এরপর কমলেশের শ্রুতলিপি লেখা যখন শেষ হয়েছে তখন দোহারা চেহারার লোকটি সেটা ওর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পড়েছে—
প্রিয় অমিতাভ,
যে করে হোক দু-লাখ টাকা আমার চাই। দেখিস, পঞ্চাশটাকার নোটের চেয়ে বড় নোট যেন না থাকে। টাকাটা জোগাড় করার পর কী করতে হবে সেটা পরে জানাব। পুলিশে যোগাযোগ করার কোনও চেষ্টা করিস না। তা যদি করিস, তবে আমাকে আর জীবিত অবস্থায় দেখতে পাবি না।
ইতি—কমলেশ (সেন)
পুনশ্চ—ভীষণ বিপদে পড়ে তোকে এ চিঠি লিখলাম। তোর ওপর আমার বাঁচা-মরা নির্ভর করছে।—ক
চিঠিটা পড়ার পর সন্তুষ্ট হয়ে দুজনেই ঘাড় নেড়েছে। তারপর কমলেশকে ঘরে একা রেখে ওরা চলে গেছে। যাওয়ার আগে ঘরের একমাত্র দরজায় তালা দিয়ে গেছে।
কমলেশ আবার খাটে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগল নিজের জটিল অবস্থার কথা।
টাকাটা পেয়ে গেলে ওরা কি কমলেশকে খুন করবে? কিন্তু তাই যদি ওদের ইচ্ছে হয় তা হলে মুখোশ-টুখোস পরে পরিচয় গোপনের এত চেষ্টা কেন? হঠাৎ নিষ্ঠুর বাস্তবের মতোই কমলেশ বুঝতে পারল, যতক্ষণ ওরা মুখোশ পরে থাকবে, ততক্ষণই কোনও ভয় নেই। কমলেশ পরে ওদের আর চিনতে পারবে না।
হঠাৎ দরজায় চাবি ঘোরানোর শব্দে কমলেশ চমকে খাটের ওপর উঠে বসল। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সকাল আটটা পঁচিশ। তার মানে শেষদিকে ও ঘুমিয়ে পড়েছিল? রুদ্ধশ্বাসে ও খুলে যাওয়া দরজাটাকে লক্ষ করতে লাগল—নতুন কোনও বিপদের অপেক্ষা করতে লাগল।
পরক্ষণেই দরজা খুলে ঘরে ঢুকল প্রকাণ্ড চেহারার লোকটি। আশার কথা বলতে হবে, তার মুখে এখনও মুখোশটা রয়েছে। তার হাতে একটা খাবারের ট্রে। সেটা টেবিলের ওপরে নামিয়ে রেখে সে বলল, ‘তোমার ব্রেকফাস্ট।’
কমলেশের খাওয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত লোকটি অপেক্ষা করল। তারপর পকেট থেকে একটা চওড়া মোটা কাপড়ের টুকরো বের করে কমলেশের চোখ বাঁধতে শুরু করল ‘তুমি এখন তোমার অফিসে ফোন করবে। ফোন করে তোমার সেক্রেটারিকে বলবে যে, একটা উইক তুমি অফিসে যাচ্ছ না…ওই ক’দিন কোথাও বেড়াতে যাচ্ছ…।’
কথা শেষ করে লোকটি কমলেশকে ঠেলে নিয়ে চলল। কমলেশ আন্দাজে বুঝল, ওর কয়েদখানায় দরজার ঠিক বাইরে কোনও এক জায়গায় ওরা এসে দাঁড়িয়েছে।
‘তোমার ফোন নম্বর কত?’ লোকটি প্রশ্ন করল।
কমলেশ ফোন নম্বর বলার পর টেলিফোনের ডায়াল ঘোরানোর শব্দ পেল। একটু পরেই টেলিফোনের রিসিভারটা ওর হাতে কেউ জোর করে ধরিয়ে দিল।
ও-প্রান্ত থেকে ওর সেক্রেটারি মলিনা চৌধুরীর গলা ভেসে এল, ‘হ্যালো?’
সাততাড়াতাড়ি জবাব দিল কমলেশ, ‘কে, মলিনা? আমি কমলেশ বলছি। শোনো, এই উইকটা আমি বোধহয় অফিসে যেতে পারব না। ভাবছি, এ ক’দিন ছুটি নিয়ে একটু বেড়িয়ে আসব।’
‘কিন্তু স্যার, যদি খুব দরকার পড়ে, তবে কোথায় আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব?’
