তুই আবার বললি, অনেক চেষ্টা করে তারপর তোর ভেতরটা আমি দেখতে পেয়েছি। তোর ভেতরে-ভেতরে এত!
কী সর্বনেশে কথা! আমি আর কোনও কথা বলতে পারিনি।
প্রথমদিনের পর তোর আর আমার দেখা হওয়াটা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেল। এতে আশপাশে যে ‘ফিসফাস’ হচ্ছে সেটা টের পাইনি এমন বোকা আমি নই। একদিন বন্যা যে চাপা গলায় অনিতাকে বলেছিল, শালা ব্যাপক কম্বিনেশান!—সেটাও আমার কানে এসেছিল। কিন্তু আমি তখন অন্ধ। ‘নিঃশব্দ চরণে’ যে এসেছে তাকে আমি পাগলের মতো আঁকড়ে ধরেছিলাম। মনে-মনে বলেছিলাম, যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক আমি তোমায় ছাড়ব না।
কবিতা লেখার অসুখ ছিল আমার। কিন্তু লুকিয়ে-লুকিয়ে। ভাবতাম কালো কুৎসিত মেয়ের আবার কবিতা! একটা কাল্পনিক লজ্জা, একটা কাল্পনিক অপমানের ভয়, একটা কাল্পনিক সংকোচ আমাকে সেই বালিকা বয়েস থেকেই শামুকের মতো গুটিয়ে দিয়েছিল। একদিন, দু-দিন, তিনদিনে তুই সেই খোলসটাকে চুরমার করে দিলি। লুকোনো কবিতা সামনে এসে গেল। তোর সামনে।
অবিশ্বাস্য হলেও তোর সঙ্গে আমার কী করে যেন কী হয়ে গেল। অনেকটা কেমিক্যাল রিঅ্যাকশনের মতন।
শ্রাবণ গড়িয়ে ভাদ্র এল। আমি তোর নেশায় পাগল। আমার ছন্নছাড়া ছিন্নছেঁড়া জীবনটা তখন যেন একটু-একটু করে মানে খুঁজে পাচ্ছে। তুই আসা-যাওয়া করছিস আমাদের বাড়িতে। বাড়ির আবহাওয়াটা বদলাচ্ছে। মামণি আর বাপির চোখেমুখে চাপা স্বস্তির ভাব টের পাচ্ছি। হাহুতাশ আঁধারের মধ্যে ওরা যেন একটু আলো দেখতে পেয়েছে।
তোর নিশ্চয়ই সেদিনটার কথা মনে আছে? মানে, সেই রাতটার কথা। বাড়িতে সেদিন কেউ ছিল না। আমাদের ফাটল-ধরা ছাদে দুজনে বসেছিলাম। তুই হঠাৎ বললি, চাঁদের আলোয় তোকে অনেক বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে।
কী করে আমাকে বেশি সুন্দর দেখাচ্ছিল জানি না। চাঁদের আলো কি অন্তর পর্যন্ত যায়? তাতে কি ভেতরের সৌন্দর্যটা ধরা পড়ে? তবে সেদিনটা বোধহয় নষ্টচন্দ্রের রাত ছিল। ভাদ্রমাসের শুক্লচতুর্থীর রাত। শুনেছি এই চাঁদ দেখলে কলঙ্ক হয়। হলও। যে-কলঙ্কের আকাঙ্ক্ষায় আমার শরীর আর মন বহুবছর ধরে অপেক্ষা করেছে তুই আমার সেই আশ মেটালি।
প্রথমে হাতে হাত। তারপর ঠোঁটে ঠোঁট। আর সবশেষে শরীরে শরীরে। সে রাতে আমি পূর্ণ হলাম। তৃপ্তি আর বিস্ময়ে সারাটা রাত ঘুমোতে পারিনি। পরদিন সায়েন্স কলেজে, সুযোগ পেতেই, তোর হাতে একটা আবছা নীল কাগজ ধরিয়ে দিলাম। তাতে একটা কবিতা লেখা ছিল। শুধু তোর জন্যে। তোকে লেখা আমার প্রথম ‘চিঠি’। তার চারটে লাইন এই মুহূর্তেও আমার মনে পড়ছে:
ওষ্ঠাধরে কোমল নিপীড়ন,
সয়েছিলাম মধুর যন্ত্রণাতে—
স্পর্শকাতর আমার স্পষ্ট হাত,
রেখেছিলাম তোমার নষ্ট হাতে।
তুই আমাকে বলেছিলি, তোর নৌকোয় কোনও মাঝি ছিল না। অথচ ভাসতে-ভাসতে সেই দিশাহীন নৌকোটা কী করে যেন হঠাৎ তীর খুঁজে পেল। সত্যিই জীবন বড় আশ্চর্য!
