‘কালো বাড়িতে? বলিস কী!’
শানু আর কথা না বাড়িয়ে আচমকা ফোন রেখে দিল।
অঙ্কিত ততক্ষণে দুটো ছেলেকে থানায় রওনা করে দিয়েছে। বলেছে, বড়বাবুকে ব্যাপারটা বলে যেমন করে হোক স্পটে নিয়ে আসতে।
টুনটুন লক্ষ করল, অঙ্কিতের মুখ ফ্যাকাসে, দিশেহারা। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না।
ও শানুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘শানুদা, শিগগির চলো। এখনও আলো আছে। বাড়িটার ভেতরে ঢুকে দিশাকে নিয়ে আসি। এরপর সন্ধে হয়ে গেলে…।’
অঙ্কিত ইতস্তত করতে লাগল। দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের মুখের দিকে তাকিয়ে যেন পরামর্শ শুনতে চাইল।
টুনটুন অঙ্কিতের কাছে গিয়ে ওর হাত ধরে টান মারল: ‘অঙ্কিতদা, জলদি করো! দেরি হয়ে গেলে দিশার যদি কিছু একটা হয়ে যায়…প্লিজ…।’
টুনটুনের গলা ভেঙে গেল। চোখে জল এসে পড়ল।
তখনই ও খেয়াল করল, অঙ্কিতের চোখও শুকনো নেই।
এমন সময় শানু আর অঙ্কিত দুজনেরই মোবাইল বাজতে শুরু করল। ওরা চটপট ফোন ধরে কথা বলতে শুরু করল।
কথা শুনে টুনটুন বুঝতে পারল ওরা ওদের বাবার সঙ্গে কথা বলছে।
অঙ্কিত ফোনে কথা বলতে-বলতে কেঁদে ফেলল। বলল, ‘তোমরা যা করার তাড়াতাড়ি করো। এদিকে আমরা দেখছি…।’ তারপর ফোন কেটে দিল।
শানুও একই ধরনের কথা বলে ফোন শেষ করল।
অঙ্কিত চোখ মুছল। নিজেকে সামলে নিতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিল। তারপর বলল, ‘চল—।’ বলে কালো বাড়িটার দিকে এগোল।
টুনটুন আর দেরি করল না। শানুর হাত ধরে এক টান মেরে অঙ্কিতের সঙ্গে এগোল।
জনতার ভিড় থেকে রব উঠল, ‘যেয়ো না! ও-বাড়িতে ঢুকো না! আগে পুলিশ আসুক…।’
অঙ্কিত একপলকের জন্য পিছনে ফিরে তাকাল শুধু। কোনও কথা বলল না। উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে দেখল। দিশা ওর ছোট বোন—ওদের নয়।
আবার কালো বাড়িটার দিকে পা চালাল অঙ্কিত। সঙ্গে শানু আর টুনটুন।
জল-কাদা আর ঘাস মাড়িয়ে ওরা বেশ কষ্ট করে এগোতে লাগল। টুনটুন কান পেতে শুনতে চাইল দিশার চিৎকার।
শানু বলল, ‘পুলিশ এখুনি এসে পড়বে।’ ওর কথাটা অনেকটা ভরসা খোঁজার মতো শোনাল।
একটু পরেই ওরা বাড়ির সিংদরজায় পৌঁছে গেল। অঙ্কিত দিশার নাম ধরে চিৎকার করে ডাকল। তারপর পালা করে টুনটুন আর শানুও চেঁচাল। কিন্তু দিশার কোনও উত্তর পাওয়া গেল না।
অঙ্কিত আচমকা একটা সাহসের জোয়ার দেখিয়ে গটগট করে ঢুকে পড়ল বাড়ির এলাকায়। টুনটুন আর শানুও দেরি করল না।
বাড়িটার এত কাছে এসে শ্যাওলা ধরা দেওয়ালগুলো আরও ভালো করে দেখতে পাচ্ছিল টুনটুন। ভিজে চকচকে জমাট শ্যাওলা। সেইসঙ্গে ছাতা ধরা গন্ধটা ভয়ংকর তীব্র হয়ে নাকে আসছিল।
এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে ওরা খোলা জায়গাটা পেরিয়ে গেল। সামনেই কালো বাড়ির কালো রঙের বিশাল সদর দরজা। দরজার পাল্লায় বেশ কয়েকটা লোহার গজাল বসানো। ওগুলোর মাথা বিষফোঁড়ার মতো উঁচু হয়ে রয়েছে। পাল্লা দুটোর নানান জায়গায় ফাটল ধরা। এখানে-ওখানে কাঠের চটা উঠে গেছে। ধুলো আর ময়লায় দরজাটা মলিন। দরজার ফ্রেমের কোনা থেকে ছোট-বড় গাছ বেরিয়ে গেছে।
দরজার পাল্লা দুটো বেশ খানিকটা ফাঁক হয়ে আছে। এই ফাঁক দিয়েই দিশা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেছে। ওরা নজর চালিয়ে বাড়ির ভেতরটা দেখতে চেষ্টা করল। কিন্তু নিকষ অন্ধকার ছাড়া কিছুই চোখে পড়ল না।
অঙ্কিত দরজার ফাঁকের কাছে মুখ নিয়ে চিৎকার করে ডাকল: ‘দিশা—! দিশা—!’
