নীলাদ্রিকে খুন করার যুক্তিসঙ্গত কারণের সংখ্যা ক্রমশ এত বেড়ে যাচ্ছিল যে, অরির পক্ষে আর অপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। গতমাসে নীলাদ্রির একটা গুরুত্বপূর্ণ চিঠি হাতে আসার পরই অরিসেন মনে-মনে ছকে ফেলেছে নীলাদ্রি-নিধনের পরিকল্পনা। চিঠিতে লেখা ছিল:
নিয়তি যখন পরিহাস করছে, তখন তাকে হাসিমুখে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কী? লোকের চিরটা জীবন তো আর সুখে কাটে না! সুতরাং পা হলেও এই পথই বেছে নিলাম।
ইতি—
নীলাদ্রি
নীলাদ্রি অবশ্য টাকার ইঙ্গিত দিয়ে অরিকে কিছুটা ব্যঙ্গ করেছে চিঠিটায়। অর্থাৎ, ওর নিয়তি যখন হাসিমুখে ওকে পরিহাস করছে (নীলাদ্রির মাধ্যমে) তখন সে-পরিহাস মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কী! (সামান্য ক’টা টাকা পাঠানোর তো ব্যাপার)! লোকের (অরিসেনের) চিরটা জীবন তো আর সুখে কাটে না! এখন যেমন নীলাদ্রিকে টাকা দিতে হচ্ছে মাসে-মাসে! সুতরাং পাপ হলেও (ব্ল্যাকমেইল করা নিশ্চয়ই পাপ!) এই পথই বেছে নিলাম (মানে, নীলাদ্রি ব্ল্যাকমেইল করার পথ বেছে নিয়েছে)।
না, চিঠির অর্থ ভুল বোঝেনি অরিসেন। কিন্তু একইসঙ্গে বুঝেছে, এই চিঠিটাই প্রযুক্তিবিদ্যার দক্ষতায় হয়ে দাঁড়াবে নীলাদ্রির মৃত্যুর সরল ব্যাখ্যা। তাই সবেধন নীলমণি করে চিঠিটাকে সযত্নে রেখে দিয়েছিল অরিসেন। আজ সময় হওয়ায় সেটা ও পকেটে করে নিয়ে এসেছে। এই চিঠিটাই হবে নীলাদ্রি সেনের আত্মহত্যার একমাত্র সাক্ষী।
নীলাদ্রির বাড়িতে আজ যখন ও এসে ঢুকল, ওকে দেখে অবাক হলেও নীলাদ্রি বসবার ঘরে সারিকে আদরে আহ্বান জানিয়েছে। অরির অনুরোধে সদর দরজা ভেতর থেকে খিল এঁটে বন্ধ করে দিয়েছে নীলাদ্রিই। তারপর ওর মুখোমুখি বসে জানতে চেয়েছে অরির আসার কারণ।
কী ব্যাপার, হঠাৎ এ সময়ে?
তোর এ-মাসের কিস্তির টাকাটা দিতে এলাম।—বলতে-বলতে পকেট থেকে একগোছা পাঁচটাকার নোট বের করল অরিসেন: কিন্তু একটা কথা বলতে পারিস?
কী কথা?—মুচকি হেসে জানতে চাইল নীলাদ্রি। হাত বাড়িয়ে টাকাটা নিল।
কবে তোর এই লুকোচুরি খেলা বন্ধ হবে?
মানে?
মানে, আর কতদিন এভাবে আমাকে টাকা দিতে হবে?—অরিসেনের স্বর কঠিন হল।
মানুষ ভুল যখন করে, তখন মাশুলের কথা ভাবে না।—একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে রাখল নীলাদ্রি। তাতে আগুন ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছাড়ল: যেমন তোর পঁচিশবছর বয়েসের ভুলের মাশুল তুই আজও শুধে চলেছিস।
ভুল?