তোর কথাটা আমার ভীষণ ভালো লেগেছিল। এ যেন আমারই মনের কথা—তোর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। বিশ্বাস কর, আমি তখন মনে-মনে তোর সঙ্গে থাকতে শুরু করেছিলাম।
কিন্তু একদিন…।
জানি, এইখান থেকে চিঠিটা লিখতে আমার বেশ কষ্ট হবে। কিন্তু লিখতে তো আমাকে হবেই।
সেদিন জেসিএম-এর পিরিয়ডটা অফ ছিল। তো আমি লাইব্রেরিতে একটা বই চেঞ্জ করতে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে ক্লাসে ঢুকতে যাব—হঠাৎ শুনি তোর গলায় আমার নাম। ক্লাসের বাইরেই দাঁড়িয়ে পড়লাম। তুই কী বলছিস আমার নামে? কাকেই-বা বলছিস? আমাদের দুজনের যা একান্ত গোপন কথা, যা শুধু আমরা দুজনই জানি—সেসব বলবি না তো?
শুনলাম তুই আমার নাম করে বলছিস, জানিস, ওকে সেদিন নামিয়ে দিয়েছি।
কে একজন জিগ্যেস করল, বস, নামিয়ে দিয়েছ মানে?
সালা ন্যাকা! কিছু বোঝে না!—তুই বললি, নামিয়ে দিয়েছি মানে ওর কেস কমপ্লিট। ছাদে চাঁদের আলোয় বোল্ড করে দিয়েছি।
তা হলে তো তুমি বস ‘ম্যান অফ দ্য ম্যাচ’ প্রাইজ পাবে। ওরকম বিশখোবড়া থোবড়া তুমি ট্যাকল করলে কী করে?
তোর হাসির শব্দ পেলাম। তারপর তুই বললি, মুখে রুমাল চাপা দিয়ে নিয়েছিলাম।
আমার মাথা ঘুরতে শুরু করল। ক্লাসরুমের কাছ থেকে ছুটে চলে যেতে চাইলাম। কিন্তু দোতলার সিঁড়ির কাছে এসে মাথাটা সাংঘাতিক টলে উঠল। কোনওরকমে রেলিং ধরে সামলে নিলাম। বসে পড়লাম সিঁড়ির ধাপে।
ও মিথ্যে কথা বলছে! আমার মুখে ও মোটেই রুমাল চাপা দেয়নি। বরং আকাঙ্ক্ষার চরম মুহূর্তে ও আমার দিকেই তাকিয়েছিল। কিন্তু কে এখন বিশ্বাস করবে এ-কথা! কেউ না!
আমার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইছিল। সেই মুহূর্তেই মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু…কিন্তু তখন যদি আমি সুইসাইড করতাম তা হলে তোর মিথ্যেটাই যে চিরস্থায়ী হয়ে যেত! সে আমি হতে দিই কেমন করে!
সেদিনটা কাটল কোনওরকমে। তার পরের দিন। তারও পরের দিন। তুই আমাকে এড়িয়ে-এড়িয়ে চলতে লাগলি। কিছুটা আমিও। পরপর কয়েকটা দিন চোখ-কান খোলা রেখে আরও কিছু খবর পেলাম। জানলাম যে, চারপাশে আড়াল তোলা কুৎসিত এই মেয়েটাকে বোল্ড আউট করবি বলে তুই জয়জিতের সঙ্গে বিরিয়ানি বাজি রেখেছিলি। না, এই খবরটা নতুন করে কোনও ব্যথা দেয়নি আমাকে। এমনকী খবরটা সত্যি না মিথ্যে সেটা জানার জন্যেও কোনও আগ্রহ জাগেনি। শুধু ওই রুমালের মিথ্যেটা বুকের ভেতরে নিষ্ঠুর অপমানের ছুরি চালিয়েছিল।
