শানু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সেটা আর বলা হল না। একটা চাপা বাঁশির সুর ওকে থামিয়ে দিল।
শুধু কথা নয়, চলাও থামিয়ে দিয়েছিল শানু। ওর দেখাদেখি টুনটুনও থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। এ কি সেই বাঁশির সুর—যে বাঁশির সুরের কথা শানুদা বলছিল? যে-বাঁশির টানের কথা গতকাল মনিরুলচাচা গল্প করেছে?
শানু চাপা গলায় বলল, ‘ওই বাঁশি বাজছে! চল, আমরা ফিরে যাই—।’
টুনটুন জিগ্যেস করল, ‘কেন, বাঁশির আওয়াজে ভয় কীসের?’
‘যদি টেনে নেয়? তোকে সেদিন বলছিলাম না—।’
‘কোনদিকে টানবে?’
টুনটুনের দিকে ঘুরে তাকাল শানু: ‘কেন, কালো বাড়িটার দিকে। মনিরুলচাচা কাল বলল শুনিসনি?’
বাঁশির সুরটার মধ্যে অপার্থিব কিছু ছিল না। তবে চোস্ত হাতে কেউ বাঁশিটা বাজাচ্ছিল। চাচা ঠিকই বলেছিল—বুকফাটা সুরেলা কান্না। অতল গহ্বরের কোনও কারাগার থেকে কয়েকশো বছরের পুরোনো কোনও বন্দি আকুল হয়ে মুক্তি চাইছে। তার তোলা বাঁশির সুর কোমল আর্তিতে যেন আকাশে, বাতাসে, গাছের পাতায়, পুকুরের জলে মাথা খুঁড়ে মরছে।
ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে বাঁশির সুরটা অদৃশ্য এক সরীসৃপ হয়ে মোলায়েম সাবলীল গতিতে অলসভাবে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। সবকিছুকে যেন এক অলৌকিক প্রবল আকাঙ্ক্ষায় জড়িয়ে ধরতে চাইছিল।
টুনটুনের সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল। বাঁশির সুরটা ঠিক কোনদিক থেকে ভেসে আসছে সেটা ও কিছুতেই ঠাহর করতে পারছিল না। বৃষ্টির মধ্যেই ও চোখ সরু করে চারপাশটা খুঁটিয়ে নজর করে লুকিয়ে থাকা অলৌকিক বাঁশিওয়ালাকে খুঁজছিল।
শানু আবার বলল, ‘চল, ফিরে চল। এই রাস্তায় আর এগোব না—রিসক হয়ে যাবে। তা ছাড়া তুই সঙ্গে আছিস। কোনও একটা কেস হয়ে গেলে…’
ঠিক তখনই টুনটুনের চোখ একটা জায়গায় আটকে গেল। সেদিকে তাকিয়ে ও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ওদের কাছ থেকে তিরিশ-চল্লিশ মিটার দূরে পুকুরপাড়ে একটা বিশাল অন্ধকার গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে। গাছটা পুকুরের দিকে অনেকটা ঝুলে রয়েছে। বহুদূর থেকে ছিটকে আসা টিউবলাইটের আলো হালকা জ্যোৎস্নার মতো গাছের ভিজে পাতা আর ডালে লেপটে আছে।
পুকুরের দিকে ঝুলে পড়া একটা বড়সড় ডাল টুনটুনের নজর কেড়েছিল। ওর মনে হল, সেই ডালে কিছু একটা যেন পাকে-পাকে জড়িয়ে আছে।
ও শানুর জামা ধরে টান মারল: ‘শানুদা, ওটা কী দ্যাখো তো—।’ আঙুল তুলে গাছটার দিকে দেখাল টুনটুন।
শানু ভালো করে নজর চালিয়ে দেখল। তারপর বলল, ‘হ্যাঁ রে, ওই ঝুলে পড়া ডালটায় কী একটা যেন জড়িয়ে রয়েছে—।’
‘সাপ-টাপ হতে পারে?’