‘সেসব ঝামেলা করার কোনও দরকার নেই, মলিনা। আমার সব অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক্যান্সেল করে দাও। আর, আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত সমস্ত চিঠিপত্র আমার ড্রয়ারে রেখে দিয়ো, কেমন?’
‘ঠিক আছে, স্যার।’
অপেক্ষাকৃত বেঁটে লোকটি কমলেশের হাত থেকে রিসিভারটা ছিনিয়ে নিয়ে নামিয়ে রাখল। তারপর কমলেশকে লক্ষ করে বলল, ‘তোমার আর কাউকে ফোন করার থাকলে করতে পারো। ভালো করে ভেবে দ্যাখো। নয়তো কেউ যদি তোমার ব্যাপারে বেশি ইন্টারেস্ট নিয়ে পুলিশে খবর দেয়, তবে তোমাকে খালাস করে দেব।’ লোকটা নৃশংসভাবে টেনে-টেনে হাসল।
একমিনিট ভেবেই মনস্থির করল কমলেশ, বলল, ‘আমার বাড়িতে একটা ফোন করা দরকার।’ ও ফোন নম্বর বলার সঙ্গে-সঙ্গে লম্বা মুখোশধারী লোকটি ডায়াল করতে শুরু করল। একটু পরেই সে রিসিভারটা তুলে দিল কমলেশের হাতে।
কমলেশের কানে এল ওর শ্যালক অবিনাশ দত্তর গলা, ‘হ্যালো—।’
‘অবিনাশ নাকি—?’
‘কে, কমলেশদা? কী ব্যাপার? কাল রাত থেকে—।’
‘শোনো অবিনাশ, আমার ফিরতে হয়তো দিনসাতেক দেরি হবে।’
‘তার মানে? আপনি কোত্থেকে কথা বলছেন, কমলেশদা? আজ সকালেও যখন আপনি ফিরলেন না, তখন ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলাম। শেষে দাশুকে খোঁজ করতে পাঠালাম। খোঁজাখুঁজি সেরে ও ফিরে এসে বলল, গাড়িটা নাকি গ্যারেজেই রয়েছে। মানে, কাল আপনি বাড়ি ফিরেছিলেন। কিন্তু তারপর আবার যে কখন বেরোলেন সেটাই বুঝে উঠতে পারছি না।’
‘হ্যাঁ, আজ খুব সকালে আমি আবার বেরিয়ে পড়েছি। আমার এক বন্ধু ওর গাড়ি করে আমার বাড়ির কাছ থেকে আমাকে তুলে নেয়। তাই তাড়াতাড়িতে বলে যেতে পারিনি।’ কমলেশ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কে জানে, অবিনাশের সঙ্গে আর কোনওদিন দেখা হবে কি না।
‘এই সাতদিন কী করবেন? কোনও জরুরি কাজ, না অন্য—?’
‘না, কোনও কাজ-টাজ নয়। এই একটু বেড়াব-টেরাব ঠিক করেছি।’
‘কিন্তু কাল সন্ধের সময় দিল্লি থেকে দিদির একটা চিঠি এসেছে। আপনি বোধহয় চিঠিটা পাননি?’
‘না, পাইনি। তুমি বরং চিঠিটা রেখে দিয়ো, আমি ফিরে এসে দেখব’খন?’
‘তার কী দরকার? যাওয়ার আগে বাড়িতে নেমে চিঠিটা নিয়ে গেলেই তো পারেন—?’
‘না, তা সম্ভব নয়।’
ও-প্রান্তে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর আবার অবিনাশের গলা ভেসে এল, ‘তা হলে আপনার অ্যাড্রেসটা বলুন, আমি চিঠিটা পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
‘উহুঁ, আমি এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ব। তা ছাড়া পজিটিভ কোনও অ্যাড্রেস দেওয়া অসম্ভব। আমি দিনসাতেক পর ফিরলে চিঠিটা দিয়ো। কেউ যদি আমার কথা জিগ্যেস করে তা হলে বোলো, আমি ছুটি নিয়ে সপ্তাহখানেকের জন্য বেড়াতে গেছি।’
