অনাদি সামন্ত নিরুপমার চুল সরিয়ে দিল কপাল থেকে। নিরুপমা সামনে তাকিয়ে। অনাদি একবার হাসল, তারপর বলল, ‘নিরু, এবার তুই খুশি তো?’
নিরুপমা কোনও জবাব দিল না। অনাদি অফিসারের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, ‘…সেই লোকটাকে ফাঁসি দিন, স্যার, সেই লোকটাকে ফাঁসি দিন…।’
না যেন করি ভয়
গরম বেগুনিতে কামড় দিয়ে শানু একটু বিপদে পড়ল। হাঁ করে ফুঁ দিয়ে বেগুনির টুকরোটাকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করল। তারপর সাবধানে ছ্যাঁকা বাঁচিয়ে ওটাকে কামড় দিতে-দিতে বলল, ‘আসলে আইটা উ আজে—।’
টুনটুন জিগ্যেস করল, ‘কী বললে? কী বললে?’
বেগুনিটাকে ঠিকঠাক কবজা করে শানু আবার একই কথা বলল, ‘আসলে বাড়িটা খুব বাজে—।’
শানুর মা অনিতা, মানে টুনটুনের মাসি, ভুরু কুঁচকে ছেলেকে আলতো ধমক দিয়ে বললেন, ‘ওকে এসব আজেবাজে কথা বলার কী দরকার! ছেলেটা ক’দিনের জন্যে বেড়াতে এসেছে।’
শানু মাসতুতো বোনের দিকে একবার তাকিয়ে একমুঠো মুড়ি মুখে ঢেলে দিল। তারপর সেটা চিবোতে-চিবোতে বলল, ‘আগে থেকে না বলে রাখলে প্রবলেম আছে, মা। নইলে কোন রাতে দেখবে বাঁশির আওয়াজ শুনে…।’
অনিতা তাড়াতাড়ি ছেলেকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘থাক, থাক—এখন ওসব বাজে কথা থাক। ও সবে এসেছে…।’
টুনটুন হেসে উঠে হাত নেড়ে বলল, ‘ওতে আমি ভয় পাব না, মাসি। ওরকম ভুতুড়ে বাড়ির গল্প আমি অনেক পড়েছি। শুধু দেখতেই যা বাকি! তো শানুদা যদি হেলপ করে তা হলে সেই বাকিটুকুও আর থাকবে না।’
কথা শেষ করে টুনটুন মুড়ি-তেলেভাজায় মন দিল।
বাইরে ঝমঝম শ্রাবণের বৃষ্টি। শুরু হয়েছে সেই দুপুর থেকে—আর এখন সন্ধে সাতটা। আকাশের যা হাঁকডাক আর জলের যা তোড় তাতে মনে হয় না এ-বৃষ্টি মাঝরাতেও থামবে।
না থামুক ক্ষতি নেই। কারণ, টুনটুন জানে, বৃষ্টি-ঝমঝম সন্ধেবেলাতেই ভূতের গল্প-টল্প ভালো জমে। তাই ও চেয়ারে নড়েচড়ে বসে বেশ আশা নিয়ে পলকহীন চেয়ে রইল শানুর দিকে। ওর নজরে একটা বেপরোয়া ভাবও ছিল। সেই ভাবটা যেন বলতে চাইছে, এসো, কত ভয় দেখাবে দেখাও। পরীক্ষা করেই দ্যাখো আমি ভয় পাই কি না।
বিকট শব্দে বাজ পড়ল বাইরে। কাচের জানলার নীলচে সাদা আলো ঝিলিক মারছে বারবার। সেদিকে একপলক দেখে অনিতা শানুর দিকে তাকিয়ে বেশ চিন্তার গলায় বললেন, ‘তোর বাপিকে কতবার করে বললাম, এখন বেরিয়ো না। জেদ ধরে সেই গেলই। ছাতাতে কি এ-বৃষ্টি আর আটকায়! দেখিস একেবারে ভিজে কাক হয়ে ফিরবে…।’
টুনটুনের মেসো গেছেন ইলেকট্রিক মিস্ত্রিকে খবর দিতে। কারণ, ফ্রিজের গায়ে হাত দিলে নাকি শক মারছে। টুনটুন আজ বিকেলে শক খেয়েছে বলেই মেসোর চিন্তাটা হয়েছে আরও বেশি। সকালে এসে পৌঁছেছে যে-অতিথি সে কি না বিকেলের মধ্যেই শক খেয়ে বসে আছে!
