টুনটুনের সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল। পুলিশের লোক এসেই বা কী করে ওদের উদ্ধার করবে? লোকজন জোগাড় করে ওরা কি এই বাড়িটাকে ভেঙেচুরে একেবারে শেষ করে দিতে পারবে?
এমন সময় রক্ত হিম করা একটা চিৎকার টুনটুনকে পাথর করে দিল।
চিৎকারটা লম্বায় অনেক বড়। গলার স্বর এতটাই কর্কশ যে, মনে হল, ভাঙাচোরা গলা নিয়ে কেউ বাঁচার আকাঙ্ক্ষায় চরম চিৎকার করছে।
হয় শানু, নয় অঙ্কিত। টুনটুনের মনে হল, চিৎকারের মালিক ওদেরই কেউ একজন। যদি তাই হয় তা হলে ওর সঙ্গে টুনটুনের কি আর দেখা হবে!
আর দেরি করল না ও। মাথার চক্কর সামলে নিয়ে চেঁচিয়ে ডেকে উঠল, ‘শানুদা! অঙ্কিতদা!’ তারপর ঘরের দরজা লক্ষ্য করে তীব্র ছুট লাগাল।
ঠিক তখনই বিছানার সাদা চাদরটা ভেসে উঠল শূন্যে। সমুদ্রের জলের মতো ঢেউ তুলে ধীরে ধীরে নেমে এল ঘরের মেঝেতে। ঠিক যেন প্যারাশুটে ভর করে অদৃশ্য কেউ ঘরের মেঝেতে ‘ল্যান্ড’ করল।
ব্যাপারটা এমন আচমকা ঘটে গেল যে, আর-একটু হলেই টুনটুনের পা চাদরের ওপরে পড়ছিল। ছুটন্ত গাড়ি যেভাবে ব্রেক কষে অনেকটা সেভাবেই নিজেকে কোনওরকমে থামিয়ে দিল ও।
আর তখনই ওকে অবাক করে দিয়ে চাদরের ঠিক মধ্যিখানটা ফুলে উঠতে শুরু করল। এবং ফোলা জায়গাটা ক্রমেই খাড়াভাবে উঁচু হয়ে উঠতে লাগল। চাদরে ঢাকা একটা ফুটবল শূন্যে ভেসে উঠলে যেমন হয়।
টুনটুনের মনে হল, চাদর ঢাকা একটা মানুষ কীভাবে যেন মেঝেতে লেপটে ছিল—এবার অদ্ভুতভাবে মাথা চাড়া দিয়ে ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়াচ্ছে।
ও চিৎকার করতে চায়নি। কিন্তু চিৎকারটা নিজে থেকেই বেরিয়ে এল বাইরে। সহজে থামতে চায় না এমন চিৎকার। আর সেই চিৎকারের স্বরটাও এমন যে, টুনটুনের মনে হল, ও নয়, অন্য কেউ চিৎকার করছে।
চাদরের অবয়বটা খাড়া স্তম্ভের মতো টুনটুনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, আর ওর চিৎকার চলছিল—একবার, দুবার, তিনবার।
চার নম্বর চিৎকার শুরু হতেই সাদা চাদরটা ধীরে-ধীরে ফিকে হয়ে গিয়ে শূন্যে মিলিয়ে গেল।
টুনটুন কুলকুল করে ঘামতে শুরু করেছিল। হাঁপাচ্ছিল হাপরের মতো। ঘরটার চারপাশ সতর্ক চোখে দেখছিল। নীলচে গোধূলি আলো আর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দটা এখন ওকে বেশ ভয় পাইয়ে দিচ্ছিল। ও কোনওরকমে পাশের ঘরের দিকে রওনা হল। যাওয়ার সময় পালঙ্কের দিকে ভয়ের চোখে তাকাল বেশ কয়েকবার।
বারান্দায় এসেই ও অঙ্কিতকে দেখতে পেল।
এ কী উদভ্রান্তের মতো চেহারা হয়েছে ওর! মাথার চুল এলোমেলো। টি-শার্টে কালির দাগ। চোখে আতঙ্ক।
‘শানুদা কোথায়?’ টুনটুন হাঁপাতে-হাঁপাতে জিগ্যেস করল।
‘জানি না। ও তো ওদিকের ঘরটায় ঢুকেছিল…।’ আঙুল তুলে দূরের একটা ঘর দেখাল অঙ্কিত।
‘তুমি কি একটু আগে চিৎকার করছিলে?’
