তৃতীয় দুর্ঘটনাটা একেবারে চরমে পৌঁছল।
রাত তখন সাড়ে এগারোটা। খাওয়াদাওয়া সেরে বেশ কিছুক্ষণ হল ঘুমিয়েছি। ঘুমোনোর আগে ওদের তিনজনকে ডেকে আগামীকাল সকালই যে গদ্দারের লুকিয়ে থাকার টাইম লিমিট সেটা ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছি। যথারীতি নিজেদের সাফাই দিয়েছে ওরা তিনজনেই। তারপর বাইরের ঘরে শোওয়ার ব্যবস্থা করতে শুরু করেছে।
এমনিতে ঘুম আমার গভীরে। কিন্তু আজ, বিশেষ করে বুকের জ্বালা আর মনের অন্ধ আক্রোশ, এই দুয়ের জন্যে অন্যান্য রাতের মতো সহজে ঘুম আসেনি। অন্ধকারে শুয়ে-শুয়ে ভেবেছি তিনজনের মধ্যে কে? অবনী? পরাশর? রোশনলাল? নাকি যাকে রেখেছি সব সন্দেহের সীমার বাইরে, সেই নয়ন সেনই এ দুর্ঘটনাগুলোর পরিচালক এবং প্রযোজক।
এই জটিল চিন্তাভাবনার মধ্যেই একটা চাপা খসখস শব্দ আমার কানে এল। কানে এল দর্মার দরজা সরানোর শব্দ।
বুঝলাম, কেউ খুপরি-ঘরে ঢুকছে।
স্বাভাবিক সতর্কতায় বাঁ-হাত চলে গেল বালিশের নীচে। আঁকড়ে ধরলাম প্যাড জড়ানো রিভলভারের বাঁট। জমাট অন্ধকার ভেদ করে দরজার দিকে নজর ফেলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ফালতু চেষ্টা। তাই সাবধানে বিছানা ছেড়ে নেমে এলাম মেঝেতে। গড়িয়ে গড়িয়ে সবেমাত্র ঠান্ডা মেঝে ছুঁয়েছি, দর্মার দরজা পুরোটা খুলে গেল। দরজায় ভেসে উঠল একটা ছায়াশরীর।
নাকে মদের হালকা গন্ধ, হাতে রিভলভার, মনে ঝঞ্ঝা—এই তিনকে সঙ্গী করে আমি অপেক্ষায় রইলাম। বুকের ভেতরে একপাল সৈন্য নিখুঁত তালে মার্চ করে চলেছে—ধুপ…ধুপ…ধুপ…ধুপ…।
অন্ধকারের পটভূমিতে জমাট অন্ধকার শরীরটাকে আমার বিছানার দিকে আরও খানিকটা এগোতে দেখে আমি রিভলভারটা ডানহাতে নিয়ে উঁচিয়ে ধরলাম। আর ঠিক তখনই যন্ত্রণায় ‘উঃ’ করে চেঁচিয়ে উঠলাম। না, আমার বুকের ব্যথা নয়, বিকেলে ভেঙে যাওয়া বোতলটার একটুকরো কাচ—যা পরিষ্কার করার সময় পরাশরের নজরে পড়েনি। সেই কাচে কনুই লাগতেই আমার গলা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে অস্ফুট আর্তনাদ।
সঙ্গে-সঙ্গে অন্ধকারের বুক চিরে দেখা গেল নীল আলো। আগন্তুকের রিভলভারে গুলি ছুটে এসেছে আমার বিছানা লক্ষ্য করে। আমার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। আক্রোশ ফেটে পড়ল আমার রিভলভারের নল। পাগলের মতো দরজা লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে চললাম। কারও ছুটে পালানোর দুদ্দাড় শব্দ পেলাম। তারপরই একটা গুঞ্জন ভেসে এল পাশের ঘর থেকে। শোনা গেল পরাশর, অবনী আর রোশনের গলা, ‘কী হল, হেমদা?’
