মনে পড়ে, সেটা ছিল শ্রাবণ মাস। তোর ভালোবাসার দোকানে আমি কী করে যেন ঢুকে পড়েছিলাম। হ্যাঁ—দোকানই তো! যেখানে সবসময় তোর ভালোবাসা চাওয়ার এত ভিড়। সুজাতা, বন্যা, তিতি, অনিতা—আরও কারা-কারা যে তোর সঙ্গে ঘুরতে চাইত, থাকতে চাইত কে জানে!
না, আমি চাইনি। কারণটা তো তুই জানিস। আমার গায়ের রং কালো, রূপও কালো। কখনও কেউ ঘুরে তাকাবে না—এমন মেয়ে আমি। তুই যেমন এটা জানিস আমিও তো জানি। জানব না আর! রোজ হতচ্ছাড়া আয়নাটা যে আমাকে জানিয়ে দেয়!
যখন ছোট ছিলাম তখন ভাবতাম, যখন বড় হব—আরও বড় হব—তখন এই আজেবাজে চেহারাটা একটু-একটু বদলে গিয়ে কমবাজে হয়ে যাবে। সেই ‘আগলি ডাকলিং’-এর মতো। তখন কেউ-না-কেউ নিশ্চয়ই তাকাবে। আমার বাপি, মামণি আর কাকিমা-জেঠিমারা আমার বিয়ে হবে-কি-হবে না সেই নিয়ে কী চিন্তাই না করত! অবশ্য আমার সামনে কিছু বলত না। কিন্তু আড়াল থেকে আমি শুনতাম। আর আমার কান্না পেত। ওঃ, একটা মেয়ের জীবনে পুরুষ এত জরুরি! কেন, কেন?
পড়াশোনায় খারাপ ছিলাম না—ভালোই ছিলাম। নইলে তোর সঙ্গে সায়েন্স কলেজে দেখা হল কী করে! তুই লেখাপড়ায় আমার চেয়ে অনেক বেশি ভালো। আর দেখতে? তুই যে কেন সিনেমায় কিংবা টিভি সিরিয়ালে গেলি না কে জানে! সুজাতা, বন্যারা তোকে বারবার সে-কথা বলত। অবশ্য তুই আমাকে পরে বলেছিলি ওগুলো তোকে খুশি করার জন্যে।
বাইরে আমাকে দেখতে যা-ই হোক আসলে ভেতরে-ভেতরে আমি তো একটা মেয়ে। তখন রোজ ভাবতাম, ‘বিউটি ইজ ওনলি স্কিন ডিপ।’ চামড়া ডিঙোলেই সৌন্দর্য শেষ। তা হলে কেন? কেন এরকম হবে? তোরা—মানে, পুরুষরা—শুধু বাইরেটাই দেখবি? ভেতরের সুন্দরকে দেখবি না! তুই তো তখন জানতি না ভেতরে-ভেতরে আমি কী আশ্চর্য রূপসী।
আমি মনে-মনে ভাবতাম, বরফে ঢাকা পাহাড়চূড়ায় ভোরের আলো এসে পড়লে যেমন অপরূপ দেখায়, আমি সেইরকম। শীতের পর বসন্ত এলে মরাগাছের ডালে যখন ঝকঝকে সবুজ নতুন পাতা ফোটে—ওদের দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। আমি ওদের মতন। কৃষ্ণচূড়া আর পলাশ যেমন ডালে-ডালে ফুলের আগুন জ্বালিয়ে রূপসজ্জায় সবাইকে মাতিয়ে দেয়, আমি সেইরকম।
তো এইসব ভাবতাম আর বিছানায় অসহায়ভাবে শুয়ে শব্দ না করে কাঁদতাম। নইলে পাশের ঘরে শুয়ে থাকা বাপি আর মামণি শুনতে পাবে যে!
আমার কল্পনা আমার ছিল। আমার স্বপ্ন আমার। হঠাৎ কী যে হয়ে গেল! একটা কাগজের গোল বল সব তালগোল পাকিয়ে দিল।
মনে আছে নিশ্চয়ই তোর, সেদিন আমরা সবাই মিলে টিএসপি-র ক্লাস করছিলাম। উনি জের্যান্টোলজির মেন্টাল এজিং নিয়ে কীসব বকবক করছিলেন। আমি মন দিয়ে শুনতে পারছিলাম না। কারণ, গতকাল ক্যান্টিনে বন্যা একটা কমেন্ট করেছিল। হয়তো ঠাট্টা করেই—কিন্তু সেটা আমাকে খুব বিঁধেছিল।
আমি তখন গৌরদার ক্যান্টিনে সেকেন্ড দরজা দিয়ে ঢুকছি। তোরা লম্বা বেঞ্চটায় বসে কী দিয়ে যেন হাসাহাসি ঢলাঢলি করছিলি। আমাকে দেখেই বন্যা হাত তুলে চেঁচিয়ে বলল, অ্যাই, আলো জ্বলে দে—মিস ডার্কনেস এসে গেছে!
