নয়ন কাগজটা নিয়ে এসে দিল আমার হাতে। তারপর আবার গিয়ে বসল ভাঙা টেবিলে—ওর জায়গায়।’
কাগজটা ভাঁজ করা অবস্থায় রেখেই বলে উঠলাম, ‘রোশন, তালুকদার স্টোর্সের লোকটাকে তুমি চিনতে? খবরের কাগজে লোকটার নাম দিয়েছে, কিন্তু ঠিকানা দেয়নি।’
‘না, চিনি না—।’ জবাব দিল রোশনলাল।
‘অবনী?
‘আমি কী করে জানব—।’
‘পরাশর?’
পরাশর নীরব।
আমি হাসলাম। রিভলভার হাতে নাচাতে-নাচাতে বলে চললাম, ‘লোকটা হেভি সহজ-সরল। প্রথমে আমার হাতে এটা দেখে বুঝতেই পারেনি এটা রিভলভার। অবশ্য কপালে গুলি বেঁধার পর এই কিম্ভূতকিমাকার মালটা যে কী, সেটা বুঝতে লোকটার এতটুকুও অসুবিধে হয়নি—।’
‘হেমদা!’ গর্জে উঠল অবনী, ‘তালুকদার স্টোর্সের লোকটাকে খুন করতে তোমার লজ্জা করল না?’
আমি হিংস্রভাবে হাসলাম, ‘কেন, তোমার তাতে কী প্রবলেম হয়েছে?’
‘ক্ষতি-অক্ষতির কোশ্চেন না। তবুও বেহুদা মার্ডার করবে?’
‘তোমার দেখছি বিবেক জেগে উঠেছে! কিন্তু বিবেক শুধু তোমারই রয়েছে—নয়ন, রোশন, পরাশরের নেই?’
‘নেই কে বলল? আছে।’ উঠে দাঁড়াল নয়ন: ‘হেমকে আমি আগেও সে-কথা বলেছি।’
‘ওস্তাদ—’ এবারে রোশন মুখ খুলল, ‘পঁয়ষট্টি টাকা কখনও একটা জানের দাম হতে পারে না।’
‘পারে, খুব পারে। ওরকম একটা ভিতু কুত্তার জানের দাম ওর চেয়ে বেশি কোনওদিন ছিল না।’
‘হেমদা।’ উঠে দাঁড়াল পরাশর: ‘দধীচি তালুকদার তোমার কী ক্ষতি করেছিল যে, তুমি তাকে সামান্য ক’টা টাকার জন্যে খুন করলে?’
আমার মাথার ভেতরে যেন বজ্রপাত হল! মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগল। রিভলভারের বাঁটে আমার পাঁচ আঙুল ইস্পাত হয়ে চেপে বসল। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল। শত চেষ্টাতেও গলার স্বর অবাধ্য ভঙ্গিতে কেঁপে উঠল: ‘পরাশর, দধীচি তালুকদারের নাম তুমি কী করে জানলে?’
বেঞ্চ ছেড়ে কাঁপতে-কাঁপতে উঠে দাঁড়াল। অবনী। বিস্ফোরণের আভাস পেয়ে চাবুকের মতো তৎপর হয়ে দাঁড়াল নয়ন। হতভম্ব রোশনলাল আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। ওরা তিনজনেই বিড়বিড় করতে লাগল, ‘দধীচি তালুকদার—দধীচি তালুকদার।’
পরাশর আমার প্রশ্নের জবাবে বলে উঠল, ‘খবরের কাগজ পড়ে জেনেছি।’
নিষ্পাপ অভিব্যক্তিতে কাগজটা ওর দিকে এগিয়ে দিলাম। ও উন্মাদের মতো পাতা হাতড়ে খবরটা বের করল। বারকয়েক মনে-মনে সেটার ওপর চোখ বুলিয়ে যখন মুখ তুলে তাকাল তখন ওর মুখের চামড়ায় ধূসর প্রলেপ। কিন্তু আর তো ফেরার পথ নেই! আমার ফাঁদে ও পা দিয়ে ফেলেছে।
কয়েক মুহূর্ত নিটোল নিস্তব্ধতা।
তারপর মুখ খুললাম, ‘পরাশর, দধীচি তালুকদার তোমার কে হয়?’
পরাশর বেপরোয়া হয়েই জবাব দিল, ‘আমার বাবা!’
