‘মোট কথা, মিস্টার বোস, আপনি এখন ”এস এ সি”-র টপ সিক্রেট জোনে ঢুকে পড়েছেন। এবার আপনাকে এগ্রিমেন্ট ফর্ম আর বন্ড সই করতে হবে। তারপর আপনার রুটিন মেডিকেল চেক-আপ করা হবে। এই ইসিজি, ইইজি, ব্লাডপ্রেশার, ইউএসজি এইসব আর কী!
‘এবারে বলুন, আপনি কবে অপারেশানটা করাতে চান?…
বিশ্বনাথ যে সি. ভি. অপারেশানটা করিয়েছেন সেটা আলোক বা পারমিতা টের পেল না। কারণ, অপারেশানটা এমন যে, অপারেশানের পর ঘণ্টাতিনেক রেস্ট নিলেই রুগি চাঙ্গা হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারে। ফলে বিশ্বনাথও অপারেশানের পর ‘শটস অ্যান্ড কিকস’ থেকে দিব্যি পায়ে হেঁটে বেরিয়ে এসি ট্রলি বাস ধরে বাড়ি চলে এসেছেন। ওরা কেউ কিছু টের পায়নি।
তবে ভিক্টর বিশ্বনাথকে দেখে একটু যেন বাড়তি গরগর করেছিল। তাতে ভয় পেয়ে সাততাড়াতাড়ি নিজের ঘরে ঢুকে পড়েছেন।
বিশ্বনাথের কেমন যেন গা গুলোচ্ছিল। তাই রাতে আর কিছু খাননি। ডক্টর মালাকার বলেছেন, ক’টা দিন ঠান্ডা নরম জিনিস খেতে—তার সঙ্গে দুধ বা ফলের রস।
তেতো হাসি আঁকা হয়ে গেল বিশ্বনাথের ঠোঁটে। দুধ বা ফলের রস! মালাকার তো আর জানেন না ও-দুটো জিনিসের বন্দোবস্ত করতে গেলে অকর্মণ্য বেকার বুড়ো বাপের জন্য আলোর যা বাজেট সেটা ছাড়িয়ে যাবে!
ডক্টর মালাকার বন্ধুর মতো সমস্ত ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিয়েছেন বিশ্বনাথকে। সাতদিন বিশ্রাম। তারপর ‘এস এ কে’-তে গিয়ে ডক্টর মালাকারের কাছে পোস্ট অপারেশনাল চেক-আপ। এই রুটিন চলবে টানা বত্রিশ দিন। তারপর বিশ্বনাথ নতুন জীবনের জন্য পুরোপুরি তৈরি হয়ে যাবেন।
যেহেতু অপারেশানটা রিভারসিবল নয় সেহেতু মালাকার বারবার করে বলেছেন, নতুন জীবন নিয়ে কখনও কোনওরকম আক্ষেপ না করতে। এও বলেছেন, ‘…আপনার যা বয়েস তাতে দুঃখ বা আক্ষেপ হলেও খুব বেশিদিন সেটা আপনাকে সইতে হবে না। সবসময় অপটিমিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলবেন, বিশ্বনাথবাবু। ইট উইল বি গুড ফর ইয়োর নিউ লাইফ।’
আলোক আর পারমিতার জীবন ওদের ছন্দে চলছিল। আর বিশ্বনাথ থেকেও-না-থাকার ঢঙে দিন কাটাতে লাগলেন। শুধু অপারেশানের উপসর্গগুলো ওঁকে কষ্ট করে সইতে হচ্ছিল। দাঁতে আর মাড়িতে অসহ্য ব্যথা, কান ভোঁ-ভোঁ করা, মাথা ঘোরা, গলা শুকিয়ে আসা। মালাকার ওঁকে মোবাইল নম্বর দিয়েছেন। বলেছেন, ‘দরকার মনে করলেই আমাকে ফোন করবেন। আমার ফোন চব্বিশ ঘণ্টা অন থাকে—।’
অপারেশানের সময় স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বনাথের কোনও জ্ঞান ছিল না। তবে অপারেশানের আগে ডক্টর মালাকার সংক্ষেপে সহজে ব্যাপারটা ওঁকে মোটামুটি বোঝাতে চেষ্টা করেছেন।