তখন ঘোর দুপুর। আলো জ্বালার কোনও প্রশ্নই নেই। সুতরাং, বুঝতেই পারছিস—আমি এসেছি বলে কেন আলো জ্বালতে হবে।
তাই ক্লাসে বেশ অন্যমনস্ক ছিলাম। তাকিয়েছিলাম টিএসপি-র দিকে, কিন্তু শুনছিলাম না কিছুই। হঠাৎই কী একটা যেন গায়ে এসে লাগল। মাথা ঘুরিয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে দেখি একটা কাগজের বল। ক্লাসে যেমন ছোড়াছুড়ি হয় আর কী! কিন্তু আমার গায়ে কেউ কখনও ছোড়েনি।
‘অপরাধী’র খোঁজে তাকাতেই তোকে দেখলাম। তুই একটু-একটু হাসছিলি। আমি ভাবলাম, ব্যাপারটা তোর কাজ। কিন্তু তুই হঠাৎ আমার গায়ে কেন কাগজের বল ছুড়বি এর উত্তরটা কোনও যুক্তিতেই মাথায় আসছিল না। কিন্তু তুই হাসছিলি। আর আমি তোর দিকে তাকাতেই চোখের ইশারায় বললি, পরে কথা হবে।
চাপতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তা সত্ত্বেও বুকের ভেতরে পাগল-করা একটা ঢেউ উঠল। আমাকে ভিজিয়ে দিল, ভাসিয়ে দিল। মনে হল, একটা অলৌকিক স্বপ্ন যেন কোন ম্যাজিকে জ্যান্ত হয়ে হঠাৎ করে ক্লাসরুমে নেমে এসেছে।
পরে তোর সঙ্গে কথা হল। প্রথমে ক্যান্টিনে—তারপর রাস্তায়। ক্যান্টিনে আরও অনেকে ছিল…কিন্তু রাস্তায় আর-কেউ ছিল না। শুধু তুই, আর আমি। আমাদের পাড়ার কোন একটা দোকানের ঠিকানা খোঁজ করার ছুতোয় তুই আমার হেলপ চেয়েছিলি। এই ছুতোটা হয়তো শুধু আমার জন্যে নয়—বন্যা, তিতি, সুজাতাদের জন্যেও। বেশ মনে আছে, ওরা বেশ অবাক চোখে তোর দিকে তাকিয়েছিল।
রাস্তায় আমাকে একা পেয়ে তুই যে কত কথা বলেছিলি! খইয়ের বস্তার মুখ আচমকা ছিঁড়ে হাট হয়ে গেলে যেভাবে খই ছড়িয়ে পড়ে ঠিক সেভাবে তোর কথাগুলো শব্দের বন্যা হয়ে আমাকে ডুবিয়ে দিয়েছিল।
মনে আছে, অনেক কথার মাঝে তুই আমাকে ফস করে বলেছিলি, তুই সবসময় পাঁচিল দিয়ে নিজেকে আড়াল করে রাখিস কেন? কারও সঙ্গে কথা বলিস না—সরে-সরে থাকিস…।
কী মারাত্মক কথা! তুই কী করে এটা বুঝলি কে জানে! সত্যিই তো, আমি সবসময় নিজেকে আড়াল করে রাখি। ছেলেদের সঙ্গে মিশি না। অথচ মিশতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ওরা যদি আমার এই হতচ্ছাড়া চেহারা নিয়ে ব্যঙ্গ করে! ঠাট্টার খোঁচা কখনও দিয়ে ফ্যালে আমায়! অথচ দ্যাখ, বাইরের চেহারার ওপর কারও কি কোনও হাত থাকে? ওটা তো ‘আকাশ’ থেকে আসে। তাই আমি যে কত যত্ন নিয়ে আমার ভেতরটা সাজিয়েছি—রোজ সাজাই—তার খবর কে রাখে!
