ওদের পাশ দিয়ে বেল বাজিয়ে দু-একটা সাইকেল যাচ্ছিল। একটা মোটরবাইক কানে তালা ধরিয়ে আঁকাবাঁকা রেখায় কায়দা দেখিয়ে ছুটে গেল। দিশা বলল, ‘ওটা বিকাশদা। দারুণ বাইক চালায়…।’
ওরা হাঁটতে-হাঁটতে আরও খানিকটা এগোতেই টুনটুন বহুদূরে কালো বাড়িটাকে দেখতে পেল।
ও বলল, ‘চলো, ওটার কাছ দিয়ে যাই।’
দিশা ওর দিকে তাকিয়ে একটু দেখল। বলল, ‘খুব ইন্টারেস্ট, না?’
‘হ্যাঁ—তা একটু আছে।’
‘তুমি ভূতুড়ে বাড়ি ভয় পাও না?’
‘কে জানে! বাড়ির বাইরে থেকে তো পাই না।’ মাথা ঝাঁকাল টুনটুন: ‘ভেতরে ঢুকলে ভয় পাব কি না সেটা ডিপেন্ড করছে…।’
দিশা আর কিছু বলল না। ওকে নিয়ে বাঁ-দিকের একটা কাঁচা রাস্তায় ঢুকে পড়ল।
এমন সময় দূর থেকে টুনটুনের নাম ধরে কেউ ডাকল।
ওরা পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল অঙ্কিত আর শানু—হাসছে, হাত নাড়ছে। ইশারায় বলল, ‘তোরা এগিয়ে যা—আমরা পেছনে আছি।’
টুনটুনরাও হাত নাড়ল। তারপর এগিয়ে চলল।
পথের দুপাশে কাছে-দূরে ছোট-বড় অনেক গাছ। তারই মাঝে এখানে-ওখানে কয়েকটা বাড়ি। বেশিরভাগই একতলা। কয়েকটা বাড়ির মাথায় টিনের বা টালির চাল।
পথের ওপরে বাচ্চারা ছুটোছুটি করে খেলা করছে। দুটি মেয়ে টিউবওয়েল থেকে কলসিতে জল ভরছে। গাছের আড়ালে কোথায় যেন একটা কোকিল ডাকছিল।
টুনটুন অবাক হয়ে এসব দেখছিল। শহরের চেয়ে কত আলাদা! কী মোলায়েম!
একটু পরেই ওরা কালো বাড়িটার কাছাকাছি চলে এল। সামনেই ফাঁকা জায়গা। গাছপালার রাজত্ব। সেগুলো পেরিয়ে জং ধরা লোহার গেট।
দিশা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎই পিছন থেকে কয়েকজন মানুষের চেঁচামেচি হইচই কানে এল। তার মধ্যে দু-চারজন বাচ্চার গলাও মিশে আছে।
ব্যাপারটা কী? পিছনে ফিরে তাকাল টুনটুন।
তাকিয়েই ভয়ে ওর প্রাণ উড়ে গেল। ওদের দিকে পাগলের মতো ধেয়ে আসছে একটা কালো পাহাড়। মনু। বদন ঘড়াইয়ের সেই খ্যাপা বলদটা।
‘দিশা—ছোটো!’ বলে চিৎকার করে যেদিকে দু-চোখ যায় ছুটতে শুরু করল টুনটুন।
দিশা চমকে উঠে পিছনে তাকিয়ে আঁতকে উঠল। এই খ্যাপা বলদটার কথা ও টুনটুনের মুখে শুনেছে।
ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল দিশার। ও চিৎকার করে দিশেহারা হয়ে এলোমেলো ছুটতে শুরু করল। বলদটা দিশারই পিছু নিল।
অনেকটা ছুটে যাওয়ার পর টুনটুন পিছন ফিরে দেখল। দিশা চিৎকার করছে, ছুটছে।
কিন্তু এবার টুনটুন আরও বেশি ভয়ে পেল। কারণ, মনুর ভয় পাগল হয়ে দিশা কালো বাড়িটার দিকেই ছুটে যাচ্ছে। বলদটার আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য। ওর সামনে আর কোনও আড়াল নেই, আশ্রয় নেই।
