তুই ভালো করেই জানতিস, নিজের ইনফিরিয়ারিটি কমপ্লেক্স আড়াল করার জন্যে আমি সুপিরিয়ারিটি কমপ্লেক্সের পাঁচিল তুলে দিয়েছিলাম আমার চারপাশে। আকাঙ্ক্ষায় কাতর এই অরূপ মেয়েটাকে সবাই ভাবত পুরুষবিদ্বেষী, অহঙ্কারী। আজ আর ভালো করে ঠাহর করতে পারি না, আমি তোর প্রেম স্টোর্সে ঢুকে পড়েছিলাম, নাকি তুই আমার পাঁচিলটাকে তোড়ফোড় করে আমার অন্তরে অনুপ্রবেশ করেছিলি। স্রেফ একপ্লেট বিরিয়ানি খাওয়ার জন্যে।
এই মুহূর্তে সব আমার গুলিয়ে গেছে। শুধু ওই নৃশংস মিথ্যেটুকু সত্যি হয়ে আমার কুৎসিত মুখের দিকে তাকিয়ে হা-হা করে হাসছে। ক’দিন ধরেই শুনছি এই হাসিটা। আর হৃৎপিণ্ডের গা থেকে নখ দিয়ে খুঁটে ক্রমাগত নুনছাল তুলছে কেউ। জ্বালা—অসহ্য জ্বালা!
তাই আর সইতে না পেরে টেলিফোনে কান্নাকাটি করে তোকে একবারের জন্যে ডেকেছিলাম। বলেছিলাম, শেষবারের জন্যে। আর কোনওদিনও তোকে আসতে বলব না। এই একটিবার অন্তত আয়। ফর ওল্ড টাইমস সেক।
তুই এলি। সঙ্গে তোর রূপ, অহংকার আর মেয়েভোলানো আত্মবিশ্বাস।
সবকিছুই ছিল ঠিক সেদিনের মতো।
আকাশে নির্লজ্জ শুক্লচতুর্থীর চাঁদ। চারপাশে বৃষ্টিভেজা বাতাস। আর নির্জন ছাদের রহস্যময় অন্ধকার।
তুই সেদিনের মতো আবার বললি, চাঁদের আলোয় তোকে অনেক বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে।
আমি বললাম, জানি।
তারপর তুই আমায় জাপটে ধরলি। এবার কপালে বিরিয়ানি জুটুক-না-জুটুক, পড়ে পাওয়া চোদ্দোআনা হাতছাড়া করার কোনও মানে হয় না। তাই আবার তুই আমার ‘কেস কমপ্লিট’ করলি। ছাদে চাঁদের আলোয় আমাকে দ্বিতীয়বার বোল্ড আউট করলি তুই।
তারপর?
তারপর আমার পালা।
মাংসাকাটার ছুরিটা কোথায় লুকোনো ছিল তুই দেখতে পাসনি। কী করেই বা দেখবি! ওটার রং তো আমার গায়ের রঙের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। তা ছাড়া ওই রহস্যময় অন্ধকার।
তোর গলার নলি ফাঁক হয়ে গেল। রক্তে ভেসে গেল আমার শরীর। তুই ছাদের ফাটল-ধরা রুক্ষ মেঝেতে ছটফট করতে লাগেলি। শেষবারের মতো চিৎকার করতে চেয়েছিলি বোধহয়—কিন্তু চিৎকারের কঙ্কালটা ঘড়ঘড় শব্দে গলার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এল।
আমি এবারে চাদরের নীচে লুকোনো ছোট্ট টেপরেকর্ডারটা চালিয়ে দিলাম।
শোনা গেল তোর গাঢ় গলা: চাঁদের আলোয় তোকে অনেক বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে।
তোর বলা কথাগুলো মণিমুক্তো হয়ে ধরা রইল চিরকালের জন্যে। এই সত্যিটা এবার চিরস্থায়ী হল।
কিন্তু এখনও যে আমার আর-একটা কাজ বাকি!
