বিশ্বনাথের খুশি-খুশি ভাব দেখে রেণুকথা খুশি হন। নিশ্চিত হন।
ঘ্রাণশক্তিও কি খানিকটা বেড়ে গেছে বিশ্বনাথের? পারমিতার ঠিকে কাজের লোক যখন রান্নাঘরে রান্না করে তখন ঘরে বসেও সে-রান্নার গন্ধ তিনি পান কেমন করে? ভিক্টরের গন্ধও বা মাঝে-মাঝে নাকে আসে কেন?
আগে তো এমন আসত না!
নতুন এই ক্ষমতাগুলোকে বিশ্বনাথ উপভোগ করছিলেন আর বত্রিশ দিন শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ডক্টর মালাকারের রুটিন চেক-আপ চলছিল। প্রতিটি চেক-আপের পর তিনি দিলখোলা ঢঙে হেসে বলেন, ‘ইউ আর হিলিং আপ একসিলেন্টলি। আই অ্যাম রিয়েলি সারপ্রাইজড।’
ডক্টর মালাকার একদিন বললেন, ‘আপনার হিলিং আপ প্রসেস শেষ হয়ে গেলে আমাকে মোবাইলে মাঝে-মাঝে ফোন করবেন। আমি আপনাকে প্রথম ক্লায়েন্ট দেব। আর ভি-স্টিং এর প্রসেসটাও ভালো করে বুঝিয়ে দেব। ও. কে.?
বিশ্বনাথ বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নেড়ে, ‘এস এ কে’ থেকে বেরিয়ে এসেছেন।
কিন্তু বিশ্বনাথের দাঁত নিয়ে কৌতূহল ছিল। রোজ সকালে ওয়াশ বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত মাজার সময় শ্বদন্ত দুটোকে পরখ করেন। দেখেন তার ওপরের মাড়ির অবস্থাটা। চোয়াল নাড়িয়ে দাঁতে-দাঁতে আলতো করে ঠোকাঠুকি করেন। না, তেমন ব্যথা আর নেই।
শুধু এতেই থামেননি বিশ্বনাথ। লুকিয়ে-লুকিয়ে কামড় দিয়েছেন বিছানার তোশকে। সেটা সে শুধু দাঁতের জোর পরীক্ষার জন্য তা নয়। দাঁত কেমন যেন সুড়সুড় করছিল কামড় দেওয়ার জন্য—কুকুরছানাদের যেমন করে।
অস্বীকার করে লাভ নেই, তোশকে কামড় দিয়ে একটু যেন তৃপ্তিও পেয়েছেন। যদিও জিভে তোশকের স্বাদটা মোটেই ভালো ঠেকেনি।
সেরে ওঠার বেশ কিছুদিন পর প্রথম ক্লায়েন্টের ডাক পেলেন বিশ্বনাথ। ডক্টর মালাকার বিশ্বনাথকে যোগাযোগ করিয়ে দিলেন ‘এস এ কে’-র স্পেশাল সেল’-এ। ওরাই ক্লায়েন্টদের ফাইল মেনটেইন করে।
স্পেশাল সেল-এর কাছ থেকে খোঁজখবর নিয়ে ক্লায়েন্টের ঠিকানায় পৌঁছে গেলেন।
শশিভূষণ দে স্ট্রিটের একটা অন্ধকার বাঁকে দাঁড়িয়ে একটা পুরোনো তিনতলা বাড়ি। বাড়ির একতলায় একটি মলিন মিষ্টির দোকান। তার রং-চটা সাইনবোর্ডে কী লেখা আছে একমাত্র ভগবানই জানেন। দোকানের ময়লা শো-কেসের বেশিরভাগটাই খালি। যে-ক’টা মিষ্টি চোখে পড়ছে সেগুলো মনে হয় বেশ পুরোনো। দোকানের দেওয়ালে ঝুল-কালির ছোপ। একটি নাদুসনুদুস লোক খালি গায়ে শো-কেসের পিছনে বসে আছে।
এই মিষ্টির দোকানটাই বিশ্বনাথের ল্যান্ডমার্ক। এই দোকানেই ক্লায়েন্ট ব্রতীন সরকারের খোঁজ করতে হবে।
খোঁজ করলেন বিশ্বনাথ। তারপর দোকানের পাশের ছোট্ট একটা দরজা দিয়ে বাড়িটার ভেতরে ঢুকে পড়লেন।
