নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে ওরা ওপরে উঠতে শুরু করল। আর ঠিক তখনই ওরা খেয়াল করল, কোথা থেকে যেন একটা হালকা শব্দ ওদের কানে আসছে। শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দের মতো। খুব ঢিমে তালে কেউ যেন শ্বাস নিচ্ছে, আবার ছাড়ছে।
‘কীরে, কোনও মেশিন-টেশিন চলছে নাকি?’ অঙ্কিতের দিকে তাকিয়ে শানু জিগ্যেস করল।
‘কে জানে!’ ঠোঁট ওলটাল অঙ্কিত: ‘কামারশালায় যেরকম শব্দ হয় অনেকটা সেই টাইপের—না?’
‘হ্যাঁ—।’
ওরা দোতলায় উঠে এল। এবার বাড়ির ভেতরের চেহারাটা ওদের কাছে স্পষ্ট হল।
একতলায় ওরা কোনও ঘরের দরজা দেখেনি। অবশ্য সেভাবে খোঁজেওনি। কিন্তু দোতলায় এসে অনেকগুলো দরজা চোখে পড়ল। আরও বুঝতে পারল, বাড়িটা মাপে বিশাল।
বাড়িটার ভেতরের রকমসকম অনেকটা পুরোনো দুর্গের মতো। দোতলার লম্বা বারান্দাটা একটা প্রকাণ্ড বর্গক্ষেত্রের পরিসীমা বরাবর পাক খেয়ে গেছে। বারান্দা থেকে নীচে তাকালে একটা খোলা জায়গা চোখে পড়ে। সেই চাতালের ঠিক মাঝখানে একটা চৌকো পুকুরের মতো। পুকুরটার পাড় বাঁধানো। আর পুকুরে নামার জন্য চারদিকেই পাথরের সিঁড়ি রয়েছে। পুকুরের চারকোণে চারটে বড়-বড় থাম। তার গায়ে নানান নকশা। তবে জায়গায়-জায়গায় সিমেন্ট খসে গেছে। শ্যাওলা ও ময়লা জমে নকশা চাপা পড়ে গেছে। এ ছাড়া থামগুলোয় জড়িয়ে রয়েছে নানান গুল্মলতা।
পুকুরের জলের রং যা-ই হোক, এখন সেটা কালো দেখাচ্ছে। আর বারান্দা থেকে ঝুঁকে পুকুরের দিকে তাকিয়ে ওরা কোনওরকম প্রতিফলন দেখতে পেল না।
জলে আকাশের ছায়া না দেখতে পেয়ে ওপরদিকে তাকাল টুনটুন। না, সেখানে খোলা আকাশ নেই। বরং রয়েছে ছাতার মতো একটা প্রকাণ্ড ঢাকনা। সেই ঢাকনার কোথাও-কোথাও ফাটল কিংবা গর্ত রয়েছে। সেই ফাঁক দিয়ে আকাশের শেষ আলো চোখে পড়ছে।
ওরা তিনজন প্রথমে বারান্দাটা একটা চক্কর দিয়ে ফেলল। ‘দিশা! দিশা!’ করে বারকয়েক ডাকল। উত্তর দিল প্রতিধ্বনি।
অঙ্কিত বলল, ‘চল, এবার ঘরগুলো খুঁজে দেখি। তারপর তিনতলাটা দেখব।’
শানু আর টুনটুন ওর কথায় সায় দিল।
দোতলায় ওটার সময় সিঁড়ির ধাপ যে আরও ওপরদিকে উঠে গেছে সেটা ওরা খেয়াল করেছে। তবে টুনটুনের মনে প্রশ্ন জাগছিল, কালো বাড়িটা ক’তলা? বাইরে থেকে বাড়িটাকে দেখে ওর কখনও মনে হয়নি ওটা দোতলার বেশি। কিন্তু বাড়ির ভেতরে ঢুকে ঘোরাঘুরি করে ওর মনে হচ্ছে, তিনতলা কেন, বাড়িটা চারতলাও হতে পারে। তবে বাড়িটাকে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ ও এখনও পর্যন্ত খুঁজে পাচ্ছিল না। শুধু শ্বাস-প্রশ্বাসের ওই চাপা শব্দটা একটা অস্বস্তি তৈরি করছে। ওটা এখনও হয়ে চলেছে। টুনটুন ভাবল, সবক’টা ঘর তল্লাশি করে দেখলেই ওটার রহস্য ভেদ করা যাবে। হয়তো জানলা দিয়ে জোলো বাতাস ঢুকে ওরকম অদ্ভুত শব্দ তৈরি করছে।
দিশার নাম ধরে ডাকতে-ডাকতে ওরা তিনজনে তিনটে ঘরের দরজা লক্ষ্য করে দৌড়ল।
বাড়ির ভেতরে কোথাও কোনও ইলেকট্রিক বালব, টিউবলাইট কিংবা পাখা ওদের চোখে পড়েনি। শুধু তাই নয়, কোনও ওয়্যারিং বা সুইচবোর্ডও নেই। মনে হয়, এসব ব্যবস্থা এ-বাড়িতে কোনওকালেই ছিল না। তা হলে কি বাড়িটা মোমবাতি-হ্যারিকেন কিংবা প্রদীপ-কুপির যুগে তৈরি?
