তারপর…।
তারপর সেই বাঁশির সুর চাচাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল। চাচা ঢুকে পড়েছিল অন্ধকার বাড়িটার ভেতরে।
অন্ধকারে দিকভ্রম হয়ে গিয়েছিল। সময়ের হিসেবও ওলোটপালট হয়ে গিয়েছিল। চাচাকে নিয়ে কারা যেন ভয় পাওয়ানোর খেলায় মেতে উঠেছিল। বৃষ্টি-ভেজা শরীরের মতো ঘামে ভিজে উঠেছিল চাচার শরীর। একটা প্রচণ্ড ভয় চাচাকে কুঁকড়ে দিয়েছিল। চিন্তাভাবনা, মন, সব অসাড় করে দিয়েছিল। ভয়ের গোলকধাঁধায় চাচা দিশেহারা হয়ে ঘুরপাক খেয়েছিল।
শুধু এইটুকুই চাচার মনে আছে।
ওই বাড়ি থেকে বাইরে বেরোনোর পর চাচাকে সদর হাসপাতালে ভরতি করতে হয়েছিল। চারদিন পর চাচা সেরে ওঠে। তখন লোকজনের কাছ থেকে জানতে পারে একটা গোটা রাত চাচা ওই কালো বাড়িতে কাটিয়েছিল। কারণ, গাঁয়ের লোকরা চাচাকে পরদিন ভোরবেলা বাড়ির সদরের লোহার গেটের কাছে পড়ে থাকতে দ্যাখে। চাচার জামাকাপড় ছেঁড়া ছিল, সারা গায়ে রক্তের দাগ ছিল। কপালে, হাতে, আঘাতের চিহ্ন ছিল।
কিন্তু সেরে উঠে চাচা কিছুই বলতে পারেনি। বাড়ির ভেতরকার ব্যাপার-স্যাপার সব ভুলে গেছে। ভিজে ন্যাকড়া দিয়ে স্লেটের লেখা মোছার মতন সেই ভয়ংকর স্মৃতিগুলো কেউ যেন মুছে দিয়েছে।
সেরে ওঠার পর প্রায় একমাস চাচা ঘেঁটে যাওয়া মন দিয়ে কষ্ট পেয়েছে। তারপর পুরোপুরি ভালো হয়ে উঠলেও মনে-না-পড়ার সেই অস্বস্তিটা এত বছর পরেও যায়নি।
চাচার গল্প শুনতে-শুনতে বৃষ্টি আরও বেড়ে গিয়েছিল। মাঝে-মাঝে পলিথিন শিটের ছাদনা দেওয়া সাইকেল রিকশা প্যাঁক-প্যাঁক করতে-করতে চলে যাচ্ছে। রাস্তার ধারে লাগানো একটা টিউবলাইট মিইয়ে যাওয়া আলো ছড়িয়ে অন্ধকার হটাতে চেষ্টা করছে। ব্যাঙের ডাকের একটানা ছন্দ কেটে দিয়ে একটা মোটরবাইক ছুটে গেল।
চা খাওয়া অনেকক্ষণ শেষ হয়ে গিয়েছিল। কামালের হাতে পয়সা দিয়ে শানুরা উঠে পড়ল।
বৃষ্টির ধরন দেখে টুনটুন ভাবছিল দোকানের চালার নীচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি কমার জন্য অপেক্ষা করবে। কারণ, শানুর কাছে একটিমাত্র ছাতা—আর ওরা তিনজন। কিন্তু শানু আর অঙ্কিত অপেক্ষা করার পাত্র নয়। বিশেষ করে অঙ্কিত একটু যেন বেপরোয়া। বলল, ‘দুর! এই বৃষ্টিতে ভিজলে কিস্যু হবে না।’
শুধু বলল নয়, বলতে-বলতে নেমে গেল রাস্তায়। মনিরুলচাচাকে হাত নেড়ে বলল, ‘আসি, চাচা…।’
বাড়ির দিকে তাড়াতাড়ি পা চালাতে-চালাতে টুনটুন জিগ্যেস করল, ‘চাচার কিছুই মনে নেই।’
‘শুনলে তো—’ অঙ্কিত বলল।
‘ওই বাড়িটায় যারা ঢুকে আবার বেরিয়ে আসে তাদের আর কিছু মনে থাকে না—’ আপনমনেই বলল টুনটুন, ‘কিন্তু যে-দুজন লোক ঢুকে আর বেরোয়নি—তাদের?’