শব্দ দুটো যেন প্রতিধ্বনিত হয়ে গোটা ঘরটায় ফিরতে লাগল: আমার বাবা। আমার বাবা। আমার বাবা। আমার…।
এখন বুঝলাম, রক্তের সম্পর্ক মানুষকে কী করে বেপরোয়া করে তোলে। আমার মনে পড়ল অ্যাসিড ভরতি বোতলের কথা, বুকে বাঁধা ব্যান্ডেজের কথা, সবশেষে রিভলভারের গুলিটার কথা।
ঠান্ডা গলায় বললাম, ‘পরাশর, এ পর্যন্ত আমি একবারও দধীচির নাম তোমাদের সামনে বলিনি। খবরের কাগজেও এ নিয়ে কিছু লেখেনি। তাই আজ সকালেই আমি প্ল্যান করেছিলাম, তোমাদের যার মুখ দিয়ে ও-নাম বের করাতে পারব, বুঝব গত তিনটে অ্যাক্সিডেন্টের জন্যে সে-ই দায়ী। অতএব, ঈশ্বর দধীচি তালুকদারের পুত্র ঈশ্বর পরাশর তালুকদার, তোমার স্বর্গজীবন সুখের হোক—।’
রিভলভারের চাপা শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই গুলির ধাক্কায় রোশনের ঘাড়ের ওপর গিয়ে পড়ল পরাশর। ওর মুখে পলকের জন্যে ফুটে উঠল বিস্ময়ের ছায়া। তারপর ওর শরীরটা সশব্দে আছড়ে পড়ল মেঝেতে। কপাল থেকে সরু রক্তের ধারা গড়িয়ে এল বাইরে।
রোশন নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। জানতে চাইল, ‘ওস্তাদ, দধীচি তালুকদারের কপালে কি কোনও কাটা দাগ ছিল?’
‘হ্যাঁ, ছিল। কেন?’
রোশন চুপ।
অবনী বড়-বড় পা ফেলে তড়িতে এগিয়ে গেল ভাঙা টেবিলটার কাছে। ওর বলিষ্ঠ দু-হাতে টেবিলটাকে মাথার ওপর তুলে মেঝেতে এক আছাড় মারল। প্রচণ্ড শব্দে গোটা ডেরাটা থরথর করে কেঁপে উঠল। আমরা নির্বাকভাবে দেখলাম, অবনী এক হ্যাঁচকায় ভেঙে নিল টেবিলটার একটা ভারী পায়া। ফিরে এসে প্রতিদ্বন্দ্বীর ভঙ্গিতে পা ফাঁক করে দাঁড়াল আমার কাছ থেকে হাত-ছয়েক দূরে।
নয়ন আর রোশন গিয়ে দাঁড়াল অবনীর পাশে। ওরা তিনজনে মিলে আমাকে কেন্দ্র করে ছ’-হাত ব্যাসার্ধের এক বৃত্তচাপের জন্ম দিল।
আমার হতভম্ব মুখের দিকে তাকিয়ে নয়ন বলল, ‘হেম, দধীচির নামটা আমি এই মুহূর্তেই প্রথম শুনলাম।’
‘আমিও।’ একইসঙ্গে জবাব দিল অবনী আর রোশনলাল।
‘পরাশর জানত, তালুকদার স্টোর্স দোকানটা ওর বাবার—’ নয়ন বলল, ‘কিন্তু আমি জানতাম না যে—।’
‘তার মালিক দধীচি তালুকদার।’ বক্তা অবনী ও রোশন।
‘হেম, দধীচিকে খুন করে আমার বোনকে তুই বিধবা করেছিস।’ ফিসফিসে ভেজা স্বরে বলল নয়ন, ‘আমার ছোট বোন সুনন্দাকে আমি বড় ভালোবাসি।’
‘হেমদা, আমার নাম অবনী তালুকদার। দধীচি আমার দাদা। বাড়ি ছেড়েছি বহুদিন—কিন্তু তবুও সে আমার বড়ভাই। ছোট একটা দোকান চালায় বলে শুনেছি…।’ গম্ভীর স্বরে বলে উঠল অবনী।
‘ওস্তাদ, এই দধীচি তালুকদার একদিন নিজের জান কবুল করে আমার জান বাঁচিয়েছিল।’ থেমে-থেমে রোশন বলল।