সিঁড়িতে ওঠার আগে বাঁ-দিকে একটা তালিমারা কাঠের দরজা। তাতে নতুন রং করা হয়েছে। দরজার পাল্লায় একচিলতে কম্পিউটার প্রিন্টআউট আঠা দিয়ে সাঁটা। তাতে ব্রতীন সরকার নামটা ছাপা রয়েছে।
দরজায় টোকা মারলেন বিশ্বনাথ। একইসঙ্গে স্পেশাল সেল-এর নির্দেশ মনে পড়ল: ‘ভি-স্ট্রিং-এর কাজটা সারতে আড়াই মিনিট মতো লাগে। কোনও অবস্থাতেই ক্লায়েন্টের সঙ্গে পাঁচমিনিটের বেশি কাটাবেন না। মনে রাখবেন, যে-সার্ভিসটা আমরা ক্লায়েন্টদের প্রোভাইড করছি সেটা অ্যাবসোলিউটলি ইল্লিগাল। সিক্রেট পুলিশ কিংবা সিকিওরিটি কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্টের হাত থেকে আপনাকে বাঁচতে হবে। আপনি যে-কাজে যাচ্ছেন সেটা একটা কাজ। এখানে পারসোনাল রিলেশানের কোনও জায়গা নেই।’
দরজা খুলে গেল।
দরজায় দাঁড়িয়ে পঁচিশ-ছাব্বিশের ছিপছিপে এক ফরসা যুবক। মাথার চুল কদমছাঁট। দু-গালে কুণ্ডলী পাকানো সাপের উল্কি। বাঁ ভুরুর শেষে একটা ছোট আংটি।
ব্রতীনের চোখ ঢুলুঢুলু। তবে সেটা নেশার জন্য নাও হতে পারে। কারণ, বিশ্বনাথ কোনওরকম গন্ধ পেলেন না।
ওর গায়ে লাল স্যান্ডো গেঞ্জি, আর পরনে সাদা থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট—যাকে সবাই থ্রি-কিউ বলে।
‘কী চাই?’ ভারী গলায় প্রশ্ন করল ব্রতীন।
স্পেশাল সেল-এর বলে দেওয়া কোড নম্বরটা বললেন বিশ্বনাথ।
ঠোঁটে হাসল ব্রতীন। ওর চোখের মণি প্রত্যাশায় উজ্জ্বল হল। ঘষা নার্ভাস গলায় বলল, ‘আসুন, ভেতরে আসুন—।’
পাশের কোনও ঘর থেকে কড়াইয়ে ফোড়ন দেওয়ার ‘ছ্যাঁক’ শব্দ পেলেন বিশ্বনাথ। ওঁর বুকের ভেতরটাও কেমন যেন ‘ছ্যাঁক’ করে উঠল। সামনেই প্রথম পরীক্ষা। বিশ্বনাথ ঠিকঠাক পারবেন তো?
রান্নার গন্ধ নাকে গিয়ে ব্রতীনের ঘরে ঢুকলেন।
ছোট্ট অগোছালো ঘর। চারপাশে কড়া সিগারেটের গন্ধ। রঙিন জামা-প্যান্ট এখানে-সেখানে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। একটা ছোট্ট টেবিল বইপত্রে পাহাড় হয়ে রয়েছে। খাট বিছানা প্রায় লন্ডভন্ড। তার ওপরে সিগারেটের প্যাকেট, লাইটার, তিনটে রঙিন সলিউবল প্লাস্টিকের প্যাকেট আর বেশ কয়েকটা একশো টাকার নোট এলোমেলোভাবে পড়ে রয়েছে। একদিকের দেওয়ালে দড়িতে একরাশ জামাকাপড় ঝুলছে। তার পাশেই মাঝারি মাপের একটা শৌখিন আয়না।
ব্রতীন ঘরের মাঝখানে বোকার মতো দাঁড়িয়েছিল। বোধহয় ওরও এটা প্রথমবার।
বিশ্বনাথ কাঁপা হাতে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে খিল এঁটে দিলেন। তারপর ব্রতীনের দিকে হাত বাড়ালেন: ‘টাকাটা?’
বাইটের ফি-টা আগে চেয়ে নেওয়াটাও নিয়মের মধ্যেই পড়ে। স্পেশাল সেল থেকে এটা বিশ্বনাথকে বারবার করে বলে দেওয়া হয়েছে।