ভুলটার কথা আর-একবার মনে পড়ল অরির। তখন ওর বয়েস হয়তো পঁচিশই হবে। ও আর নীলাদ্রি গাড়ি করে যাচ্ছিল রানাঘাটের দিকে। তখন ওর সুখে-দুঃখে বন্ধু বলতে একমাত্র নীলাদ্রি।
রাত প্রায় দশটার সময় নৈহাটির কাছাকাছি ওদের গাড়ির তেল ফুরোল। নির্জন রাস্তায় সাহায্য চাওয়ার মতো কেউ ছিল না। গাড়ি থেকে নেমে এদিক-ওদিক চাইতেই ওদের চোখে পড়ল একজন লোক একটা সুটকেস হাতে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে।
লোকটা কাছে আসতেই ওরা অবাক হল। কারণ, তার চোখে-মুখে আতঙ্কের বিশ্রী ছাপ। ওদের দেখেই, বলল, কাইন্ডলি আমাকে একটা লিফট দেবেন?
লিফট দেওয়ার ব্যাপারে ওরা আপত্তির কিছু দেখেনি। কিন্তু ওদের তেলের দূরবস্থার কথা জানিয়েছিল। লোকটি সে-কথা শুনে অতি উৎসাহী হয়ে সুটকেস রেখে একটা ক্যান নিয়ে তেল আনতে ছুটল।
সে চলে যেতেই স্বাভাবিক কৌতূহলবশে নীলাদ্রি সুটকেসের কাছে এগিয়ে গেল। ওটা তুলতে চেষ্টা করল। তখনই ও বুঝল, সুটকেসটা প্রচণ্ড ভারী।
সুটকেসটা লক করা ছিল। কিন্তু একটু টানাটানি করতেই লকটা খুলে গেল। একমুহূর্তও দেরি না করে সুটকেসের ডালা খুলে ফেলল নীলাদ্রি। সঙ্গে-সঙ্গে চকচকে আলোর ছটায় ওর চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সুটকেসে সুন্দর করে সাজানো অনেকগুলো সোনার বিস্কুট।
তাড়াতাড়ি ডালাটা আবার কোনওরকমে আটকে দিয়েছিল ওরা।
লোকটা ফিরে এসে সুটকেস খোলার ব্যাপারটা মোটেই বুঝতে পারল না। সুতরাং তেল ভরে গাড়ি যখন নতুন করে রওনা হল, তখন ওদের দুজনের মাথাতেই ঘুরছে একই চিন্তা— ভাগ্য ফেরানোর এমন সুযোগ ওরা বোধহয় আর পাবে না।
অতএব পায়রাডাঙ্গায় লোকটি যখন নামবে বলল, তখন নীলাদ্রি ও অরিসেন মনে-মনে একই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। মুহূর্তের মধ্যে ওরা হিংস্র নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই স্মাগলারের ওপরে। মিনিটকয়েক পর যখন ধস্তাধস্তি থামল তখন বুঝল লোকটাকে ওরা খুন করে ফেলেছে। সুতরাং, তার মৃতদেহটা রাস্তার ধারে আগাছার জঙ্গলে ফেলে দিয়ে সুটকেস নিয়ে ওরা উধাও হল।
এ-ঘটনার মাসদুয়েক পরে নীলাদ্রি ধরা পড়ল পুলিশের হাতে। কীভাবে ওর হাতের আংটি অকুস্থলে খুলে পড়েছিল ও বুঝতে পারেনি। যেহেতু সোনা-ভরা সুটকেসটা ওকে বাঁচাতে হবে তাই খুনের দায় ও একা নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিল। বিচারে ওর সাজা হল বারোবছর সশ্রম কারাদণ্ড। সাময়িক উত্তেজনাবশে খুনটি ঘটে যাওয়ায় মৃত্যুদণ্ড থেকে ও রেহাই পেয়েছিল। কিন্তু চোরাই সোনার কথা পুলিশ জানতে পারেনি। সেগুলো লুকোনো ছিল অরিসেনের কাছে।
এরপর দিন-মাস-বছর ঘুরতে সময় লাগেনি। ধীরে-ধীরে অরিসেনের অবস্থা গ্যাসভরা বেলুনের মতো ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। ওদিকে জেলে বসে হাত কামড়েছে নীলাদ্রি। সোনার ব্যাপারটা ও না পেরেছে গিলতে, না পেরেছে ওগরাতে।
এইভাবে বছরদশেক কেটে যাওয়ার পর একদিন ছাড়া পেল নীলাদ্রি।