‘উঁহু—বৃষ্টির মধ্যে সাপ অত কষ্ট করে ওপরে বেয়ে উঠে গাছের ডাল জড়িয়ে থাকবে কেন? ওটা অন্য কিছু—।’
শানুর কথা শেষ হতে-না-হতেই টুনটুন একটা কাণ্ড করে বসল। পায়ের কাছে এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটা বড় ঢিল কুড়িয়ে নিল। ছাতাটা খোলা অবস্থাতেই পাশে নামিয়ে রাখল। তারপর গায়ের সমস্ত শক্তি জড়ো করে ঢিলটাকে গাছ লক্ষ্য করে ছুড়ে মারল।
ঠিক লক্ষ্যভেদ না হলেও ঢিলটা কাছাকাছি পাতা বা ডালে গিয়ে ঠোক্কর খেল। কারণ, সংঘর্ষের চাপা শব্দটা ওরা শুনতে পেল।
আর ঠিক তখনই বাঁশির সুর থেমে গেল। যেন অলৌকিক বাঁশিওয়ালাকে ঢিল মেরে কেউ থামিয়ে দিয়েছে।
ঝুঁকে পড়ে ছাতাটা তুলে নিল টুনটুন। দেখল, সেই গাছের ডাল থেকে কী একটা যেন সরসর করে নেমে যাচ্ছে।
শানু হঠাৎই ওর হাত ধরে টান মারল, বলল, ‘চল তো, একটু এগিয়ে দেখি—।’
এগিয়ে দেখি! তার মানে?
টুনটুন এই কথাগুলো ভাবতে না ভাবতেই শানু আবার ওর হাত ধরে টানল। তারপর চটপটে পা ফেলে সামনে এগিয়ে গেল।
তখনই ওরা স্পষ্ট দেখল গাছের ডাল বেয়ে অনেকটা নেমে এসে সেই ‘কী একটা যেন’ পুকুরের জলে লাফিয়ে পড়ল।
‘ঝপাৎ’ শব্দ হল। ঢেউ উঠে ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে।
পুকুরের দিকে তীক্ষ্ন চোখে তাকিয়ে রইল শানু আর টুনটুন।
জল নড়ছে, ফুলে উঠছে, নামছে—কিন্তু কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ঝিরঝিরে বৃষ্টির ফোঁটা জলের ওপরে সূক্ষ্ম নকশা বুনে চলেছে।
সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর টুনটুন জিগ্যেস করল, ‘শানুদা, জলে ঝাঁপ দিল, ওটা কী? সাপ?’
‘সাপের মতো…কিন্তু সাপ জলে ঝাঁপ দিলে ওরকম ঢেউ ওঠে না। ওটা অন্য কিছু। আগে কখনও আমি দেখিনি…কেউ দেখেনি।’
‘তুমি খেয়াল করেছ, ঢিল ছোড়ার সঙ্গে-সঙ্গে বাঁশি থেমে গেছে। তা হলে কি ওই জিনিসটাই বাঁশি বাজাচ্ছিল?’
‘জানি না—আমি কিছু জানি না।’
টুনটুন চাপা গলায় জানতে চাইল, ‘কালো বাড়িটা এখান থেকে কতদূরে, শানুদা?’
শানু হাত তুলে একদিকে দেখাল: ‘বেশ দূরে। ওইদিকে।’
বেশ কিছুক্ষণ ওরা পুকুরের কাছে দাঁড়িয়ে রইল। পাড়ের দিকে নজর রাখতে লাগল— পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়া প্রাণীটা জল থেকে ওঠে কি না।
কিন্তু আর কিছু দেখতে পেল না।
একসময় শানু বলল, ‘এবার চল—রাত হয়ে যাচ্ছে।’
তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ফেরার পথে শানু আবার বলল, ‘এসব কথা কাউকে বলিস না, বুঝলি?’
টুনটুন বাধ্য মেয়ের মতো ঘাড় নাড়ল।
ঠিক তখনই বৃষ্টিটা আরও জোরে নামল।
কী করে যেন কালো বাড়িটা টুনটুনের মাথায় চেপে বসতে লাগল। বারবার ওর মনে হতে লাগল, বাড়িটা ওকে টানছে। চোখের সামনে বসে আছে একটা জমাট রহস্য, অথচ সেটা কেউ তলিয়ে দেখতে চাইছে না। বাড়িটাকে এত ভয় পায় সবাই!