আমি মেঝে ছেড়ে উঠে দাঁড়ানোর আগেই ওরা জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে হুড়মুড় করে এসে ঢুকল আমার ঘরে। আমি রিভলভারটা শক্ত মুঠোয় চেপে উঠে দাঁড়ালাম। তারপর বসে পড়লাম বিছানায়। অন্ধ ক্রোধে আমার শরীর থরথর করে কাঁপছে। গলা দিয়ে কোনও স্বর বেরোচ্ছে না।
ওদের প্রশ্নের কোনও জবাব না দিয়ে শুধু বললাম, ‘নয়নকে ওর বাড়ি থেকে কেউ ডেকে নিয়ে এসো—এখুনি।’
নীরবে ঘর ছাড়ল রোশনলাল। আমি বিছানা ছেড়ে পা বাড়ালাম বাইরের ঘরের দিকে।
বাইরের ঘরে আসবাবপত্র কম থাকায় একটু খোঁজাখুজি করতেই পাওয়া গেল রিভলভারটা। সদর দরজা হাট করে খোলা। যেন আমাকে বোঝানোর চেষ্টা, এই অপকীর্তি বাইরের কোনও লোকের। রিভলভারের ম্যাগাজিন খুলে দেখি তাতে কোনও গুলি নেই।
রিভলভারটা বাঁ-হাতে পকেটে পুরে হ্যারিকেনের আলোটা জোর করে দিলাম। ওদের ডেকে বললাম মোমবাতিটা এ-ঘরে নিয়ে আসতে এবং অন্য হ্যারিকেনটাও জ্বেলে দিতে।
ওরা নীরবে আদেশ পালন করলে কাঠের বেঞ্চটা আঙুল দিয়ে দেখালাম: ‘অবনী, পরাশর, তোমরা ওই বেঞ্চটায় বোসো।’
আমি গিয়ে বসলাম মোড়াটায়। তারপর চলল চুপচাপ অপেক্ষা।
প্রায় আধঘণ্টা বাদে ফিরে এল রোশনলাল, সঙ্গে নয়ন। নয়নের চোখে-মুখে ঘুমের ছাপ। দেখে বোঝা যাচ্ছে, কোনওরকমে তালিমারা পাঞ্জাবি আর চটিটা গায়ে-পায়ে গলিয়ে ও চলে এসেছে।
আজ নয়ন আর প্রশ্ন করল না, ‘কী ব্যাপার, হেম? এত রাতে হঠাৎ তলব?’ কারণ, ও বোধহয় ঘরের থমথমে পরিবেশ এবং আমার মুখ দেখে ব্যাপারটা আঁচ করতে পারল।
নয়নের দিকে চেয়ে হেসে উঠে দাঁড়ালাম। বললাম, ‘নয়ন, তুই কষ্ট করে টেবিলটায় বোস। রোশন, তোমার জন্যে অবনীর পাশে জায়গা খালি রয়েছে—যাও, বোসো।’
সকলে বসার পর সংক্ষেপে নয়নকে নতুন ঘটনার কথা জানালাম। তারপর পকেট থেকে বের করে নিলাম অচেনা রিভলভারটা। প্রশ্ন করলাম, ‘এটা কার?’
সবাই চুপ।
‘ঘড়ির কাঁটায় আমার দেওয়া আটচল্লিশ ঘণ্টা শেষ না হলেও আমার হিসেবে সে-আটচল্লিশ ঘণ্টা আজ, একটু আগেই, শেষ হয়ে গেছে। এ-কথা এখন দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট যে, অবনী, রোশন, অথবা পরাশর—তোমরা তিনজনের একজন আমাকে খুন করতে চাও।’
‘বাজে কথা!’ বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়াল অবনী।
‘অবনী, বোসো। আর একটু পরেই যখন এ-ঘরে একটা বডি পড়ে থাকবে তখনই বোঝা যাবে কার কথা কতটুকু ঠিক।’
অবনী বসল। ওদের মুখে একটা উৎকণ্ঠা আর আতঙ্কের ছাপ।
‘ঘটনার শুরু কাল রাতে—’ আমি দাঁড়িয়ে থেকেই বলতে শুরু করলাম, ‘যখন তালুকদার স্টোর্সের লোকটা আমার হাতে খুন হয়। আমার মনে হয়েছিল, সেই খুনটাকে তোমরা কেউই ভালো চোখে দ্যাখোনি—এমনকী নয়নও ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তোমরা আমাকে মার্ডার করতে চাইবে। অথচ তাই ঘটছে। তিন-তিনবার আমাকে—হেম বাঁড়ুয্যেকে—মার্ডার করার চেষ্টা হয়েছে। এ ধরনের ব্যাপার আমি বিন্দুমাত্রও লাইক করি না। সুতরাং—’ ফিরে তাকালাম নয়নের দিকে ‘নয়ন, ও-ঘর থেকে কালকের কাগজটা নিয়ে আয়।’
