রাতে ঠিক দশটায় ওর ঘরের দরজায় চাবি ঘোরানোর শব্দ পেল কমলেশ। সঙ্গে-সঙ্গে ও থরথর করে কেঁপে উঠল। এই কি তা হলে কৃতান্তের নিমন্ত্রণ?
দরজা খুলে ঢুকল ওরা দুজন। মুখোশের আড়ালে কি চোখে পড়ছে একটুকরো বাঁকা হাসি? কে জানে।
‘অমিতাভ—অমিতাভ—’ কমলেশের গলা বন্ধ হয়ে এল। লম্বা লোকটা পকেটে হাত ঢোকাল। মুহূর্তের মধ্যে কমলেশের মনে পড়ল ওর সুন্দরী স্ত্রীর কথা—অমিতাভর কথা—এই সবুজ পৃথিবীর কথা—।
লোকটা পকেট থেকে কাপড়ের পটিটা বের করল। তা হলে অমিতাভ টাকা দিয়েছে! আনন্দে কমলেশের কাঁদতে ইচ্ছে করল।
ওর চোখ বাঁধা হয়ে গেলে লম্বা লোকটা বলল, ‘তোমার কপাল ভালো। তোমার দোস্ত টাকাটা দিয়ে দিয়েছে। কোনও ছকবাজির চেষ্টা করেনি। তোমাকে ছেড়ে দেওয়ার পর তুমি আবার পুলিশের দালালি কোরো না যেন—।’
তারপর আবার সেই চলন্ত কালো ডেমলার। গাড়ির পিছনের সিটে শুয়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় ভাবতে লাগল কমলেশ। ওরা কি সত্যিই ছেড়ে দেবে ওকে? নাকি—।
যখন একটা ফাঁকা অন্ধকার মাঠে ওরা কমলেশকে ধাক্কা দিয়ে গাড়ি থেকে ফেলে দিল, তখন ও নড়ার চেষ্টা করেনি। মড়ার মতো নিশ্চল হয়ে একটা বুলেটের অপেক্ষা করেছে।
কিন্তু ওরা কিছু না করে স্রেফ গাড়ি নিয়ে চলে গেল।
অন্ধকারে বেশ কষ্ট করে হাতঘড়ি দেখল কমলেশ। রাত বারোটা।
টলতে-টলতে ও উঠে দাঁড়াল। চোখে পড়ল, বহু দূরে কয়েকটা আলোর বিন্দু। ক্লান্ত পায়ে ও সেদিকে হাঁটতে শুরু করল। অমিতাভকে ফোন করে খবর দিতে হবে। তারপর চলবে পুলিশের কাছে জবাবদিহির পালা।
রাত দুটোর সময় পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের হাত থেকে রেহাই পেল কমলেশ।
থানা থেকে বেরোতেই দেখল দরজায় দাঁড়িয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করছে অমিতাভ। ওকে দেখেই হাসল, ‘তোকে তা হলে ছাড়ল। ওঃ, আমাকেও কি কম হ্যারাস করেছে। এখন বাড়ি যাবি তো?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু আর চলতে পারছি না, ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।’ অবসন্ন স্বরে জবাব দিল কমলেশ।
‘তা হলে আমার বাড়িতেই চল। ওখান থেকে তোর বাড়িতে একটা ফোন করে দিবি যে, তুই কাল সকালে বাড়ি ফিরবি, তা হলেই হবে।’
অমিতাভর কথায় রাজি হয়ে ওর গাড়িতে গিয়ে উঠল কমলেশ।
কিছুক্ষণ পরেই অমিতাভর বাড়ির দরজায় ওদের গাড়ি এসে থামল। কমলেশ গাড়িতে বসে ঝিমোচ্ছিল, অমিতাভর ধাক্কায় সংবিৎ ফিরে পেয়ে গাড়ি থেকে নামল।
বসবার ঘরে দুজনে আরাম করে সোফায় বসে কথা বলছিল। হঠাৎই অমিতাভ বলল, ‘কীরে, একটু ”ইয়ে” চলবে নাকি? তা হলে এই ম্যাজম্যাজে ভাবটা কেটে যেত।’
কমলেশ আপত্তি করল না।
অমিতাভ পাশের ঘরে গেল গেলাস আনতে। কমলেশ এদিক-সেদিক তাকাতে লাগল। চোদ্দো ফুট বাই বারো ফুট বসবার ঘর। প্রচুর টাকা খরচ করে এটাকে মনের মতো করে সাজিয়েছে অমিতাভ। একা মানুষ, বেশ সুখেই আছে।
এসব কথা ভাবতে-ভাবতে তন্ময় হয়ে পড়েছিল কমলেশ। দেওয়াল-ঘড়ির ঢং-ঢং শব্দে ওর চমক ভাঙল। রাত আড়াইটা বাজে। ঠিক তখুনি দুটো ভরতি গেলাস নিয়ে ফিরে এল অমিতাভ। সোফায় বসে সামনের টেবিলের ওপরে গেলাস দুটো নামিয়ে রাখল: ‘নে, শুরু কর।’
একটা গেলাস হাত বাড়িয়ে তুলে নিল কমলেশ।
অমিতাভ ওর গেলাসে ছোট্ট একটা চুমুক দিয়ে গেলাসটা টেবিলে রাখল, বলল, ‘তোর কী মনে হয়? পুলিশ কি ওই লোকদুটোর কোনও হদিস পাবে?’
