনে পড়ে পেল সেই রাতের কথা। দিশাদের বাড়ি থেকে ও আর শানু যখন বৃষ্টির মধ্যে ফিরছিল। গাছ থেকে সাপের মতো কী একটা যেন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পুকুরের জলে।
টুনটুন বলল, ‘অঙ্কিতদা, এরকম একটা পিকিউলিয়ার সাপ আমি আর শানুদা দেখেছিলাম। সেদিন রাতে তোমাদের বাড়ি থেকে ফেরার সময়…।’
‘এটা আবার কী টাইপের সাপ রে! দুটো লেজ…মাথায় চুল…।’
‘কী জানি!’
এমন সময় একটা মেয়েলি চিৎকার শুনতে পেল ওরা। কিন্তু কোনদিক থেকে চিৎকারটা এল সেটা ঠিক বুঝতে পারল না।
অঙ্কিত আর টুনটুন মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তারপরই ওরা ছুটতে শুরু করল সিঁড়ির দিকে।
কিন্তু কোথায় সিঁড়ি!
ভয়ে কাঁটা হয়ে ওরা দুজনে সিঁড়িটাকে খুঁজতে শুরু করল।
একটু পরেই অবাধ্য সিঁড়িটাকে খুঁজে পেল ওরা। যে-সিঁড়িটাকে ডানদিকের দেওয়াল ঘেঁষে খুঁজে পাওয়ার কথা সেটাকে পাওয়া গেল একেবারে বাঁ-প্রান্তে। এটুকু সময়ের মধ্যে পাথরের সিঁড়িটা যে কী করে নড়েচড়ে সরে এল সেটা কে জানে!
ওরা সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করল। চিৎকারটা তখনও নীচ থেকে ভেসে আসছে।
নীচে এসে ওরা দেখল দোতলার চেহারাটা আর আগের মতো নেই। সেখানে এখন বিশাল মাপের একটা হলঘর। তার সিলিং-এ কয়েকটা বালব জ্বলছে। কী করে জ্বলছে সেটা বোঝা মুশকিল—কারণ, কোথাও ওয়্যারিং বা সুইচের কোনও চিহ্নমাত্র নেই।
হলঘরের দূরের কোণে একটা মেয়ে ভেজা বেড়ালের মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে কাঁপছে। দু-হাত বুকের কাছে জড়ো করা। আর প্রকাণ্ড হাঁ করে প্রবল চিৎকার করছে।
দিশা! দিশাকে খুঁজে পেয়েছে ওরা। কিন্তু দিশা ওদের দেখতে পেল না। কারণ, ও তখন ঘরের মেঝের দিকে তাকিয়ে একটানা চিৎকার করে চলেছে। হলঘরের মেঝেতে চলে-ফিরে বেড়োচ্ছে অসংখ্য কালো ছায়া। ছায়াগুলোর চেহারা নানান রকমের। ওরা মেঝেতে লেপটে চলে বেড়াচ্ছে। কিন্তু যে-কায়া থেকে ছায়াগুলো তৈরি হয়েছে তাদের কোনও হদিস নেই। শুধু মেঝেতে আর দেওয়ালে চলন্ত ছায়া কিলবিল করছে।
‘দিশা! দিশা!’ চিৎকার করে উঠল অঙ্কিত। ছায়াগুলো মাড়িয়ে ও ছুট লাগল দূরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা অসহায় মেয়েটার দিকে। টুনটুনও মরিয়া হয়ে দৌড়ল ওর পিছনে।
সঙ্গে-সঙ্গে ছায়াগুলো মিলিয়ে যেতে লাগল পটাপট। আর ঘরের বাতাসে এক অলৌকিক ঝড় উঠল। ঘন বাতাস ঘূর্ণিপাক তুলে হলঘরের মধ্যে তাণ্ডব নৃত্য নেচে বেড়াতে লাগল। মাথার ওপরে ঝুলন্ত বালবগুলো পেন্ডুলামের মতো দুলতে লাগল।
অঙ্কিত ছুটে গিয়ে পাগলের মতো জাপটে ধরল দিশাকে। আনন্দে কাঁদতে শুরু করল। দিশাও ‘দাদাভাই! দাদাভাই!’ বলে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
টুনটুন দিশাকে ভরসা দিয়ে বারবার বলতে লাগল, ‘ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না। আমরা এসে গেছি…।’
ভাই-বোন একটু সামলে নেওয়ার পর টুনটুন জিগ্যেস করল, ‘শানুদা কোথায়?’
ঘরের মধ্যে ঝড় সাঁইসাঁই আওয়াজ তুলছিল। ঝোড়ো বাতাসে সকলের চুল উড়ছিল।
দিশা ফুঁপিয়ে কাঁদতে-কাঁদতে বলল, ‘শানুদা কোথায় জানি না। দোতলা না তিনতলায় যেন একবার দেখেছিলাম। কীসের ভয়ে পাগলের মতো ছুটে পালাচ্ছে।’
দিশাকে অবাক চোখে দেখছিল টুনটুন।
কী চেহারা হয়েছে ওরা! চোখের কোলে কালি। গাল দুটো বসে গেছে। চুড়িদার এখানে-ওখানে চেঁড়া। যেন একটা সাইক্লোন বয়ে গেছে ওর ওপর দিয়ে।
অঙ্কিত বলল, ‘এ-বাড়িটার ঘর, সিঁড়ি—কিছুই ঠিকঠাক বোঝা যাচ্ছে না। চলো, আমরা একসঙ্গে থেকে এলোমেলো এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াই। দেখি, বেরোনোর দরজাটা খুঁজে পাই কি না। এইভাবে হয়তো শানুর খোঁজও পেয়ে যেতে পারি—।’
ওরা তিনজন আর দেরি করল না। হলঘরের একটা বড় দরজা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল। তারপর যেদিকে দু-চোখ যায় সেদিকেই চলতে শুরু করল। কখনও সিঁড়ি, কখনও বারান্দা, কখনও অলিন্দ ধরে ওরা ছুটতে লাগল, আর মাঝে-মাঝেই শানুর নাম ধরে ডাকতে লাগল।