বিশ্বনাথের ক্যানাইন টুথ বা শ্বদন্ত দুটো আধুনিক কৌশলে রিস্ট্রাকচারড করা হয়েছে। ফলে দাঁত দুটো এখন আরও চোখা হয়েছে। আর ও-দুটোর ভেতরে সূক্ষ্ম চ্যানেল তৈরি করা হয়েছে। ওর লালা গ্রন্থির মধ্যে ইমপ্ল্যান্ট করা হয়েছে একটা স্পেশাল ভ্যাম্পায়ার সিরাম গ্ল্যান্ড। এ ছাড়া নার্ভাস সিস্টেমটাকেও রিমডেল করে ভাইটালাইজ করা হয়েছে। আর মাসল স্ট্রেংথ অনেক বাড়ানো হয়েছে—সেই সঙ্গে কমানো হয়েছে যন্ত্রণা অনুভবের ক্ষমতা।
ডক্টর মালাকারের ভাষায়, ‘…পুরো ব্যাপারটাই এটা হাই-টেক ইনট্রিকেট কোঅর্ডিনেটেড অপারেশান। গত পাঁচ দশকে বায়োটেকনোলজির ফেনোমেনাল বুম না হলে এই অপারেশানটা শুধুমাত্র কল্পবিজ্ঞানের বইয়ে পাওয়া যেত—বিজ্ঞানের বইয়ে নয়।’
বিশ্বনাথ বোকার মতো প্রশ্ন করেছিলেন, ‘অপারেশানের পর আমি তা হলে কী হব? মানুষ, না ভ্যাম্পায়ার?’
‘দুটোই—।’ হেসে বলেছেন মালাকার, ‘ইউ উইল হ্যাভ দ্য বেস্ট অফ বোথ ওয়ার্ল্ডস।’
তারপর তাঁর সে কী মজার হাসি!
হতভম্ব বিশ্বনাথের চোখের সামনে সন্দীপনের মুখটা ভেসে উঠেছিল। সন্দীপন বলেছিলেন, তিনি বেশ মজায় আছেন। কোনও সমস্যা নেই। যেহেতু এই সিক্রেট অপারেশানটা নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা করাটা স্ট্রিকটলি বারণ, তাই সন্দীপন সব খুলে বলতে পারছেন না। শুধু বিশ্বনাথের দুরবস্থা দেখে বন্ধু হিসেবে মনে কষ্ট পেয়েছেন বলেই পথের নিশানাটুকু জানিয়েছেন।
অপারেশানের সাতদিন পর থেকেই বিশ্বনাথ পরিবর্তনগুলো টের পেতে লাগলেন।
আগে অন্ধকারের সময় কাটাতে খুব একটা পছন্দ করতেন না। কারণ, একরাশ বিষণ্ণতা মনটাকে ঘিরে ফেলত। রেণুকণার সঙ্গে মনে-মনে কথা বলা শুরু করে দিতেন—সেই কথার বেশিরভাগটাই ছিল আক্ষেপের।
কিন্তু এখন ধীরে-ধীরে সব কেমন পালটে যাচ্ছে। অন্ধকারের আকর্ষণ ক্রমশ টের পাচ্ছেন বিশ্বনাথ। সন্ধের পর নিজেদের ফ্ল্যাটবাড়ির ছাদে উঠে সময় কাটাতে বেশ লাগে। খুব প্রয়োজন না হলে ঘরের আলো জ্বালেন না। আর সেই অন্ধকারে চোখ মেলে কত না নতুন-নতুন রূপ দেখতে পান বিশ্বনাথ। ওঁর চোখের সামনে জমাট অন্ধকার কেমন সুন্দর-সুন্দর ছবি তৈরি করে। তখন রেণুকণার সঙ্গে কথা বলেন বিশ্বনাথ। আক্ষেপের নয়—আনন্দের কথা। যেমন, আর কিছুদিন পর থেকেই বিশ্বনাথের টাকাপয়সার টানাপোড়েন আর থাকবে না। তখন অনেকটা নিজের মতো করে বাঁচতে পারবেন। রাস্তার হোটেল-রেস্তরাঁয় ইচ্ছেমতো ভালো-মন্দ কিছু খেতে পারবেন। কোনও দুঃস্থ মানুষকে পাঁচটা টাকা ভিক্ষে দিতে পারবেন। কমিউনিটি পার্কে খেলতে আসা ছোট-ছোট ছেলেমেয়েদের লজেন্স বা চকোলেট বিলি করতে পারবেন।
