পাখির মিহি ডাক কানে এল ওদের। টিয়ার ঝাঁক ‘ট্যাঁ-ট্যাঁ’ করতে-করতে মেঘলা আকাশের একদিন থেকে অন্যদিকে উড়ে গেল।
কালো বাড়িটার দিকে অবাক চোখে চেয়ে থেকে টুনটুন জিগ্যেস করল, ‘অঙ্কিতদা, এই বাড়িটায় ঢুকে আবার বেরিয়ে এসেছে এমন কেউ নেই?’
প্রশ্নটা শুনে অঙ্কিত একটু দোটানায় পড়ে গেল যেন। টুনটুনের দিকে তাকাল। জবাব দেবে কি দেবে না কয়েক সেকেন্ড ভাবল।
তখন শানু ওকে বলল, ‘বল না, মনিরুল চাচার কথা বল—।’
‘কে মনিরুল চাচা?’ টুনটুনের প্রশ্নের যেন আর শেষ নেই।
‘ওই ওদিকে বটতলায় চায়ের দোকান ছিল।’ হাত তুলে একদিকে নিশানা করল অঙ্কিত: ‘পাঁচ-ছ’বছর হল ওর ছেলে কামাল দোকান চালায়—আর চাচা চুপচাপ দোকানের একপাশে বসে থাকে।’
‘মনিরুলচাচা এই বাড়িটায় ঢুকেছিল?’
‘হ্যাঁ—’ কালো বাড়িটার দিকে তাকিয়ে আনমনাভাবে বলল অঙ্কিত, ‘আবার বেরিয়েও এসেছিল…।’
‘তারপর?’
‘তারপর কী হয়েছিল সেটা চাচার মুখ থেকেই শুনবি। তোর বাড়ি দেখা শেষ হয়েছে? তা হলে চল, এখনই বটতলায় যাই।’
এর মধ্যেই আলো বেশ কমে এসেছে। আশপাশের জলা থেকে ভেসে আসা ব্যাঙের ডাক জোরালো শোনাচ্ছে। বড়-বড় গাছের পাতার ঝাঁকের আড়ালে ঘরে ফেরা পাখিদের কিচিরমিচির শুরু হয়ে গেছে।
কমে যাওয়া আলোয় কালো বাড়িটাকে ওত পেতে থাকা এক অপার্থিব জন্তুর সিলুয়েট বলে মনে হল টুনটুনের। মনে হল, যেই ওরা পিছন ফিরে হাঁটা দেবে অমনি যেন সেই জন্তুটা ওদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
টুনটুন শানুকে বলল, ‘শানুদা, এখন বটতলায় গেলে মাসি কিছু বলবে?’
‘না, না, মা কিছু বলবে না। ও আমি ম্যানেজ করে নেব। যদি বাই চান্স দেরি হয় ফোন করে দেব। তুই এখানে বেড়াতে এসে সবসময় কি ঘরে বসে থাকবি না কি?’
ওরা তিনজন ফিরে চলল। কালো বাড়িটা পিছনে পড়ে রইল। কিন্তু টুনটুনের মনে হল, বাড়িটা যেন অদৃশ্য সুতোয় ওকে পিছনদিকে টানছে।
ওরা তিনজন যখন মনিরুলচাচার দোকানে এসে পৌঁছল তখন অন্ধকার গাঢ় হয়েছে, আর সেইসঙ্গে টিপটিপ করে বৃষ্টিও শুরু হয়েছে।
মনিরুলচাচাকে দেখে বেশ অবাক হল টুনটুন।
শানুদা আর অঙ্কিতদা বলেছিল মনিরুলচাচার বয়েস সত্তর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু চাচার মাথার চুলগুলো সব দাঁড়কাকের মতো কালো। চেহারা ভাঙাচোরা হলেও বাদামি চামড়ায় এই বয়েসেও চকচকে ভাব আছে। চোখে চশমা, থুতনিতে দাড়ি।
চায়ের দোকানটা বাঁশের খুঁটি আর টিনের চাল দিয়ে তৈরি, কিন্তু মাপে বেশ বড়। দোকানের বাইরে সার দিয়ে ক’টা ব্যাটারির বাক্স উপুড় করে রাখা—খদ্দেরদের বসার জন্য। এখন বৃষ্টির জন্য সিটগুলো সব খালি। আর ভেতরে জোড়াতালি দেওয়া একটা বড় টেবিল, তার দুপাশে দুটো ফাটল ধরা লম্বা বেঞ্চ।
দোকানের একপাশে পাতা উনুনে আগুন জ্বলছে। চাচার ছেলে কামাল ব্যস্ত হাতে চা-বিস্কুটের জোগান দিতে হিমসিম খাচ্ছে। ওর গায়ে গেঞ্জি আর প্যান্ট। পোক্ত হাতে সসপ্যানে চামচ নাড়ছে। তাতে অদ্ভুত ছন্দে ‘বাজনা’ বাজছে।
দোকানটার আলো বলতে দুটো বালব। সেই অলোয় উদ্ভট চেহারার কতকগুলো ছায়া তৈরি হয়েছে।
চাচা দোকানের একপাশে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে একটা টুলে বসেছিল। অঙ্কিত চাচার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, বলল, ‘চাচা, ভালো আছ তো?’
