টুনটুনের মনে হয়েছিল মেয়েটি অঙ্কিতের বোন হতে পারে। শুধু ‘দাদাভাই’ শব্দটা ছাড়াও অঙ্কিতের মুখের সঙ্গে মেয়েটির মুখের বেশ মিল খুঁজে পেল ও। তবে একেবারে সুনিশ্চিত হওয়া গেল হাফটাইমের সময়।
অঙ্কিত মাঠের ধারে আসতেই মেয়েটি ওর পরামর্শ আর বকুনি নিয়ে ‘দাদাভাই’-এর ওপরে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল। অঙ্কিত হেসে ওর চুল টেনে দিয়ে সব টরচার সহ্য করতে লাগল।
হঠাৎই ও মুখ ফিরিয়ে টুনটুনের দিকে তাকিয়ে ওকে কাছে ডাকল, বলল, ‘এদিকে এসো। এই যে—আমার ছোট বোন দিশা—ইন্ডিয়ার প্রথম লেডি ফুটবল কোচ। অবশ্য জানি না ওর আগে কেউ আছে কি না। ও আসলে আমার ছোট বোন নয়—দিদি…আবার দিদিমাও বলতে পারো…।’
টুনটুন হাসল দিশার দিকে তাকিয়ে ততক্ষণে অঙ্কিত সংক্ষেপে টুনটুনের পরিচয়ও দিয়ে ফেলেছে। বলেছে, তিলকপুরের গেস্ট। এখানে সবে বেড়াতে এসেছে। কালো বাড়িটার ব্যাপারে ইন্টারেস্টেড।
এটুকুই বোধহয় যথেষ্ট ছিল। হাফটাইমের পর খেলা শুরু হতেই দিশা টুনটুনের পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওর ডানদিকে টুনটুন, আর বাঁদিকে অন্য বন্ধুরা।
দিশা বলল, ‘আগে খেলাটা শেষ হোক, তারপর তোমাকে কালো বাড়িটার ব্যাপারে বলছি। আমার মা বলে বাড়িটা ভীষণ জাগ্রত—মানে জীবন্ত।’
টুনটুন ভেবে পাচ্ছিল না একটা বাড়ি কেমন করে জাগ্রত হতে পারে। মায়ের কাছে বেশ কয়েকবার শুনেছে জাগ্রত মা-কালীর কথা। কিন্তু…?
একটু পরেই ওর মনে হল, কোনও ‘কিন্তু’ নেই। দেবতা যদি জাগ্রত হতে পারে তা হলে অপদেবতা কেন নয়!
ফুটবল খেলা নিয়েও অনেক বকবক করছিল দিশা। খুব ছোট থেকেই ও ফুটবলের পোকা। তখন ও ছেলেদের সঙ্গে জোট বেঁধে মাঠ বল পেটাপিটি করত। এখন টিভির খেলা আর পাড়ার খেলা দেখে সাধ মেটায়।
বিপ্লবী সংঘ তিন গোল দিল, রক্তিম ইউনাইটেড দিল একটা। অঙ্কিতদের প্রতিটি গোলের সময় দিশা হাততালি দিয়ে পিংপং বলের মতো লাফাচ্ছিল আর চিৎকার করছিল। টুনটুনের মনে হচ্ছিল, গোলগুলো যেন ওই তিড়িং-বিড়িং মেয়েটাই দিয়েছে।
খেলার শেষের দিকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। তখন বড়জোর আর মিনিট পাঁচ-সাত বাকি। সঙ্গে-সঙ্গে কোথা থেকে খুলে গেল একরাশ কালো আর রঙিন ছাতা। টুনটুনের সঙ্গে ছাতা ছিল না। কিন্তু দিশার সঙ্গে ছিল। ও টুনটুনকে ওর ছাতার নীচে ডেকে নিল।
খেলা ভাঙার পর দিশা টুনটুনকে বলল, ‘আমাদের বাড়ি চলো। তুমি গেলে মা-বাবা খুব খুশি হবে।’
টুনটুন শানুর কথা বলতেই দিশা বলল, ‘ওদের দেরি হবে। তার চেয়ে দাদাভাইকে বলে দিই শানুদাকে নিয়ে চলে আসবে। তারপর তুমি আর শানুদা একসঙ্গে ফিরে যেয়ো—।’
দিশার কথাবার্তার মধ্যে কেমন একটা সরলতা আর মোলায়েম আদেশ মিশে ছিল। যার জন্য ওর যে-কোনও প্রস্তাবে ‘না’ বলা কঠিন। টুনটুন ওকে দেখছিল আর ভাবছিল এত টগবগে এনার্জি মেয়েটা পায় কোথা থেকে!