কোনও সাড়া নেই।
টুনটুন দিশার নাম ধরে ডাকল দুবার।
কোনও উত্তর নেই।
‘চল—’ বলে দরজার একটা পাল্লা ঠেলে দিল অঙ্কিত। তারপর কালো বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল।
ওর পিছন-পিছন শানু আর টুনটুনও ঢুকে পড়ল।
ওরা তিনজনে গলা ফাটিয়ে দিশার নাম ধরে ডেকে চলল। সেই চিৎকারের মধ্যে মনের ভয় তাড়ানোর চেষ্টাও খানিকটা মিশে ছিল। ওদের চিৎকারের উত্তরে ফাঁপা প্রতিধ্বনি ফিরে এল বারবার।
এমনসময় আকাশের মেঘ ডেকে উঠল। বিকট শব্দে বাজ পড়ল কোথাও।
কালো বাড়ির সদর দরজাটা হঠাৎ নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে ওরা তিনজন চমকে ফিরে তাকাল। শানু আর টুনটুন ছুটে গেল দরজার দিকে। দরজাটা টেনে খোলার চেষ্টা করল। কিন্তু ভেতর থেকে ধরে টানার মতো কোনও কড়া কিংবা হাতল খুঁজে পেল না।
তখন ওরা দরজার পাল্লায় জোরে-জোরে কয়েকবার ধাক্কা মারল, কিন্তু ভারী দরজাটা সে-ধাক্কাকে পাত্তা দিল বলে মনে হল না।
শানু আর টুনটুন অঙ্কিতের কাছে এসে দাঁড়াল। শানু একটু ভয় পাওয়া গলায় বলল, ‘দরজাটা কে বন্ধ করল বল তো? আমরা তো আর এ-বাড়ি থেকে বেরোতে পারব না…!’
অঙ্কিত কোনও উত্তর দিল না। বাড়ির ভেতরটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিল।
গোটা বাড়িটায় এক অদ্ভুতরকমের আলো ছড়িয়ে আছে। গোধূলির আলোর সঙ্গে একটু নীলচে রং মিশিয়ে দিলে বোধহয় এইরকম আলোই পাওয়া যাবে। কিন্তু আলোটা কোথা থেকে আসছে সেটা বোঝা গেল না।
ওরা যেখানটায় দাঁড়িয়ে আছে সেটা একটা চওড়া করিডর মতন। তার দুপাশেই খাড়া কালো রঙের দেওয়াল। দেওয়ালে শ্যাওলার ছোপ আর ছাতা ধরা গন্ধ।
করিডর ধরে ওরা আরও একটু এগোল। অঙ্কিত দিশার নাম ধরে ডাকল দুবার, এবং যথারীতি কোনও সাড়া পেল না।
ওরা একটা সিঁড়ির সামনে এসে পড়ল। চওড়া কালো পাথরের সিঁড়ি। এবড়োখেবড়ো ধাপগুলো দোতলার দিকে উঠে গেছে।