টুনটুন যতই মেসোকে বুঝিয়েছে যে, শকটা হালকা চিনচিনে—ওর তেমন কিছু লাগেনি, মেসো ততই জেদ ধরে বলেছেন, ‘ইলেকট্রিক শক মানে ইলেকট্রিক শক। তাকে কখনও খাটো করে দেখা উচিত নয়…।’
শানু ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে কাঁচুমাচু মুখে আবদার করে বলল, ‘মা, প্লিজ, ওকে শর্টে কালো বাড়ির ব্যাপারটা একটু বলি। ও তো ভয় পাবে না বলছে। তা ছাড়া ও এখানে নতুন। ওকে একটু অ্যালার্ট না করে দিলে কখন কী হয়…।’
অনিতা নিমরাজি হলেন: ‘বললে বল। এরপর রাতে যদি ও ভয় পায়…।’
টুনটুন তেলেভাজা চিবোতে-চিবোতে তাড়াহুড়ো করে বলে উঠল, ‘না, না, মাসি। তুমি শুধু-শুধু ভয় পাচ্ছ। আমার..।’
শানুও তাল মিলিয়ে বলল, ‘রাতে ও ভয় পাবে কী করে? ও তো তোমার আর আমার সঙ্গে শোবে…।
শেষ পর্যন্ত অনিতা হার মানলেন। ওদের জন্য আরও কয়েকটা বেগুনি ভাজতে রান্নাঘরের দিকে রওনা হলেন।
শানু মুড়ি-তেলেভাজা খেতে-খেতে বলল, ‘তোকে ব্যাপারটা বলছি…কিন্তু বাপির সামনে এ নিয়ে একটা কথাও বলবি না।’
টুনটুন ঘাড় নাড়ল। কয়েকবার পা দুলিয়ে শানুর দিকে ঝুঁকে এল।
টুনটুন এবার মাধ্যমিক পাশ করেছে। শুধু পাশই করেনি, চারটে লেটার এবং স্টার পেয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওর মন ভরেনি। রেজাল্টটা আরও ভালো হবে আশা করেছিল। ওর স্কুলের টিচাররাও এই রেজাল্টে কিছুটা হতাশ হয়েছেন। ফলে রেজাল্ট বেরোনোর পর টুনটুন ক’টা দিন বেশ মনমরা হয়েছিল। তাই দেখে মা আর বাপি দুজনেই ঠিক করলেন, ও মাসির বাড়ি ক’দিন ঘুরে আসুক।
টুনটুনের মেসোর বদলির চাকরি। মাসছয়েক আগে বদলি হয়ে এসেছেন তিলকপুরে। সুতরাং টুনটুনের মন ভালো করতে মাসির বাড়িতেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে ওকে।
আজ সকালেই বাপি ওকে পৌঁছে দিয়ে কলকাতায় ফিরে গেছেন। সাত-আটদিন পর এসে আবার নিয়ে যাবেন।
বাপি চলে যাওয়ার পর টুনটুনের কিছুক্ষণ মনখারাপ লেগেছিল, কিন্তু শানু ওর সঙ্গে গল্পে মেতে উঠতেই মনখারাপের ব্যাপারটা ওর মাথা থেকে উবে গেল। আর তারপরই শুরু হল বৃষ্টি।
শানু টুনটুনের চেয়ে বছর চারেকের বড়। ও বি. কম. পড়ছে বটে, কিন্তু পড়াশোনা ওর ভালো লাগে না। সবসময় অ্যাডভেঞ্চার খুঁজে বেড়ায়। ওর জন্য চিন্তা করে-করে মাসি নাকি রোগা হয়ে গেছে।
টুনটুন এসব কথা মায়ের মুখেই শুনেছে। শুনে-শুনে ‘শানুদা’কে ও অপছন্দ করতে শুরু করেছিল। কিন্তু এখানে এসে শানুর সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর, গল্প করার পর, ‘শানুদা’কে ওর দারুণ পছন্দ হয়ে গেছে।