এসব কথা ভাবতে-ভাবতে টুনটুন একটা ঘরে ঢুকে পড়ল।
ঘরটা বেশ বড়। ঘরে একটা প্রকাণ্ড কাঠের আলমারি। তার পাল্লার ওপরে দুটো লম্বা- লম্বা আয়না লাগানো। আর একদিকে একটা একমানুষ সমান আলনা। তাতে বেশ কয়েকটা নোংরা ছেঁড়া কাপড় ঝুলছে। আলনার উলটোদিকের দেওয়াল ঘেষে একটা বড় পালঙ্ক। পালঙ্কে এলোমেলোভাবে পড়ে আছে দুটো বালিশ আর দুটো কোলবালিশ। দু-একটা বালিশের খোল ফেটে তুলো বেরিয়ে এসেছে। বিছানায় একটা সাদা চাদর পাতা রয়েছে। তার প্রান্তটা পালঙ্কের দুপাশে পরদার মতো ঝুলছে।
গোটা ঘরের সর্বত্র ধুলো আর ধুলো। আর তার সঙ্গে পুরোনো ছাতা ধরা গন্ধ।
টুনটুন দেখল, ওর মুখোমুখি দেওয়ালে দুটো জানলা হাট করে খোলা।
ও খুব অবাক হল। কারণ, আগে যখনই ও কালো বাড়িটাকে দেখেছে তখন একটা জানলাও ওর নজরে পড়েনি। কিংবা এমন হতে পারে, জানলা সব বন্ধ ছিল এবং শ্যাওলার পরত জানলার পাল্লা আর দেওয়ালকে এমনভাবে ঢেকে দিয়েছে যে, আলাদা করে আর চেনা যায়নি।
কী এক কৌতূহলে জানলার কাছে ছুটে গেল টুনটুন। চোখ মেলে বাইরে তাকাল। তারা ভরা আকাশ ওর নজরে পড়ল।
হঠাৎই ওর খেয়াল হল, কোনও গাছপালা, বাড়িঘর কিংবা আলোর বিন্দু—কিছুই ওর চোখে পড়ছে না। সবটাই শুধু রাতের আকাশ—মেঘহীন, পরিষ্কার। দেখে মনেই হয় না, এই আকাশ ক’দিন ধরে কী বৃষ্টিই না দিয়েছে!
কিন্তু এই অল্প সময়ে আকাশটা কী করে এত ঝকঝকে হয়ে গেল?
এ-কথা ভাবতে-ভাবতে ও নীচের দিকে তাকাল। আর তাকিয়েই ওর মাথাটা কেমন টলে গেল।
এ কী দেখছে ও? নীচের দিকে তাকিয়েও সেই রাতের আকাশ!
আকাশটা কি এই বাড়িটাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছে? এমনকী নীচ থেকেও?
টুনটুনের মাথাটা পাক খেয়ে গেল। ওর চারপাশটা কেমন দুলে উঠল। তাড়াতাড়ি দেওয়াল ধরে ও সামলে নিল। কিন্তু একইসঙ্গে ভয় পেয়ে গেল। এ-বাড়ি থেকে ওরা বেরোবে কেমন করে? দরজা বন্ধ। জানলা দিয়ে তাকালে তিলকপুরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না—শুধু আকাশ আর আকাশ।
