জেল থেকে বেরিয়ে প্রথমেই ও খুঁজে বের করল প্রাণের বন্ধু অরিসেনকে। শুরু হল এতদিনের ক্রোধ আর ঘৃণার ফল—ব্ল্যাকমেইলিং। রক্তচোষা বাদুড়ের মতো চুষে-চুষে ও অরিসেনকে ক্রমশ ঝাঁঝরা করে তুলেছে। হঠাৎ-উত্তেজনায়-করে-বসা ভুলের মাশুল অরিসেন আজও শোধ করে চলেছে নীলাদ্রির কাছে।
চিন্তার ধোঁয়াটে জল ছিঁড়ে গিয়ে হঠাৎই বাস্তবে ফিরে এল অরি, জিগ্যেস করল, একটু হুইস্কি হবে?
হাসল নীলাদ্রি: তুই আমার বড় মক্কেল। তোকে হুইস্কি খাওয়াব না তো কাকে খাওয়াব?
উঠে গিয়ে একটা বোতল আর দুটো গ্লাস নিয়ে এল নীলাদ্রি। এনে টেবিলের ওপরে রাখল। গ্লাসে হুইস্কি ঢালা শেষ হতেই ওর পিছনের একটা ফটোর দিকে তাকানোর ভান করে চড়া গলায় চেঁচিয়ে উঠল অরি, আরে, মেয়েটাকে যেন চেনা-চেনা মনে হচ্ছে?
ঘাড় ফিরিয়ে পিছনে তাকাল নীলাদ্রি: কে? ও—। ওটা আমার ওয়াইফের ফটো। আমি জেলে থাকার সময়ে মারা গেছে।
আচমকা নীলাদ্রির স্বর ভারী হয়ে এল।
কিন্তু ওই একমুহূর্তের মধ্যেই নিজের কাজ সেরে ফেলেছে অরি। হোমিওপ্যাথি ওষুধের শিশি উপুড় করে ম্যানডেক্স ট্যাবলেটের গুঁড়োটা পুরোটাই নীলাদ্রির গ্লাসে ঢেলে দিয়েছে ও। সুতরাং গ্লাসের হুইস্কিটুকু শেষ করেই ঝিমোতে শুরু করল নীলাদ্রি।
একটু পরেই ও কপাল চেপে ধরে লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে। আর সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করল অরিসেন।
প্রথমেই নীলাদ্রির জামার পকেট ক’টা হাতড়ে নিল…এ কী? নীলাদ্রির পকেটে তারই নাম লেখা একটা চিঠি! কী করে ওর পকেটে এল চিঠিটা? তা হলে কি পিয়ন ভুল করে অরিসেনের চিঠিটা নীলাদ্রির ঘরে দিয়ে গেছে? হতেও পারে। পাশাপাশি বাড়ি তো! (জেল ছাড়ার পর অরির পয়সায় অরিরই বাড়ির পাশে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল নীলাদ্রি—বোধহয় অরিকে চোখে-চোখে রাখার জন্য) একমুহূর্ত দেরি না করে চিঠিটা নিজের পকেটে চালান করল অরিসেন। তারপর নীলাদ্রির জামাকাপড় ঘেঁটে বিপজ্জনক আর কিছু পেল না।
এবার হুইস্কির গ্লাস দুটো তুলে নিয়ে ও গেল রান্নাঘরে। ওগুলো ভালো করে ধুয়ে-মুছে একটা গ্লাস তাকে তুলে দিল। তারপর নিঃশব্দে (কারণ, অরিসেন প্রথম থেকেই ঘরে মোজা পরে চলাফেরা করেছে, যাতে পুলিশ ঘরে ওর কোনওরকম পায়ের ছাপ না পায়) অন্য গ্লাসটা নিয়ে ফিরে এল বসবার ঘরে। গ্লাসটা টেবিলের ওপরে রেখে তাতে কিছুটা হুইস্কি ঢেলে দিল। নির্জীব নীলাদ্রির ডানহাত অতি সন্তর্পণে চেপে আঁকড়ে ধরাল গ্লাসটার ওপরে—যাতে পুলিশ গ্লাসের গায়ে শুধু নীলাদ্রির হাতের ছাপই পায়।
এইবার পকেট থেকে একজোড়া দস্তানা বের করে পরে নিল অরিসেন। তারপর পকেটের সেই বিশেষ চিঠিটা ভাঁজ করে রাখল টেবিলের ওপরে—একপাশে। যাতে সহজেই লোকের নজরে পড়ে।
