ফোন করা শেষ হলে লম্বা লোকটি কমলেশকে আবার সেই ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে এল। তারপর ওর চোখ থেকে কাপড়ের পটিটা খুলে নিল। কমলেশ আশা-নিরাশার দোলায় দুলতে-দুলতে খাটে গিয়ে বসল। এখন ওর শেষ ভরসা অমিতাভ রায়।
রাত প্রায় দশটার সময় লম্বা লোকটির সঙ্গী বেঁটেটা কমলেশের খাবার নিয়ে এল। সম্ভবত রাত্তিরে এই লোকটাই দরজার বাইরে পাহারা দেবে।
খেতে-খেতে কমলেশ হঠাৎ প্রশ্ন করল, ‘অমিতাভ রায়ের কাছ থেকে কোনও খবর পেয়েছেন?’
বেঁটে লোকটা মাথা নাড়ল। অধৈর্যভাবে কমলেশের খাওয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগল। কমলেশ লক্ষ করল, লোকটা অন্যমনস্কভাবে ডানহাত দিয়ে ওঁর বাঁ-হাতের নখ খুঁটছে। মুদ্রাদোষ? আপনমনেই হাসল কমলেশ।
পরদিন সকালে মুখোশপরা লম্বা লোকটা আবার কমলেশের ঘরে এল। হাতের ট্রে-টা টেবিলে নামিয়ে রেখে বলল, ‘খেয়ে নাও।’
কমলেশ একটুকরো পাঁউরুটি নিয়ে দাঁত বসাল। নাঃ, খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে লোকদুটো খুব একটা অভদ্র নয় দেখছি। খেতে-খেতে হঠাৎই ওর মনে পড়ল অমিতাভর কথা। সঙ্গে-সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে ও জিগ্যেস করল, ‘অমিতাভ কি টাকার ব্যবস্থা করেছে?’
‘উঁহু,’ জবাব দিল লম্বা মুখোশধারী, ‘তোমার ওই হারামজাদা উকিল এখনও গাঁইগুঁই করছে। আজ তুমি ওকে ফোন করবে। যদি পরিষ্কার করে ওই দু-লাখ টাকার ব্যাপারটা বোঝাতে পারো তো ভালো, নয়তো বউকে চিঠি লিখে খাটিয়া কেনার ব্যবস্থা করতে বলো।’
কমলেশ এক অজানা আতঙ্কে শিউরে উঠল। না, না—যে করে হোক অমিতাভকে ও রাজি করাবেই।
খাওয়া শেষ হতে লোকটি পকেট থেকে কাপড়ের পটি বের করে কমলেশের চোখ বেঁধে দিল। তারপর আগের দিনের মতোই ওকে নিয়ে চলল টেলিফোনের কাছে।
কমলেশ অমিতাভর ফোন নম্বর বলার পর লোকটা ডায়াল করে কমলেশের হাতে রিসিভার তুলে দিল, ‘নাও, এবার তোমার পেয়ারের দোস্তকে ভালো করে বোঝাও।’
রিসিভারটা সজোরে আঁকড়ে ধরে কানে চেপে ধরল কমলেশ। উত্তেজিত চাপা স্বরে প্রশ্ন করল, ‘কে?’
‘কমলেশ নাকি? আমি রায় বলছি। কী, ব্যাপার কী তোর?’
