আমার সমস্ত ভাবনা-চিন্তা লোপ পেল। সব কিছু যেন জটিল থেকে জটিলতর হতে লাগল। পরাশর, অবনী, নয়ন, রোশন—ওদের চেহারাগুলো যেন দ্রুতগতিতে পরস্পরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। বুঝলাম, আমি শ্রীহেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় দধীচির তনুত্যাগে যার সূত্রপাত করেছি, বৃত্র-সংহারেই তার শেষ। সেই রক্তের ঋণ শোধ করতেই ওরা এতটা কর্তব্যপরায়ণ হয়ে উঠেছে।
‘আমাকে ক্ষমা করিস, হেম।’ নয়নের চাপা স্বর কানে এল।
আচ্ছন্ন দৃষ্টি কাটিয়ে দেখি রোশনের হাতে ঝকঝকে স্টিলেটা। অবনীর হাতে ভারী কাঠের পায়াটা। আর নয়ন, ওর রক্তাভ দু-চোখ জলে চিকচিক করে জ্বলছে।
আমাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ওদের বৃত্তের ব্যাসার্ধ ক্রমেই ছোট হয়ে আসতে লাগল। পরাশরের শূন্য দৃষ্টি এই শেষ দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে রইল। ওদের শরীরের ছায়া একসময় আমার গায়ে এসে পড়তেই কেমন যেন শীত-শীত করে উঠল।
আমি হেম বাঁড়ুয্যে, জীবনে এই প্রথম শিউরে উঠলাম।
এবং জানি, এই শেষবার!
দাগের বাইরে যাবেন না
ফ্ল্যাটের কলিংবেল বেজে উঠল।
রাজরীতা টিভিতে ক্রাইম ডট কম প্রোগ্রামটা দেখছিল। রিমোটটা হাতে নিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে পড়ল।
ফ্ল্যাটের দরজার অন্তত বারো ফুট দূরে দাঁড়িয়ে রিমোটের বোতাম টিপল রাজরীতা। স্পেশাল মেটাল ফাইবারের তৈরি দরজার মাঝখানের অংশটা পলকে স্বচ্ছ হয়ে গেল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন লোককে দেখতে পেল রাজরীতা। কিন্তু ও জানে, বাইরে দাঁড়িয়ে ঘরের ভেতরটা দেখা যায় না। কারণ, দরজার এই স্বচ্ছতা একমুখী।
লোকদুটোর পরনে নীল রঙের ইউনিফর্ম। নামি কোম্পানির সার্ভিস বা মেইনটিন্যান্সের লোকজনদের যেমন পোশাক হয়। ওদের একজনের হাতে একটা মাঝারি মাপের পেটমোটা ব্যাগও আছে।
রাজরীতা দোটানায় পড়ল : দরজা খুলবে, কি খুলবে না?
এখন কলকাতায় খুন-জখম-চুরি-ডাকাতি ভীষণরকম বেড়ে গেছে। এইসব খবর নিয়েই ক্রাইম ডট কম প্রোগ্রাম। তাতে রোজ আধঘণ্টা ধরে পশ্চিমবঙ্গের যত ক্রাইমের খবর দেখানো হয়। সিকিওরিটি পুলিশ যেসব ক্রিমিনালকে খুঁজে বেড়াচ্ছে তাদের ছবিও দেখানো হয়। একটু আগে রাজরীতা সেইসব ছবিই দেখছিল।
দুজন লোকেরই চোখে চশমা, ঠোঁটের ওপরে পুরু গোঁফ। বয়েস খুব বেশি হলে তিরিশ বত্রিশ। একজনের মাথায় টুপি, আর-একজনের মাথায় ঝাঁকড়া চুল। কাজের একঘেয়েমিতে মানুষের মুখে যে-বিরক্তির ছাপ পড়ে ওদের দুজনের মুখেই সেই ছাপের জেরক্স কপি।
দরজার কাছে গিয়ে ভয়েস সিস্টেম অন করল রাজরীতা। তারপর জিগ্যেস করল, কী চাই?