কমলেশ একটু অন্যমনস্ক ছিল। অমিতাভর কথায় ওর দিকে ফিরে তাকাল। বেঁটেখাটো অমিতাভ রায় তখন ডানহাত দিয়ে নিজের বাঁ-হাতের নখ খুঁটছে।
কমলেশ অবাক হল। এক-দু-সেকেন্ড অপেক্ষা করার পর হাসল ‘তুই কি সত্যি জানতে চাস?’
‘তার মানে?’ অবাক হল অমিতাভ।
এমন সময় কমলেশের কানে এল দূর থেকে ভেসে আসা কোনও কুকুরের চিৎকার। যে-চিৎকার ও বন্দি অবস্থায় প্রতিদিন রাত দুটো বত্রিশে শুনে এসেছে।
নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল কমলেশ। ঠিক ২-৩২ মিনিট।
‘তুই কি সত্যি-সত্যি জানতে চাস?’ আবার একই প্রশ্ন করল কমলেশ।
‘হ্যাঁ, চাই।’ অমিতাভ অবাক হয়ে জবাব দিল।
‘তা হলে তোকে আর মাত্র পনেরো সেকেন্ড ওয়েট করতে হবে।’ বলতে-বলতে হুইস্কির গেলাস হাতে উঠে দাঁড়াল কমলেশ। একদৃষ্টে হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে এরোপ্লেনের শব্দটার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
ওর হাতঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটা ঘুরে চলল। কমলেশ দেখতে লাগল—একসেকেন্ড—দু-সেকেন্ড—তিনসেকেন্ড—চারসেকেন্ড—পাঁচসেকেন্ড—ছ’-সেকেন্ড—টিক—টিক—টিক—টিক—টিক—।
দৈবের বশে
একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল অরিসেন। ঘাড় ফিরিয়ে আর-একবার দেখল নীলাদ্রির দিকে। পরম নিশ্চিন্তে নীলাদ্রির দু-চোখ বোজা। মাথাটা যত্ন করে বসানো গ্যাসের উনুনের ওপরে। যেন আসন্ন কোনও বিশেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছে নীলাদ্রি সেন।
রান্নাঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে নীলাদ্রির চেয়ারের কাছে ঝুঁকে এল অরি। চেয়ারটাকে ঠেলে উনুনের আরও কাছে এগিয়ে দিল। নাঃ, দৃশ্যটা এখন বেশ স্বাভাবিক-স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। কিন্তু অরির হাতে এখন প্রচুর কাজ। প্রথমত, কাজগুলো সম্পূর্ণ নিখুঁত হওয়া চাই। এবং দ্বিতীয়ত, অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ওকে কাজ করতে হবে। নিখুঁত খুনের গোটাকয়েক কাহিনি ও পত্র-পত্রিকায় পড়েছে। তাতে খুনটাকে দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টাটাই বেশি। কিন্তু একটা স্বাভাবিক-সহজ-ধারালো পথকে সকলেই এড়িয়ে গেছে। তা হল, মৃত ব্যক্তির সঙ্গে খুনির যে কোনও সম্পর্ক নেই, সেটাকে সামনে তুলে ধরা। অর্থাৎ, নীলাদ্রি সেন নামে কোনও লোককে যে জনৈক অরিসেন রায় কোনওদিন চিনত সেটাই পুলিশ প্রমাণ করতে পারবে না। উপরন্তু আত্মহত্যার দৃশ্যসজ্জা তো আছেই!
