অফিসার হাসলেন। সোফায় বসে পকেট থেকে একটা ছোট্ট নীল ডায়েরি আর একটা চিঠি বের করলেন।
উৎকণ্ঠায় সোজা হয়ে বসল অরিসেন। কী ওটা? ডায়েরি না? কার ডায়েরি?
মিস্টার রায়, আপনি বোধহয় আপনার পাশের বাড়ির নীলাদ্রি সেনের ব্যাপারটা শুনেছেন?
হ্যাঁ, লোকজনের মুখে শুনেছি। খুব স্যাড ব্যাপার।
আচ্ছা, ওঁর সঙ্গে আপনার কীরকম পরিচয় ছিল?
সামান্যই। ওই পাড়াপড়শির সঙ্গে যেমন পরিচয় থাকে আর কী!
দেখুন তো, এই ডায়েরিটা চিনতে পারেন কি না?—নীল ডায়েরিটা অরির দিকে এগিয়ে ধরলেন অফিসার।
অরির বুকটা ধক করে উঠল। ডানহাত নিজের অজান্তেই প্যান্টের পকেটের ওপর গিয়ে থামল। কারণ, সেদিন রাতে এরকমই একটা ডায়েরি ও পকেটে ভরেছিল। তখন খুলে পড়েও দেখেনি ওর ভেতরে কী লেখা ছিল। তা হলে কি শেষ পর্যন্ত মেঝেতে পড়ে গিয়েছিল ওটা? নাকি ভুল করে ফেলেই এসেছিল ও?
অরি হাত বাড়াল ডায়েরিটার দিকে। ওর গলা যেন হঠাৎ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
ডায়েরিটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বেশ কয়েকবার নেড়েচেড়ে দেখল অরি। ডায়েরিটার ব্যাপারটা কি ও অস্বীকার করবে, নাকি…?
অফিসার তখন বলে চলেছেন, আর এই যে চিঠিটা—এটা মিস্টার সেনের ঠিকানায় এলেও আপনারই নামে লেখা। যে-পিয়োন সন্ধের ডাকে চিঠি দেয়, সে-ই ভুল করে যে এ-কাজটা করেছে সেটা আমরা জানতে পেরেছি। সে আরও বলেছে, গত বৃহস্পতিবার (যেদিন নীলাদ্রিকে ও খুন করেছে—ভাবল অরি) এরকম ভুল সে আরও একটা করেছে—মানে, আপনার চিঠি সেদিনও সে ভুল করে নীলাদ্রির ঠিকানায় দিয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, সে-চিঠিটা আমরা তন্নতন্ন করেও খুঁজে পাইনি। তা ছাড়া বৃহস্পতিবার রাতে এক ভদ্রলোক কী যেন ব্যাবসার কাজে মিস্টার সেনকে ডাকতে গিয়ে দেখেন দরজা ভেতর থেকে বন্ধ—কোনও সাড়া নেই। পুলিশে খবরটা তিনিই দেন। আমরা গিয়ে যা দেখলাম…।
থামছেন কেন, অফিসার?—অধৈর্য হয়ে মনে-মনে বলল অরি। এ উৎকণ্ঠা আর সহ্য করতে পারছি না আমি, প্লিজ।
…তাতে অবাক হওয়ারই কথা। কারণ, রান্নাঘরের আলো জ্বলছে। বাড়ির খিড়কি দরজা খোলা, এবং গ্যাসের উনুনে মাথা গুঁজে পড়ে আছেন নীলাদ্রি সেন। ব্যাপারটা নিয়ে আমরা খুব একটা মাথা ঘামাতাম না, কিন্তু আপনি বোধহয় জানেন না, মিস্টার সেন কিছুদিন আগেই জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন—তাই ঘরগুলো সার্চ করতে গিয়ে আমরা এই ডায়েরি আর চিচিটা পেলাম। ডায়েরিটায় মিস্টার সেনেরই নাম লেখা, কিন্তু এতে কোথাও তাঁর আত্মহত্যার ইচ্ছের কথা লেখা নেই—যেমন একটা চিঠিতে আমরা সে-ইচ্ছের কথা দেখেছি। তারপর…।
