‘তা হলে আর দেরি করে লাভ কী!’ অঙ্কিত উঠে দাঁড়াল: ‘চল, আমিও তোদের সঙ্গে যাই…।’
শানু বলল, ‘টুনটুন বলছে ওর নাকি হেভি সাহস। এবার সেটা প্রমাণ হয়ে যাবে।’
রোশন আর রাজর্ষিকে বলে ওর ক্লাবঘর থেকে বেরিয়ে এল। অনেকগুলো গাছপালার সারি পেরিয়ে একটা পুকুরকে পাক দিয়ে ভাঙাচোরা একটা রাস্তায় এসে পড়ল।
আকাশে চাপা গুড়গুড় শব্দ হল। হাঁটতে-হাঁটতেই ওরা মুখ তুলে আকাশে তাকাল। একটু আগের দেখা ছোট-ছোট নীল জানলাগুলো আবছা কালো ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে।
অঙ্কিত বলল, ‘তাড়াতাড়ি পা চালা—বৃষ্টি আসতে পারে।’
সঙ্গে-সঙ্গে ওরা প্রায় ছুটতে শুরু করল।
কাঁচা রাস্তায় জল-কাদা। দুপাশে ছোট-খাটো বাড়ি-ঘর। কোনওটা পাকা বাড়ি, কোনওটা টিনের চাল, আর কোনওটা স্রেফ মাটি আর চাটাই দিয়ে তৈরি। বাড়ির উঠোনে লাউ-কুমড়োর মাচা আর আম-কাঁঠাল-পেয়ারা গাছ।
দু-মিনিট যেতে না যেতেই বাঁ-দিকে একটা ফাঁকা জমি পাওয়া গেল। জমিতে আগাছার জঙ্গল। আর জমি পেরিয়ে বিশাল একটা সবজির খেত। এদিক-ওদিক ছড়িয়ে কয়েকটা বড়-বড় গাছ।
সেগুলো ছাড়িয়ে চোখ মেললেই দু-চারটে ছোট-ছোট বাড়ি, আর তার মাথায় আকাশ। কিন্তু ডানদিকে পঁচিশ কি তিরিশ ডিগ্রি মতন চোখ সরলেই আকাশটা আর দেখা যাচ্ছে না।
কারণ, তাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে রয়েছে কালো বাড়িটা।
ওরা তিনজন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। টুনটুন অবাক হয়ে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল।
কালো রঙিন বিশাল একটা ডাইনোসর যেন গুড়ি মেরে বসে আছে। পড়ন্ত দিনের মেঘলা আলোয় বাড়িটার দিকে তাকিয়ে টুনটুনের মনে হল ওটা যেন অন্ধকার দিয়ে তৈরি। শরীরটাকে গুটিয়ে ছোট করে রেখেছে। প্রতিটি পেশিতে অসম্ভব তেজ ও শক্তি। শুধু ওটার মাথাটা যে কোথায় সেটাই ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না।
একটা বাড়ির আকার যা-ই হোক না কেন আকাশের পটভূমিতে তার সীমানা সবসময়েই সরলরেখা দিয়ে তৈরি হয়—অন্তত টুনটুন এতদিন তাই জানত। কিন্তু এই কালো বাড়িটার যে সীমারেখা আকাশের গায়ে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে সেটার বেশিরভাগই বাঁকা রেখা দিয়ে তৈরি। এর কারণ হতে পারে খসে পড়া ইট পলেস্তারা, কিংবা বাড়ির নানান জায়গায় লেপটে থাকা কালচে সবুজ শ্যাওলা।
বর্ষার জোলো বাতাস হু-হু করে বইতে শুরু করল। টুনটুন, শানু আর অঙ্কিতের চুল উড়তে শুরু করল। ঝোড়ো হাওয়ায় দিশেহারা পতাকার মতো ঝাপটা মারতে লাগল গালে, কপালে।
টুনটুন বাড়িটার দিকে আরও দু-চার পা এগিয়ে এল। ওর দেখাদেখি পা বাড়াল বাকি দুজন।
তখনই ছাতাধরা জিনিসের গন্ধটা টুনটুনের নাকে এল। বর্ষাকালে বহুদিন আলো-বাতাস না পাওয়া জামাকাপড়ের গায়ে যে বিশ্রী গন্ধটা টের পাওয়া যায়, ঠিক সেইরকম।