চাচা কাগজ থেকে মুখ তুলল, ‘কে, আঙ্কু? বসো—চা খাবা নাকি?’
‘হ্যাঁ, চাচা, খাব। আজ সঙ্গে আমার এক বন্ধু এসেছে।’ গলার স্বর খাদে নামিয়ে অঙ্কিত বলল, ‘আপনার সেই কালো বাড়ির কেসটা আপনার মুখ থেকে শুনতে চায়…।’
‘ওঃ—’ বলে হাসল চাচা: ‘এই গল্প কতজনের যে কইসি! ওই শয়তান বাড়িডা য্যামন ছিল ত্যামনই রইয়া গেল। আমাগো কপাল পোড়া…।’
ওদের তিনজনের জন্য তিনটে চা বলল অঙ্কিত। দোকানের ভেতরে তিনজন খদ্দের বসে চা খাচ্ছে, খোশগল্প করছে।
টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ হচ্ছিল। চাচা যেদিকটায় টুলে বসে সেদিকটায় দোকানের চাল সামনে হাত তিনেক বাড়ানো। ওরা ব্যাটারির বাক্স টেনে নিয়ে চাচার কাছ ঘেঁষে বসে পড়ল।
মুখ মুছে দাড়িতে হাত বুলিয়ে মনিরুলচাচা তার অভিজ্ঞতার কথা শোনাল। চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতে-দিতে টুনটুনরা চাচার গল্প শুনতে লাগল।
বহুবছর আগের কথা। সময়টা শীতকাল। মনিরুলচাচা তখন সদ্য জোয়ান। একদিন সন্ধের পর স্টেশন থেকে ঘরে ফেরার পথে হঠাৎ বাঁশির শব্দ চাচার কানে আসে। বাঁশি তো নয়, যেন বুকফাটা সুরেলা কান্না। বাঁশি শুনে চাচার মনটা কেমন যেন হয়ে যায়। চাচার মনে হচ্ছিল, বাঁশির সুরটা যেন চাচাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। কানের কাছে ফিসফিস করে কেউ যেন বলছে, ‘আয়…চলে আয়…।’
চাচা তখন বাজার পেরিয়ে সবে দশ কি বারো কদম এগিয়েছে। চারপাশটা অন্ধকার হলেও পথে দু-চারজন লোক চোখে পড়ছে। কিন্তু সেই মন-ভোলানিয়া বাঁশির সুর মনিরুলচাচা ছাড়া আর কেউ যেন শুনতে পাচ্ছিল না।
তখন চারপাশে এত আলো ছিল না। এত দোকানপাট ছিল না। এত বাড়ি-ঘরও ছিল না। শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। চারপাশে ঝিঁঝিঁপোকার ডাক আর জোনাকির মিটমিটে আলো।
বাঁশির সুর মনিরুলচাচাকে যেন ‘হাত ধরে’ ডেকে নিয়ে চলল।
কেমন এক অলৌকিক নেশার ঘোরে চাচা পৌঁছে গেল সেই কালো বাড়িটার কাছে। বাড়ির বাগানের ফুলগুলো তখন রঙিন আলো হয়ে জ্বলছে। অদ্ভুত আভা ফুটে বেরোচ্ছিল ওগুলোর ছোট-ছোট শরীর থেকে। যে-টানটা মনিরুল চাচা তখন টের পেয়েছিল সেটা সমুদ্রের জোয়ারে ভেসে যাওয়ার টান। সেই টানে চাচা জং ধরা লোহার গেটের ফাঁক দিয়ে বাড়িটার চৌহদ্দিতে ঢুকে পড়েছিল।
