শানু আর অঙ্কিতের সঙ্গে এ নিয়ে অনেক কথা বলেছে টুনটুন। একদিন রাগ করে এ-কথাও বলেছে, ‘শানুদা, তোমরা তোমাদের ক্লাবের নামটা পালটে ফ্যালো। নাম রেখেছ ”বিপ্লবী সংঘ” অথচ ওই বাড়িটায় ঢুকতে ভয় পাও। তোমরা…।’
‘শোন—’ শানু বলল, ‘আমরা ভয় ঠিক পাই না—তবে…মানে, শুধু-শুধু বাড়িটাকে ডিসটার্ব করে কী লাভ! বাড়িটা যেমন আছে থাক না নিজের মনে…।’
‘শুধু বাড়ি কেন?’ পালটা তর্কে মেতে উঠল টুনটুন। কপালে নেমে আসা চুল সরিয়ে বলল, ‘সেদিন রাতের কেসটা কী হল? ওই যে, গাছ থেকে সাপের মতো জিনিসটা জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল…বাঁশির আওয়াজ থেমে গেল…।’
অঙ্কিত অবাক হয়ে শানুর দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, ‘কী ব্যাপার রে?’ ওর ভুরু কুঁচকে গেল।
তখন শানু আমতা-আমতা করে ঘটনাটা জানিয়েছে। অঙ্কিত টু শব্দ না করে একমনে শানুর কাহিনি শুনেছে। শুনতে-শুনতে আপনমনেই কীসব বিড়বিড় করেছে।
টুনটুনের উৎসাহ আর খোঁচায় কালো বাড়িটা নিয়ে নানান খোঁজখবর নিতে শুরু করল শানু আর অঙ্কিত। জানা গেল, ঠিক ওইরকম একটা অদ্ভুত প্রাণীকে এলাকার আরও দু-একজন দেখেছে। তবে তারা প্রত্যেকেই কোন এক অপদেবতার ভয়ে মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে চেয়েছে।
কালো বাড়ি ছাড়া তিলকপুরে আরও যা কিছু দেখার আছে সেসব টুনটুনকে ক’দিন ধরে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিল শানু। যেমন, দেড়শো বছরের পুরোনো একটা শিবমন্দির—যেখানে শিবরাত্রির সময় অসংখ্য মানুষের ভিড় হয়। আশপাশের বহু এলাকা থেকে দলে-দলে সবাই আসে শিবের পুজো দিতে।
তারপর তিলকপুরের স্কুল, বাজার, রবিবারের পশু-পাখির হাট, ফুলচাষের বাগান—কিছুই দেখাতে বাকি রাখল না।
সব দেখানো শেষ হলে শানু বলেছিল, ‘তবে আমাদের এখানে সবচেয়ে বিখ্যাত জিনিসটা তুই সবার আগে দেখে ফেলেছিস। কালো বাড়ি। কিন্তু এটার কথা কেউ ডিসকাস করে না—যদিও প্রায় সবাই জানে।’
রবিবার বেলার দিকে হাটে ঘুরে বেড়াচ্ছিল ওরা তিনজন। বিশাল এলাকা জুড়ে হাট বসেছে। জায়গাটা একটা ফাঁকা মাঠ। তার মাঝে-মাঝে বড়-বড় গাছ, আর কয়েকটা চালাঘর—টিন অথবা চাটাইয়ের ছাউনি দেওয়া।
হাটে বেশ ভিড়। বিক্রির আশায় অনেকেই তাদের গোরু-বাছুর, ছাগল, কুকুর নিয়ে এসেছে। এ ছাড়া আছে নানান রঙের পাখি। খদ্দেররা ঘুরে-ঘুরে পশু-পাখি পরখ করে দেখছে। চারপাশে কিচিরমিচির ট্যাঁও-ট্যাঁও করে হরেকরকম পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। তার সঙ্গে কখনও-কখনও ছাগলের ডাক বা গোরুর হাম্বা রব।
টুনটুনের অদ্ভুত লাগছিল।
বর্ষার ছাই-রঙা আকাশ। বেলা বারোটার সময়েই গোধূলির আলো ছেয়ে আছে। মানুষজনের ভিড়। পশু-পাখির ডাক। সবমিলিয়ে এক জ্যান্ত ছবি।