আগাছার জঙ্গলের মধ্যে টুনটুন দাঁড়িয়ে পড়ল। ও কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। এবং ওর অবাক চোখের সামনে লোহার দরজার দু-পাল্লার ছোট ফাঁক দিয়ে দিশা কালো বাড়ির চৌহদ্দিতে ঢুকে পড়ল।
বলদটা প্রবল আক্রোশে ছুটে গেল সেই লোহার সিংদরজার দিকে। মাথা নীচু করে শিং বাগিয়ে দড়াম করে আছড়ে পড়ল দরজার পাল্লার ওপরে। সংঘর্ষের ধাতব শব্দ বাতাস কাঁপিয়ে দিল।
দিশা আরও জোরে ভয়ংকর এক চিৎকার করে ঢুকে পড়ল কালো বাড়ির খোলা দরজা দিয়ে।
টুনটুন কেঁপে উঠল। শিরশির করে একটা স্রোত বয়ে গেল ওর শরীরের ভেতর দিয়ে। ও ‘দিশা! দিশা!’ করে ডেকে উঠল।
বলদটা আরও দুবার দরজায় ঢুঁ মারল। তারপর ছুট লাগাল পাগলের মতো। ঝোপজঙ্গল খেত চিরে দৌড়তে লাগল।
ততক্ষণে মানুষজনের ভিড় জমে গেছে। কালো বাড়ির কাছ থেকে বেশ খানিকটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে ওরা নিজেদের মধ্যে গুঞ্জন তুলছে, বাড়িটার দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে।
টুনটুন ছুটে গেল ওদের কাছে। চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘দিশাকে বাঁচান! একটু পরেই সন্ধে হয়ে যাবে। ওকে যে করে হোক সেভ করুন। পুলিশে খবর দিন। ফায়ার ব্রিগেডে খবর দিন। কিছু একটা করুন—প্লিজ!’
কে একজন বলল, ‘এখানে ফায়ার ব্রিগেড কোথায়? থানায় খবর দিতে পারো, তবে বড়বাবু আসবে বলে মনে হয় না…।’
আর একজন মন্তব্য করল, ‘ও বাড়িতে ঢোকা মানে জান বন্ধক দেওয়া।’
‘মেয়েটা মরতে ও-বাড়িতে ঢুকতে গেল কেন? পাশ দিয়ে ঘুরপাক খেয়ে পালাতে পারল না?’
‘একটু পরেই তো সব আঁধার হয়ে যাবে। তারপর কি আর ও-বাড়ি থেকে বেরোতে পারবে?’
এসব মন্তব্য শুনতে-শুনতে টুনটুন যেন পাগল হয়ে যাচ্ছিল। ও চট করে আকাশের দিকে তাকাল। সন্ধে নামতে এখনও বোধহয় আধখণ্টাখানেক বাকি। আকাশে মেঘ না থাকলে হয়তো আরও দশ-পনেরো মিনিট পাওয়া যেত। কিন্তু…।
তা হলে কি ও থানায় ছুটে যাবে?
আকাশে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল। তারপরই শোনা গেল মেঘের গুড়ুম-গুড়ুম।
তখনই শানু আর অঙ্কিতকে দেখতে পেল টুনটুন। ও ছুটে ওদের কাছে গেল। বলল বদন ঘড়াইয়ের খ্যাপা বলদ মনুর কথা। আর দিশার কথা।
বলতে-বলতে টুনটুনের চোখে জল এসে গেল। অঙ্কিত ভীষণ ঘাবড়ে গেল। আর শানু বুঝে উঠতে পারছিল না কী করবে।
অঙ্কিত পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে বাড়িতে ফোন করল। মা-কে দিশার খবরটা দিয়ে বলল, ওর বাবা যেন এক্ষূনি থানায় খবর দেন।
শানুও মোবাইল ফোনের বোতাম টিপতে লাগল। মা ফোন ধরতেই বলল, ‘অঙ্কিতের ছোট বোনটা ভীষণ বিপদে পড়েছে। আমি আর টুনটুন এখানে আছি। ফিরতে দেরি হবে।’
অনিতা জিগ্যেস করলেন, ‘কী বিপদ হয়েছে?’
‘দিশা—অঙ্কিতের বোন—কালো বাড়িতে ঢুকে পড়েছে।’