‘হ্যাঁ। ও-ঘরটায় একটা পিকিউলিয়ার ব্যাপার আছে—।’ সামনের একটা ঘরের খোলা দরজার দিকে দেখাল ও: ‘ঘরের দেওয়ালগুলো হঠাৎ কাঁপতে শুরু করেছিল। তারপর…একবার ফেঁপে উঠছিল, আর-একবার চুপসে যাচ্ছিল। বেলুনের মতো। তা ছাড়া দেওয়ালের গা বেয়ে একরকম কষ বেরিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল। সেসময় একটা দেওয়াল ফুলে উঠে আমাকে পেছন থেকে ধাক্কা মেরে দেয়। তারপরই দেখি আমার টি-শার্টের পিঠটা দেওয়ালে আটকে গেছে—কিছুতেই ছাড়াতে পারছিলাম না। তখন ভয়ে…।’
‘দিশা…দিশা…কোথায়?’
‘জানি না। চলো, আমরা দুজনে মিলে একটু খুঁজে দেখি। আমার…আমার ভীষণ ভয় করছে…।’ কথা বলতে-বলতে হঠাৎই অঙ্কিতের খেয়াল হল টুনটুন হাঁপাচ্ছে। তাই ও জিগ্যেস করল, ‘তোমার কী হয়েছে? এরকম হাঁপাচ্ছ কেন? চোখ-মুখ কেমন হয়ে গেছে…।’
টুনটুন অঙ্কিতের হাত আঁকড়ে ধরল। বলল, ‘এ-ঘরটায় আমিও কতকগুলো বিচ্ছিরি ব্যাপার দেখেছি। বিশ্বাস হচ্ছে না, কিন্তু নিজের চোখে দেখেছি। চলো, বলছি…।’
যে-ঘর থেকে টুনটুন একটু আগে বেরিয়ে এসেছে সেদিকে ভয়ের চোখে তাকিয়ে ও ঘরের দরজাটা একরকম দৌড়ে পেরিয়ে গেল। অঙ্কিতের সঙ্গে সিঁড়ির দিকে যেতে-যেতে ও সব বলল—বাড়িটাকে ঘিরে থাকা রাতের আকাশের কথা, বিছানার চাদরের কথা।
অঙ্কিত হঠাৎই অসহায় গলায় বলে উঠল, ‘টুনটুন, আমরা কি আর এ-বাড়ি থেকে বেরোতে পারব না?’
টুনটুন চারদিকে চোখ বুলিয়ে বিচিত্র বাড়িটাকে দেখল, বলল, ‘বেরোতে হবেই…যে করে হোক। বাড়িটা যতই ভয় দেখাক…আমরা…।’
টুনটুনের কথা আটকে-আটকে যাচ্ছিল। হঠাৎই ও দিশা আর শানুর নাম ধরে ডাকতে শুরু করল।
অঙ্কিত বুঝল, এটা ভয় তাড়ানোর একটা চেষ্টা। তাই ও আর দেরি করল না—টুনটুনের সঙ্গে গলা মেলাল।
কয়েকবার ডাকাডাকির পর ওরা থামল। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করল।
টুনটুন জোর করে নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করছিল যে, ভয় পেয়ে কোনও লাভ নেই। কারণ, ইচ্ছে করলেই এ-বাড়ি থেকে ওরা বেরোতে পারবে না। তা ছাড়া দিশার খোঁজ করতে হবে, শানুর খোঁজ করা দরকার। এত বড় বাড়ি! কে জানে, এর কোন ঘরে কোন আনাচেকানাচে ওরা হারিয়ে গেছে।
তিনতলায় এসেই টুনটুন আর অঙ্কিত অবাক হয়ে গেল।
ওদের সামনে সেই চৌকো পুকুর। তার চারকোণে চারটে-স্তম্ভ। দোতলা থেকে নীচের দিকে তাকিয়ে ওরা পুকুরটাকে দেখেছিল। তাই পুকুরটা একতলায় বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে ওটা তিনতলায়!
ওপরদিকে তাকাল টুনটুন। ছাতার মতো সেই প্রকাণ্ড ঢাকনা।