ওদের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পথে কালো বাড়িটা নিয়ে নানান গল্প শোনাল দিশা। ওর স্কুলের বন্ধুরাও এরকম অনেক গল্প বলে। তবে গল্পগুলো সত্যি কি মিথ্যে বলা কঠিন।
টুনটুন বলল, ‘গল্পগুলো শুনতে কিন্তু খারাপ লাগছে না। বইয়ের গল্পের মতন। আসলে বাড়িটা ওইরকম দেখতে বলে এতরকম ছমছমে গল্প তৈরি হয়েছে। পরে হয়তো দেখা যাবে বাড়িটা খুব ভালো—প্লেইন অ্যান্ড সিম্পল…।’
দিশা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘তা হলে মনিরুলচাচার গল্পটা?’
ওটা নিয়েই টুনটুনের একটু অসুবিধে হচ্ছিল। ও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘ওটা ঠিকমতো এক্সপ্লেইন করতে গেলে আরও খবর দরকার। কেউ যদি বাড়িটার ভেতরে ঢুকে একটু ইনভেস্টিগেট করত তা হলে…।’
‘ওরে বাবা! তোমার তো দেখছি সাহস কম নয়!’
টুনটুন হেসে বলল, ‘না, আমার সাহস কম। আমার বাপির সাহস আমার চেয়ে অনেক বেশি—।’
‘তাই?’ চোখ বড়-বড় করল দিশা। তারপর সামনের একটা সুন্দর দোতলা বাড়ি দেখিয়ে বলল, ‘এই যে—এটা আমাদের বাড়ি।’
অঙ্কিতদের বাড়িতে গিয়ে হইহই করে অনেক সময় কেটে গেল। চারজনে মিলে তুমুল তর্কবিতর্ক আর আলোচনা হল। বিষয় কালো বাড়ি আর আজকের ফুটবল ম্যাচ।
ওদের বাড়ি থেকে টুনটুন আর শানু যখন রওনা হল তখন রাত প্রায় আটটা। ওদের পায়ের নীচে আঁকাবাঁকা পিচের রাস্তা। তার নানান জায়গায় ছাল ওঠা। ইটের টুকরো বেরিয়ে পড়েছে। এখানে-ওখানে জল জমে আছে। আর আলো বলতে ধুলোর আস্তরে মলিন হয়ে যাওয়া টিউবলাইট। লাইটগুলো এত দূরে-দূরে যে, একের আলো অন্যকে ছুঁতে পারছে না।
ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। ওদের সঙ্গে একটা ছাতা ছিল বলে অঙ্কিতদের বাড়ি থেকে আরও একটা ছাতা ধার নিয়ে এসেছে।
শানু হঠাৎ রাস্তা ছেড়ে তেরছাভাবে বেরিয়ে একটা কাঁচা পথ ধরল। ছোট্ট করে বলল, ‘এটা শর্টকাট, বুঝলি?’
শর্টকাট সবারই পছন্দের। কিন্তু চারপাশটা যেন বড় বেশি অন্ধকার। তার সঙ্গে এলোমেলো গাছপালা, বড়-বড় ঘাস আর একঘেয়ে ব্যাঙের ডাক।
জল-কাদায় পা ফেলতে-ফেলতে টুনটুনের মনে একটা অচেনা ভয় চারিয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, সঙ্গে একটা টর্চ থাকলে ভালো হত।
বেশ কিছুটা এগোনোর পর একটা বিশাল পুকুর দেখতে পেল ওরা। এখানে মেঘ আর অন্ধকার এত গাঢ় যে, ঝিরঝির করে বৃষ্টি না পড়লে পুকুরটাকে পুকুর বলে বোঝা যেত না।
চলতে-চলতে টুনটুন পুকুরটার দিকে দেখছিল। সেটা লক্ষ করে শানু বলল, ‘এটা কালু হালদারদের পুকুর। এই এলাকার বেশিরভাগটাই ওদের জমি। শুনেছি এককালে ব্যাপক বড়লোক ছিল—এখন শুধু কয়েক বিঘে জমিজমা পড়ে আছে…।’