তাই তোর স্থির-হয়ে-আসা শরীরের পোশাক হাতড়ে তোর রুমালটা বের করলাম। তুই তখন হাঁ করে আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে। চাঁদও ভ্যাবাচ্যাকা মুখে তোকে দেখছে।
তোর মুখটা রুমালে ঢেকে দিলাম আমি। সুন্দর যেমন কুৎসিতকে ঘৃণা করে, কুৎসিতও তেমন ঘৃণা করতে পারে সুন্দরকে। এই যেমনি আমি এখন তোকে।
এইবার…এইবার আমার দ্বিতীয় সত্যিটা চিরস্থায়ী হল। কেউ আর একে পালটাতে পারবে না। তুইও না। তোর খোঁজে সবাই যখন আসবে, তখন দেখবে—আমার নয়, তোর মুখই রুমালে ঢাকা। আর তোর শরীরের পাশে রাখা টেপরেকর্ডারে শুনবে তোর শেষকথা। তোর শেষ সত্যি কথাটা।
এখন নীচের ঘরে এসে এই চিঠি লিখছি। খারাপ লাগছে চিঠিটা তুই পড়তে পারবি না বলে। কিন্তু এখন তোর আর কিছু করার নেই!
এবার আমি ছাদে যাব আবার। অন্ধকারে তোর পাশে শুয়ে পড়ব। তারপর রক্তাক্ত ছুরিটা আরও একটা গলার নলি ফাঁক করবে। বেশ হবে, তাই না? আমি আর তুই পাশাপাশি শুয়ে থাকব। আর আমি অপলকে নষ্ট চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকব…তাকিয়ে থাকব…।
না ভেবে খুন কোরো না…
অনাদি সামন্ত আগে কখনও খুন করেনি। কিন্তু প্রত্যেক জিনিসেরই ‘শুভ উদ্বোধন’ বলে একটা কথা আছে, সুতরাং অনাদি সামন্তর জীবনেও সেই ‘শুভ উদ্বোধন’ এল। শুভ ১লা বৈশাখের পুণ্য লগ্নে সে তার জটিলা এবং কুটিলা স্ত্রী নিরুপমা সামন্তকে খুন করল।
খুনটা সে করেছিল নেহাতই গলা টিপে। নিরুপমার দেহটা যখন অসাড় হয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়ল তখন রাত ন’টা।
অনাদির বাড়ি বউবাজার অঞ্চলে। ফ্ল্যাট ভাড়া করে স্বামী-স্ত্রীতে মিলে থাকত। খুন করার আগে অতশত সে ভাবেনি। তাকে যদি কেউ প্রশ্ন করত, বউয়ের এই পঁয়ষট্টি কেজি লাশ তুমি গায়েব করবে কী করে, সে সোজা উত্তর দিত, অতশত এখনও ভেবে দেখেনি। সুতরাং, নিরুপমা মৃতসমা হওয়ার পরই সে একটু চিন্তায় পড়ল। লাশটা নিয়ে কী করা যায়?
প্রথমে ভাবল ঘরের ভেতরেই ওটা জ্বালিয়ে দেবে কি না। পরে চিন্তা করে দেখল, তাতে পাড়াপড়শি ও বাড়িওয়ালার দুর্গন্ধে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা। দ্বিতীয় কোনও পন্থা ভেবে বের করার আগে সে রহস্য-রোমাঞ্চ বইয়ে পড়া লাশ গায়েবের উপায়গুলো স্মৃতির পাতা হাতড়ে খতিয়ে দেখতে শুরু করল।
নিরুপমাকে টুকরো-টুকরো করে আচার দিয়ে খেয়ে ফেলবে? নাকি খণ্ড-খণ্ড করে মৃতদেহের অংশগুলো কাগজে মুড়ে কলকাতার জনবহুল রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেবে? আবার ট্রাঙ্কে ভরে ট্রেনে তুলে দেওয়ার কায়দাটাও হেসে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তার চিন্তাধারা অব্যাহত গতিতে অন্তঃসলিলা ফল্গুর মতো বয়ে চলল।
নিরুপমা যখন শক্ত-পোক্ত (রাইগ্যর মর্টিস) হল তখন অনাদির সামন্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছল। এতক্ষণ সে ঘরের আলো জ্বেলে নিরুপমার মাথার কাছে বাবু হয়ে বসেছিল। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই উঠে রান্নাঘরের দিকে গেল কাটারি আনতে। কাটারি নিয়ে এসে তার চেষ্টাচরিত্র শুরু হল।
