কত গল্পই যে করতে পারে শানু!
শানুর গল্পের জন্যেই টুনটুনের এখনই মনে হচ্ছে মাসির বাড়িতে ও এসেছে ক-ত দিন যেন হয়ে গেছে। অথচ ও এসেছে আজ সকাল ন’টায়—আর এখন সবে সন্ধে সাতটা।
তেলেভাজা-মুড়ি খেতে-খেতে কালো বাড়ির কাহিনি শোনাল শানু। শুনতে-শুনতে টুনটুনের মনে হল, শানুদা বোধহয় বইয়ে পড়া কোনও ভূতের গল্প ওকে শোনাচ্ছে। টুনটুন অসংখ্য ভূতের গল্প পড়েছে, আর সেগুলো যে ‘গল্প’ সে নিয়ে ওর মনে কোনও সন্দেহ নেই। ও ভূতের গল্পের পোকা হলেও ভূতে ওর একফোঁটা বিশ্বাস নেই। কারণ, মাধ্যমিক পরীক্ষায় অঙ্কে যে নিরানব্বই আর ফিজিক্যাল সায়েন্সে চুরানব্বই পায় ভূতে তার বিশ্বাস থাকবে কেমন করে!
সুতরাং বেশ মন দিয়ে শানুর গল্প শুনল টুনটুন। শুনতে-শুনতে একটু যে গা-ছমছম করেনি তা নয়। কিন্তু ভূতের কোনও গল্প পড়ার পর বেশ ভয়-ভয় লাগুক এটাই তো টুনটুন চায়!
রাতে মাসি ঘুমিয়ে পড়লে শানুর সঙ্গে অন্য অনেক গল্প করেছে ও। কিন্তু ওই কালো বাড়ির গল্পটা কিছুতেই মাথা থেকে যায়নি। ও অন্ধকারে চুপচাপ শুয়ে ওই বাড়িটার কথা ভেবেছে। কারা থাকত ওই বাড়িতে? তারা এখন কোথায়? কেন ওই বাড়িটা পোড়োবাড়ি হয়ে পড়ে আছে?
বাইরে বৃষ্টি এখনও বেশ ভালোই পড়ছে। তবে সন্ধেবেলা যেমন ঘনঘন বাজ পড়ছিল এখন সেরকম নয়। মাঝে-মাঝে টিউবলাইটের মতো সাদা আলো জানলার কাচ ভেদ করে ঝলসে যাচ্ছে ঘরের দেওয়ালে।
টুনটুনের ঘুম আসছিল না কিছুতেই। একটু ভয়-ভয়ও করছিল। কিন্তু শানুর কাছে সেটা ধরা পড়ুক ও চাইছিল না।
অন্ধকারে চোখ খুলে বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার পর ও চাপা গলায় ডেকে উঠল, ‘শানুদা…।’
কোনও সাড়া নেই।
‘শানুদা—।’ আবার চাপা গলায় ডাকল ও।
‘উঁ…।’ ঘুমজড়ানো চোখে সাড়া দিল শানু, ‘বল, কী?’
‘ওই বাড়িটার গল্প তুমি কি আমাকে শর্টে বললে?’
শানু এবারে পাশ ফিরল টুনটুনের দিকে। একটা হাই তুলল: ‘এই মাঝরাত্তিরে কীসব কোশ্চেন শুরু করলি! বল কী বলছিস।’
টুনটুন আবার একই প্রশ্ন করল।
শানু একবার ঘুমন্ত মায়ের দিকে দেখল। তারপর আবার হাই তুলে বলল, ‘যেটুকু জানি সেটুকুই বলেছি। তবে এই এরিয়ার আরও অনেকে অনেক কিছু জানে—সবসময় বলতে চায় না।’
‘কারা থাকত ওই বাড়িতে, শানুদা?’