ওরা পাখি দেখছিল। হঠাৎই প্রচণ্ড শোরগোল শুনে চমকে ফিরে তাকাল।
দেখল হাটের লোকজন দিশেহারা হয়ে উদভ্রান্তের মতো ছুটছে। আর পাগলের মতো চিৎকার করছে।
ওদের তিনজোড়া চোখ এই ডামাডোলের কারণ খুঁজছিল। কয়েক সেকেন্ড পরই দেখতে পেল একটা স্বাস্থ্যবান কালো বলদ খেপে গিয়ে এলোমেলো দৌড়চ্ছে। তারই গুঁতোর ভয়ে লোকজনের ছত্রভঙ্গ অবস্থা।
ওরা তিনজন ছুটে পিচের রাস্তায় চলে এল। একটা দোকানের সামনের রোয়াকে লাফিয়ে উঠে পড়ল।
রোয়াকে আরও দু-চারজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের জিগ্যেস করে জানা গেল ওই এলোমেলো ছুটে বেড়ানো কালো বলদটার নাম মনু। ওটা বদন ঘড়াইয়ের বলদ। প্রচণ্ড গরমে মাঠে লাঙল দিয়ে-দিয়ে নাকি পাগল হয়ে গেছে। ওকে সারিয়ে তোলার জন্য বদন অনেক ঝাড়ফুঁক করিয়েছে। কবিরাজের সালসা আর মোদক খাইয়েছে। এখন কী একটা ইনজেকশান দিয়ে চিকিৎসা চালাচ্ছে।
বদন প্রতি সপ্তাহের হাটে বলদটাকে বিক্রি করার জন্য নিয়ে আসে। কিন্তু কপাল খারাপ—এখনও বিক্রি হয়নি।
মনু তখনও লেজ খাড়া করে দৌড়চ্ছে। আর রোগা-সোগা টাকমাথা একজন লোক তার পিছন-পিছন মরিয়া হয়ে ছুটছে, আর মাঝে-মাঝেই থমকে দাঁড়িয়ে নিজের লুঙ্গি সামাল দিচ্ছে।
জটলার মধ্যে একজন আঙুল তুলে সেদিকে দেখিয়ে বলল, ‘ওই যে…মনুর পেছনে দৌড়চ্ছে…বদন ঘড়াই…।’
লোকজন দৃশ্যটা দেখছিল, হাসাহাসি করছিল। আর নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল যে, এই খ্যাপা বলদটা গোটা এলাকাকে জ্বালিয়ে খাচ্ছে। এটাকে দূরের কোনও গ্রামে চুপিচুপি ছেড়ে দিয়ে এলে বদল ভালো করত। তার জবাবে কে যেন বলল, সেটা হওয়ার নয়। কারণ, মনুকে বদন দারুণ ভালোবাসে।
এসব কথাবার্তার মধ্যেই মনু এবং তার মালিক হাটের লন্ডভন্ড এলাকা ছাড়িয়ে দূরে গাছাগাছালির মধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে গেল।
হাট থেকে ফেরার পথে শানু ঠাট্টা করে বলল, ‘যাক, ফ্রি-তে একটা সিনেমা দেখা হয়ে গেল। সিনেমাটার নাম ”পাগলা বলদ”।’
টুনটুন আর অঙ্কিত হেসে উঠল। কিন্তু একইসঙ্গে টুনটুনের মনে হচ্ছিল, স্নেহ-ভালোবাসা বড় মারাত্মক জিনিস। বোধহয় সবকিছুর চেয়ে বড়।
ঘটনাটা ঘটল ঠিক দু-দিন পরে। বিকেলে।
সেদিন বৃষ্টি ছিল না—তবে আকাশে সাজানো-গোছানো মেঘ ছিল। টুনটুন আর দিশা হেঁটে যাচ্ছিল অঙ্কিতদের বাড়ির দিকে। অঙ্কিত আর শানু ওদের সঙ্গে ছিল না। ওরা গেছে সাইকেলের দোকানে—অঙ্কিতের সাইকেলের বেয়ারিং সারাতে। অঙ্কিত বলেছে, ‘তোরা এগো— আমরা একটু পরেই তোদের পথে ধরে নেব…।’
টুনটুন ওর স্কুলের কথা বলছিল। বলছিল ওর স্যারদের কথা। স্কুলের অ্যানুয়াল স্পোর্টস-এর সময় কীরকম হুইহুল্লোড় আর মজা হয় সেসব কথা শোনাচ্ছিল।