আপনার কি এভাবে না থামলেই চলছে না, অফিসার? প্রচণ্ড বিরক্তিভরে ভাবল অরি। কেন, এখন কি ওর কিছু একটা বলা দরকার? কিন্তু কাঁপা ঠোঁটে স্থির দৃষ্টিতে ও তাকিয়ে রইল অফিসারের মুখের দিকে।
…আমরা ভেবে দেখলাম, ব্যাপারটা একটা অ্যাক্সিডেন্টও হতে পারে। আবার এ-ও হতে পারে, মিস্টার সেন হয়তো কোনও কারণে ডায়েরিতে সে-ইচ্ছের কথা লিখতে ভুলে গেছেন।
তার মানে? আর কী লেখা আছে এই হতচ্ছাড়া ডায়েরিটায়?—ভাবল অরিসেন।
কিন্তু সেসব ছাড়াও আর-একটা ব্যাপারে আমরা যথেষ্ট অবাক হয়েছি। তাই ভাবলাম আপনি হয়তো আমাদের সাহায্য করতে পারেন। আমি ওই গ্যাসের উনুনটার কথা বলছি—মানে, ব্যাপারটা অনেকটা আত্মহত্যার মতোই ঠেকছে আমাদের কাছে…।
আমারও তাই ধারণা।—দৃঢ় স্বরে জবাব দিল অরিসেন।
কিন্তু সেখানেই তো গোলমালটা বাধছে।—অর্থপূর্ণ চোখে হাসলেন অফিসার: মিসটার সেনের টেবিলের ওপরে একবোতল হুইস্কি ছিল—আর একটা কাচের গ্লাস। গ্লাসে মিস্টার সেনেরই হাতের ছাপ পাওয়া গেছে। জানি না, ওই হুইস্কি খাওয়ার জন্যেই…।
তা হলে কি কোনও গন্ডগোল হয়ে গেছে? আসল ব্যাপারটা লোকটা খুলে বলছে না কেন?
যাই হোক, হুইস্কির জন্যেই হোক, বা পাগলামির জন্যেই হোক, মিস্টার সেনের তখন জ্ঞান ছিল না। নইলে কোনও লোক কখনও সব জেনেশুনে গ্যাসের উনুনে মাথা দিতে পারে?
অরিসেনের সপ্রশ্ন দৃষ্টির উত্তর দিতে দেরি করলেন না অফিসার, বললেন, কারণ, ওঁর তো অন্তত জানা উচিত ছিল যে, গত কয়েকদিন ধরে গ্যাসের লাইন খারাপ থাকায় ওঁর উনুনে কোনও গ্যাসই বেরোয় না! যাই হোক, মিস্টার সেন এখনও সে-রাতের ঘটনা আমাদের কিছুই বলতে পারছেন না। একেবারে বেবাক সবকিছু ভুলে বসে আছেন! তাই ভাবছি, ওর মেমারি লস হল কী কারণে?…ও কী মিস্টার রায়, কী হল আপনার…?
অফিসারের চোখের সামনেই চোখ উলটে হুমড়ি খেয়ে পড়ল অরি।
নাড়ি দেখলেন অফিসার। না—এতবড় আঘাতটা অরিসেন আর সামলে উঠতে পারেনি। পুলিশ ঠিকই অনুমান করেছিল, তাই একটা মিথ্যে গল্প ফাঁদতে হল গ্যাসের উনুন নিয়ে। কারণ, কোনও জোরালো প্রমাণ পুলিশের হাতে আসেনি—তাই একটা কনফেশানের দরকার ছিল। কিন্তু মিস্টার রায় যে হঠাৎ হার্টফেল করবেন সেটা অফিসার ভাবতে পারেননি। নাঃ, খুনিদের নার্ভ দেখছি খুব দুর্বল হয়—ভাবলেন তিনি।
অরি জানল না, নীলাদ্রি সত্যি-সত্যিই গ্যাসের উনুনে মাথা দিয়ে সেই রাতেই মারা গেছে!
নষ্ট চাঁদ, কষ্ট চাঁদ
গল্পের নামটা ভালো হল না—তাই না রে? আসলে কবিতা-কবিতা করতে চেয়েছিলাম—কেমন যেন গদ্যের আঁশটে গন্ধ ঢুকে পড়ল। যাকগে। আসলে এটা তো আর গল্প নয়—তোকে লেখা শেষ চিঠি। কিন্তু তুই কি আর চিঠিটা পড়বি—মানে, পড়তে পারবি?