গন্ধটা নাকে আসতেই মুখে বিরক্তির শব্দ করে নাক টিপে ধরল টুনটুন।
শানু চাপা গলায় বলল, ‘বাড়িটার গা থেকে সবসময়েই এরকম বাজে গন্ধ বেরোয়।’
‘কেন?’ টুনটুন জিগ্যেস করল। কিন্তু বাড়িটার দিক থেকে চোখ সরাল না।
অঙ্কিত ওর প্রশ্নের জবাব দিল, ‘কেউ জানে না কেন…।’
বহুকাল আগে বাড়িটার রং কালো ছিল কি না কে জানে। কিন্তু এখন তার সারা গায়ে ময়লা আর শ্যাওলা জমে বলতে গেলে কালো রংটাই বসে গেছে। ভালো করে নজর করলে সেই কালোর ওপরে ছাতাধরা সাদা ছোপ-ছোপ দাগ বেশ দেখা যায়।
কালো বাড়িটার বিশাল চৌহদ্দি পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। আর সেই পাঁচিলের চেহারাও বাড়ির সঙ্গে মানানসই। সর্বত্র ভাঙাচোরা—কোথাও আছে, কোথাও নেই। আগাছার জঙ্গলে পাঁচিলটার অনেক জায়গাই ঢাকা পড়ে গেছে।
পাঁচিলের একজায়গায় প্রায় দশফুট উঁচু বিশাল লোহার গেট। বাতাস আর বর্ষায় জং ধরা। গেটের পাল্লা দুটো ফুট দুয়েক ফাঁক হয়ে আছে। বড়-বড় ঘাস আর আগাছা গেটের নীচের দিকটা ঢেকে ফেলেছে। ভেতরে যতটা চোখ যায় শুধু ছোট-বড় গাছ আর হরেকরকম আগাছার জঙ্গল। সদর দিয়ে ঢুকে বাড়ির দিকে এগোনোর পথটাও আগাছায় প্রায় ঢেকে গেছে।
বাড়ি আর তার লাগোয়া জমির বহর দেখে মনে হয় বাড়িটা এককালে কোনও বড়লোকের বাগানবাড়ি ছিল।
টুনটুন লক্ষ করল, কালো বাড়িটার আশেপাশের জমিতে বড়-বড় ঘাস-পাতার মধ্যে দুটো গোরু চরে বেড়াচ্ছে আর বাড়িটার কাছ থেকে প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ মিটার দূরে দুটো ছোট মাপের আধাখ্যাঁচড়া বাড়ি রয়েছে। আধাখ্যাঁচড়া বলতে একতলা তৈরির পর দোতলা তৈরি হতে-হতে কনস্ট্রাকশনের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তারপর পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকলে যা হয়!
সেই বাড়ি দুটো দেখিয়ে টুনটুন অঙ্কিতকে জিগ্যেস করল, ‘ওই বাড়ি দুটোয় কারা থাকে?’
‘কেউ না।’
‘কেন?’
‘সে প্রায় বিশ বছরের পুরোনো কেস। বাবার মুখে শুনেছি। দু-বন্ধু দুটো বাড়ি তৈরি করছিল। তাদের ফ্যামিলি একতলায় থাকত। দোতলা তৈরির কাজ চলছিল। এক বর্ষার সিজনে দু-ফ্যামিলির সাতজন মেম্বার বাজ পড়ে একসঙ্গে খতম।’ বড় করে শ্বাস ছাড়ল অঙ্কিত: ‘তারপর থেকে কালো বাড়িটার কাছাকাছি আর কেউ বাড়ি তৈরির চেষ্টা করেনি..।।’
অঙ্কিতের কথাগুলো টুনটুন শুনছিল, কিন্তু ও স্থিরচোখে তাকিয়ে ছিল কালো বাড়িটার দিকে। এক অদ্ভুত ভয় আর মুগ্ধতা ওর মধ্যে কাজ করছিল।
কিছক্ষণ চুপ করে থাকার পর অঙ্কিত আবার বলল, ‘কালো বাড়িটার চারপাশে ওই যে সব গাছ দেখছ, ওতে মাঝে-মাঝে পিকিউলিয়ার সব ফুল হয়—নানান রঙের ফুল…খুব অ্যাট্রাকটিভ। শুনেছি, ওই ফুলের লোভে দুজন কালো বাড়ির বাগানে ঢুকে পড়েছিল—আর বেরোতে পারেনি। তাদের আর কোনও খোঁজও পাওয়া যায়নি। সেই থেকে ওই ফুলের ফাঁদে আর কেউ পা দেয় না।’