‘আমার চিঠি পেয়েছিস?’ ঠান্ডা গলায় জানতে চাইল কমলেশ।
‘হ্যাঁ, কিন্তু অত টাকা এই ক’দিনে কী করে যে জোগাড় করব বুঝে উঠতে পারছি না।’
‘দরকার হলে আমার সমস্ত প্রপার্টি বেচে দে। দিয়ে যে করে হোক দু-লাখ টাকা আমার চাই। যদি দিন-দুয়েকের মধ্যে জোগাড় করতে পারিস তো ভালো। আর সেটা না পারলে তোকে আর টাকা জোগাড় করতে হবে না। আমার শ্রাদ্ধে টাকাটা খরচা করিস।’ অমিতাভকে জবাব দেওয়ার কোনও সময় না দিয়েই ঠকাস করে রিসিভার নামিয়ে রাখল কমলেশ। ওর কপালে ফুটে উঠেছে বিন্দু-বিন্দু ঘাম।
লম্বা লোকটি ওকে আবার ঘরে ফিরিয়ে এনে চোখের বাঁধন খুলে দিল। যাওয়ার আগে বলে গেল, ‘আর মাত্র তিনদিন আমরা ওয়েট করব।’
সেদিন রাতে কমলেশের ঘুম এল না। হাজার চিন্তা যেন ওর মাথায় ছুঁচের মতো বিঁধছে। হঠাৎ ওর কানে এল দূর থেকে ভেসে আসা কোনও কুকুরের চিৎকার। আর ঠিক তার পনেরো সেকেন্ড পরেই ও শুনতে পেল এরোপ্লেনের গর্জন।
গত কয়েকদিন ধরেই ২-৩২ মিনিটের সময় একটা কুকুরের চিৎকার আর তার পনেরো সেকেন্ড পরেই একটা প্লেনের শব্দ শুনতে পাচ্ছে কমলেশ। বাইরের জগৎ থেকে ওকে যে এভাবে আলাদা করে রাখা হয়েছে তা কি কেউ জানে? এখন অমিতাভ যদি টাকাটা জোগাড় না করতে পারে—।
ভাবতে-ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল কমলেশ।
কারও ধাক্কায় কমলেশের ঘুম ভাঙল। ধড়মড়িয়ে খাটে উঠে বসল ও। দেখল, ওর সামনে দাঁড়িয়ে দুই মুখোশধারী।
কমলেশ হঠাৎ ভীষণ ভয় পেল। তা হলে কি ওর জীবনের লাস্ট চ্যাপ্টার কাছে এসে গেছে?
লম্বা লোকটি পকেট থেকে অটোমেটিক কোল্টটা বের করে কমলেশের কপালে ঠেকাল।
কমলেশ চোখ বুজল। ওর কান যে-কোনও মুহূর্তে আশা করতে লাগল একটা বিরাট গর্জন। ওর মস্তিষ্ক এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের অপেক্ষায় রইল।
কিন্তু না, সেরকম কিছুই ঘটল না। তার বদলে কর্কশস্বরে কথা বলে উঠল লোকটা, ‘এই যে, এখন আমরা অমিতাভ রায়কে ফোন লাগাচ্ছি—আর ওয়েট করতে পারছি না। তুমি এখানে বসে-বসে এক-দুই গুনতে থাকো। আমরা ঘণ্টাখানেক পরেই ফিরব।’
কমলেশ যখন চোখ খুলল তখন ওরা দুজনেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। কমলেশের শুধু মনে হতে লাগল, একঘণ্টা—একঘণ্টা—আর মাত্র একঘণ্টা—!
কতক্ষণ যে ওইরকম আচ্ছন্নভাবে ও বসেছিল, মনে নেই। দরজা খোলার শব্দে ওর চমক ভাঙল। লম্বু এবং বেঁটে ঘরে ঢুকল।
ঈশ্বরকে মনে-মনে ধন্যবাদ দিল কমলেশ, কারণ, ওরা এখনও মুখোশ পরে রয়েছে।
‘অমিতাভ কি টাকাটা জোগাড় করতে পেরেছে?’ কৌতূহলে জানতে চাইল কমলেশ।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর লম্বা লোকটা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, জোগাড় তো করেছে বলছে। কিন্তু সত্যি কি মিথ্যে সেটা জানতে পারব রাত আটটায়। সন্ধে সাতটায় ফোন করে টাকাটা নিয়ে কোথায় দেখা করবে তার আইডিয়া রায়সাহেবকে দেব। তারপর আটটার সময় টাকাটা পেয়ে গেলেই ভালো। আর যদি দেখি লোকটা পুলিশে খবর দিয়েছে, অথবা প্যাঁচ খেলার চেষ্টা করছে, তবে তোমাকে প্যাক করে পার্সেল করে দিল্লিতে তোমার বউয়ের কাছে পাঠিয়ে দেব।’
বেঁটে লোকটা অন্যমনস্কভাবে ডানহাত দিয়ে ওর বাঁ-হাতের নখ খুঁটছিল, হঠাৎ বলে উঠল, ‘টাকা পেয়ে গেলে তোমাকে রাত দশটায় ছেড়ে দেওয়া হবে।’