নীলাদ্রির অজ্ঞান দেহটা একবার পরীক্ষা করল অরি। নাঃ, ওর অনুমান ভুল নয়: নীলাদ্রি এখনও বেঁচে আছে। চটপট ওকে টানতে-টানতে রান্নাঘরে নিয়ে গেল ও। বসবার ঘর থেকে একটা চেয়ার নিয়ে তার ওপর নীলাদ্রিকে বসাল। তারপর চেয়ারটা টেনে নিয়ে গেল গ্যাসের উনুনের কাছে…।
রান্নাঘরের দৃশ্যসজ্জা শেষ হয়ে যেতেই অরিসেন শোওয়ার ঘর আর বসবার ঘর আঁতিপাঁতি করে খুঁজল। নীলাদ্রিকে ওর লেখা ব্যক্তিগত চিঠি থেকে শুরু করে অরিসেন নামাঙ্কিত যে-ক’টা কাগজ পেল সবক’টাই পকেটস্থ করল।
যখন ও নিশ্চিত হল যে, নীলাদ্রির সঙ্গে ওর সম্পর্ক আবিষ্কার করার কোনও নিশানাই ঘরে নেই তখন ও স্বস্তি পেল। পুলিশ যেন নীলাদ্রির সঙ্গে তার সম্পর্কটাকে নিছক প্রতিবেশীর সম্পর্ক বলেই বিচার করে। কারণ, অ্যালিবাইয়ের ব্যাপারটা অরিসেন ঠিক পছন্দ করে না। অপরাধজগতে যদি চরম অনিশ্চিত কোনও ব্যাপার থাকে, তা ওই অ্যালিবাই। অ্যালিবাই জাল করলেও লোকে ধরা পড়ে। আবার সত্যি হলে তখন তার কোনও জুতসই সাক্ষী পাওয়া যায় না।
অরিও তাই করবে। বলবে, ও একা-একা গঙ্গার পাড়ে হাওয়া খাচ্ছিল! শুধু-শুধু একটা অ্যালিবাই তৈরি করতে গিয়ে ও নিজের বিপদ ডেকে আনতে চায় না। প্রতিবেশীর মৃত্যুর তদন্তে পুলিশের লোক হয়তো ওর কাছে আসবে—তারপর জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তবে সে নিছকই তদন্তের খাতিরে ছকবাঁধা প্রশ্নমালা।
সুতরাং, সবকিছু আরও একবার যাচাই করতে রান্নাঘরে ঢুকল অরিসেন। গ্যাসের উনুনের ভালভটা পুরোটা খুলে দিল। একপলক নীলাদ্রির মুখের দিকে চেয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। তারপর নীলাদ্রির বাড়ির দরজা খুলে মিলিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে। যাওয়ার আগে নীলাদ্রির পকেট হাতড়ে পাঁচটাকার বান্ডিলটা তুলে নিতে ভুলল না। এখন শুধু ভোরের অপেক্ষা।
অরির পরিকল্পনামাফিক যদি সবকিছু হয় তা হলে ময়না তদন্তের রিপোর্ট বলবে গ্যাসের উনুনে মাথা দিয়ে আত্মহত্যা করেছে নীলাদ্রি সেন। কারণ ম্যানডেক্সের পরিমাণ মাপমতোই ব্যবহার করেছে অরি—যাতে মানুষ মারা না যায়, অথচ ঘণ্টাকয়েকের জন্য অচেতন হয়ে পড়ে। সুতরাং, অজ্ঞান অবস্থাতেই নীলাদ্রির ফুসফুসে গ্যাসের কাজ শুরু হবে…তারপর…।
তিনদিন পর সন্ধেনাগাদ অরিসেন রায়ের দরজায় হঠাৎই টোকা পড়ল। দরজা খুলতেই অরিসেন এক যুবকের মুখোমুখি হল। অল্প বয়েস, পরনে পুলিশি পোশাক, সজীব চেহারা, কোমরে ঝোলানো আগ্নেয়াস্ত্র।
এরকম পরিস্থিতির জন্য নিজেকে এ ক’দিন ধরে প্রস্তুত করেছে অরি। সুতরাং বিন্দুমাত্রও অবাক না হয়ে ও সাগ্রহে তাকে ভেতরে আহ্বান জানাল, আসুন অফিসার, ভেতরে আসুন—। কী ব্যাপার বলুন তো?