শানু হেসে বলল, ‘আজব তো! ওই লোকদুটোর কী হয়েছে আমরা কী করে জানব।’
অঙ্কিত বলল, ‘তুমি ওই বাড়িটায় ঢুকে পরীক্ষা করে দেখতে পারো তোমার সবকিছু মনে থাকছে কি থাকছে না—।’
কথাগুলো বলে অঙ্কিত হাসল। শানুও ওর সঙ্গে যোগ দিল।
কিন্তু টুনটুন হাসল না। ও তখনও চাচার কথাগুলো ভাবছিল। চাচার সারা গায়ে রক্তের দাগ ছিল। জামাকাপড় ছিল ছেঁড়া। কপালে-হাতে আঘাতের চিহ্ন ছিল।
ওগুলো হল কেমন করে? তা হলে বাড়িটার ভেতরে কি কোনও হিংস্র জানোয়ার আছে?
পরদিন বিকেল চারটে থেকে বিপ্লবী সংঘের ফুটবল ম্যাচ। শানুর সঙ্গে টুনটুন সময় মতো বেরিয়ে পড়ল। শানুর জ্বর কমে গেছে। বাড়িতে মা-কে বারবার করে বলে এসেছে যে, ও খেলতে নামবে না—মাঠের ধারে টুনটুনের সঙ্গে বসে শুধু খেলা দেখবে। কিন্তু মাঠে এসে জার্সি পরা বন্ধুবান্ধব আর সাদা ফুটবলটা দেখে শানুর মাথাটা বিগড়ে গেল। ও টুনটুনের পাশ থেকে ছুটে চলে গেল অঙ্কিতের কাছে। অঙ্কিত আর তিনটে ছেলের সঙ্গে কীসব কথাবার্তা বলে ও জার্সি পরে তৈরি হয়ে গেল খেলার জন্য।
টুনটুন ‘শানুদা, শানুদা’ করে ডাকতেই ও ছুটে চলে এল মাঠের ধারে। চাপা গলায় বলল, ‘অ্যাই, মা-কে বলবি না কিন্তু। তোকে বেণুদার রেস্টুরেন্টে ফিশ ফ্রাই খাওয়াব—।’
টুনটুন জবাবে হাসল। ফুটবল খেলা ওর ততটা পছন্দের না হলেও ওর মনে হচ্ছিল জার্সি আর কেডস পরে ছেলেদের সঙ্গে মাঠে নেমে পড়ে।
একটু পরেই রেফারি বাঁশি বাজিয়ে ম্যাচ শুরু করল। বিপ্লবী সংঘ বনাম রক্তিম ইউনাইটেড। একদিকে লাল-সাদা জার্সি, অন্যদিকে নীল-হলুদ। জল-কাদা ভরা মাঠে কাদা-মাখা ফুটবলটা ছোটাছুটি করতে লাগল, আর তার সঙ্গে-সঙ্গে প্লেয়াররাও। থেকে-থেকে রেফারির বাঁশি বাজতে লাগল।
কোথা থেকে যেন কিছু দর্শকের দল জুটে গিয়েছিল। খেলার ওঠা-নামার তালে-তালে তাদের চিৎকারও উঠছে-নামছে। কেউ-কেউ প্লেয়ারদের নাম ধরে চেঁচিয়ে নানান নির্দেশ দিচ্ছে। টুনটুনের মনে হল, স্রেফ মুখে-মুখেই ওরা তীব্র উত্তেজনাময় ফুটবল খেলে চলেছে।
দর্শকদের মধ্যে চার-পাঁচজন মেয়েকে চোখে পড়ল। তার মধ্যে একটি লম্বামতন মেয়েকে সবচেয়ে বেশি উৎসাহী মনে হল। অঙ্কিতের পায়ে বল গেলেই ও উত্তেজিতভাবে চিৎকার করছে। ‘দাদাভাই, দাদাভাই’ বলে চেঁচিয়ে ডেকে ওর মূল্যবান পরামর্শ ছুড়ে দিচ্ছে।
মেয়েটি ফরসা। লম্বাটে মুখ। চোখদুটো বড়-বড়। মাথার চুল হর্সটেইল করে বাঁধা। পরনে সবুজ-কালো ছাপ-ছাপ একটা চুড়িদার। দেখে মনে হয় ক্লাস সেভেন কি এইটে পড়ে।