‘আরে সে অনেক ব্যাপার। কাল দেখা যাবে। এখন ঘুমো তো।’
‘কাল একটু খোঁজখবর করে দেখলে হয়। আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে…ওই কালো বাড়ির পুরো গল্পটা…শর্টে নয়…লঙে।’
‘বললাম তো কাল সব হবে। এখন প্লিজ, আমার কাঁচা ঘুমটা ঘেঁটে দিস না—।’
শানু আবার ওপাশ ফিরে শুয়ে পড়ল।
ঘরের দেওয়ালে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল। তারপরই বাজ পড়ার শব্দ।
টুনটুন অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ঘুমোতে চেষ্টা করল।
পরদিন বিকেলে শানুর সঙ্গে তিলকপুর দেখতে বেরোল টুনটুন। বেরোনোর সময় অনিতা জোর করে ছেলের হাতে একটা ছাতা গুঁজে দিয়েছেন।
টুনটুন আকাশের দিকে তাকাল। আকাশে কালো মেঘ। কিন্তু সেই কালো মেঘের মাঝে-মাঝে ছোট-ছোট নীল জানলা—আকাশ দেখা যাচ্ছে। চারিদিকে কত যে গাছ! তারা সব সবুজ হাত তুলে আকাশকে যেন ডাকছে।
দেখতে-দেখতে টুনটুনের মনে হল, ও কারও আঁকা একটা ছবি দেখছে। কলকাতায় এরকম ছবি দেখতে পাওয়া যায় না। ইস, মা-কে এই ছবিটা দেখাতে পারলে ভীষণ ভালো লাগত ওর।
হাঁটতে-হাঁটতে ওরা দুটো পুকুর পেরিয়ে গেল। তারপরই একটা বিশাল খেলার মাঠ। মাঠে ছেলেরা ফুটবল খেলছে। জল-কাদায় ওদের ভূতের মতো লাগছে।
শানু বলল, ‘এই মাঠে আমরা খেলি। ওই যে, আমার বন্ধুরা সব খেলছে। পরশু থেকে আমার জ্বর-জ্বর মতন হয়েছে বলে মা ক’দিন খেলতে বারণ করেছে। এই মাঠটা পেরোলেই আমাদের ক্লাব ”বিপ্লবী সংঘ”।’
কথা শেষ হতে-না-হতেই শানুর পকেটের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ফোন বের করে পরদার দিকে একপলক তাকাল শানু। কে ফোন করেছে দেখল। তারপর বোতাম টিপে ফোন কানে লাগিয়ে বলল, ‘এই তো, ক্লাবের কাছে এসে গেছি। মাঠ পেরোচ্ছি। আমার সঙ্গে আমার মাসতুতো বোন আছে। আমাদের বাড়িতে ক’দিনের জন্যে বেড়াতে এসেছে। হ্যাঁ, হ্যাঁ—এক্ষুনি ঢুকছি।’
মাঠের পাশ দিয়ে ওরা এগোতে লাগল। মাটির ওপরে ইটের খোয়া ছড়ানো রাস্তা। তার জায়গায়-জায়গায় জল-কাদা জমে আছে। রাস্তার পাশে বড়-বড় ঘাস, আর কয়েকটা বিশাল গাছ। তার পাশেই ঢালু জমি নেমে গেছে। সেখানে বৃষ্টির জল জমে ছোটখাটো পুকুর হয়ে গেছে। ব্যাঙের দল ডাকছে।
একটু পরেই ওরা ক্লাবঘরের সামনে এসে দাঁড়াল।
ইটের দেওয়াল। সাদা রং করা। মাথায় টিনের চাল। তার ওপরে গাছের ঝরাপাতা ছড়িয়ে আছে।
ক্লাবঘরের দেওয়ালে ছোট্ট সাইনবোর্ড। তাতে লেখা: ‘বিপ্লবী সংঘ’।
খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল ওরা।
ঘরে টিভি চলছে। মেঝেতে রঙিন চাদর পাতা তার ওপরে বসে তিনজন ছেলে টিভিতে ফুটবল খেলা দেখছে।
তিনজনের সঙ্গে টুনটুনের পরিচয় করিয়ে দিল শানু। অঙ্কিত, রোশন, আর রাজর্ষি। ওরা টুনটুনকে বসতে বলল। তখন শানু বলল, ‘না রে, এখন বসব না। ওকে কালো বাড়ি দেখাতে নিয়ে যাব। অন্ধকার হয়ে গেলে প্রবলেম জানিস তো!’
তিনজনের মধ্যে দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে সবচেয়ে বড়সড় অঙ্কিত। ও হেসে বলে উঠল, ‘না, না—ওকে দেখাস না। ভয় পেয়ে যাবে…।’
টুনটুন পালটা হাসল, ‘ভয় পাই পাব। আমার ওই বাড়িটা খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। তা ছাড়া ভয়-টয় পেলে তোমরা তো আছ…।’