উত্তরে একজন বলল, ম্যাডাম, আমরা বিটা রেফ্রিজারেশান কোম্পানি থেকে আসছি। এই ফ্ল্যাট থেকে… পকেট থেকে একটা কম্পিউটার প্রিন্ট-আউট বের করে দেখল সে ও মিস্টার শত্রুজিৎ সোম আমাদের সার্ভিস কল দিয়েছিলেন। কল নাম্বার আর ডেট হল…।
শেষ কথাগুলো আর মন দিয়ে শুনল না রাজরীতা। ওর চট করে মনে পড়ে গেল। ওদের ফ্রিজটা কিছুদিন ধরেই গণ্ডগোল করছে। ফ্রিজের বাইরের পাইপ মেট্রিক্সে বরফ জমে যাচ্ছে। শত্রুজিৎ গত সপ্তাহে কোম্পানিতে খবর দিয়েছিল। নিশ্চয়ই তারাই লোক পাঠিয়েছে।
তা সত্ত্বেও লোকদুটোকে যাচাই করার জন্য রাজরীতা প্রশ্ন করল, বলুন তো, আমাদের ফ্রিজের রং কী? মডেল নাম্বার কত?
কম্পিউটার প্রিন্ট-আউট হাতে লোকটি দরজার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাসল। রাজরীতাকে সে দেখতে পাচ্ছে না, তাই মুখে কেমন যেন একটা অস্বস্তির ছাপ।
আপনার ফ্রিজটা ব্লু রঙের, ম্যাডাম–অবশ্য যদি না আপনি ওটা এর মধ্যে প্রাইভেটলি অন্য রং করিয়ে থাকেন। আর মডেল নাম্বার বিটা-টু ওয়ান ফাইভ জিরো-এম। প্রিন্ট-আউটটা দেখতে দেখতে লোকটা আরও যোগ করল? আপনার ফ্রিজের সিরিয়াল নাম্বার হল…।
রাজরীতা সিরিয়াল নম্বরের জন্য আর অপেক্ষা করল না। কারণ, অন্য দুটো প্রশ্নের উত্তরে ওরা ফুল মার্কস পেয়েছে।
রিমোটের একটা বোতাম টিপে ও বলল, আসুন–ভেতরে আসুন।
দরজার পাল্লা একপাশে সরে যেতেই মুখে সৌজন্যের হাসি নিয়ে দুজন কর্মী মসৃণ ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকে পড়ল।
দরজার পাল্লা আবার ফিরে এল আগের জায়গায়। তারপর নিজে থেকেই লক হয়ে গেল।
বিশাল ড্রইং-ডাইনিং স্পেসের ওপরে একপলক চোখ বুলিয়ে নিল দুজনে। ওদের চাহনিতে সতর্কভাবে জরিপ করার দৃষ্টি। রাজরীতার কেমন যেন খটকা লাগল।
ঘরের একপাশে সাজানো টি-টেলের কাছে গিয়ে ব্যাগটা টেবিলে নামিয়ে রাখল একজন। তারপর সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে চোখে-চোখে কী যেন কথা হল। এবং দুজনেই আয়েসি ভঙ্গিতে সোফায় বসে পড়ল।
ব্যাপারটা রাজরীতার কাছে নেহাতই অসভ্যতাবলে মনে হল। তবুও ও ভাবল, হয়তো ওরা সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত–তাই সৌজন্য না দেখিয়েই সোফায় বসে পড়েছে।
ঘরের পুবদিকের দেওয়ালে টিভিতে ক্রাইম ডট কম চলছিল। ওদের একজন ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে দেখছিল। আর অন্যজন রাজরীতার দিকে তাকিয়ে ভুরু উঁচিয়ে অশালীন ঢঙে হাসছিল।
হঠাৎই হাসি থামিয়ে টিভি-দেখা সঙ্গীর কাঁধে বাঁ-হাতে চাপড় দিল সে। বলল, অত কী দেখছিস! আজ নয় কাল আমাদের পিকচার ক্রাইম ডট কম-এ দেখাবে।
রাজরীতার বুকের ভেতরে হাতুড়ি পড়ল।
ও কাঁপা গলায় বলল, আপনাদের আইডি কার্ড দেখি।
দেখাচ্ছি। বলে একজন টেবিলে রাখা ব্যাগটা খুলে তার ভেতর থেকে অদ্ভুত চেহারার একটা বন্দুক বের করল।
