উত্তর শুনে মালাকার হাসলেন, বললেন, ‘ওয়ান্ডারফুল! আপনার মতো কনফিডেন্ট পেশেন্ট আমরা খুব বেশি পাই না। বেশিরভাগই দোটানায় ভোগে।’
বিশ্বনাথ অপেক্ষা করতে লাগলেন। এরপর কী করতে হবে সেটা ডক্টর মালাকার তাড়াতাড়ি বলে ফেললেই ভালো। সিদ্ধান্ত যখন নেওয়া হয়েই গেছে তখন আর দেরি করে লাভ কী!
সন্দীপন এখানকার কনট্যাক্ট নম্বর বিশ্বনাথকে দিয়েছেন, আর দু-চার লাইনে অপরেশানটার কথা বলেছেন। এও বলেছেন, ‘আর বেশি জানতে চেয়ো না। ওরা পুরো ব্যাপারটাই কনফিডেনশিয়াল রাখতে বলেছেন। তুমি আগে ডিসাইড করো কী করবে—তারপর ওখানে গেলে ওরাই সবকিছু তোমাকে ডিটেইলসে বলে দেবে…।’
এখন সেই ডিটেইলস শোনার পালা।
ডক্টর মালাকার টেবিলে রাখা ল্যাপটপের কিবোর্ডে আঙুল চালালেন। এলসিডি পরদার দিকে কয়েক সেকেন্ড আড়চোখে তাকালেন। তারপর বিশ্বনাথের দিকে তাকিয়ে একগাল হাসলেন।
‘বিশ্বনাথবাবু, আমরা আপনার একঘেয়ে ক্লান্তিকর জীবনটা বদলে দেব—নতুন থ্রিলিং জীবনের দরজা খুলে দেব আপনার সামনে।’ টেবিলের ওপরে ঝুঁকে এলেন মালাকার: ‘না, না—এগুলো মোটেই সেলস টক নয়। এগুলো হার্ড রিয়েলিটি। তা ছাড়া অপারেশানের জন্যে আমরা তো পয়সা নেব—সো ইউ শুড নট বি গ্রেটফুল টু আস। ইটস আ প্রফেশনাল ডিল। আপনি যা চান—আমরা দেব।
‘আপনি তো জানেন, এই টুয়েন্টি সেকেন্ড সেঞ্চুরিতে টেকনোলজি বুম যেমন হয়েছে তেমনই হয়েছে অ্যাডিকশান বুম—স্ম্যাক বুম। এখনকার ইয়াং জেনারেশানের টুয়েন্টি এইট পার্সেন্ট অ্যাডিকটেড। মদ, গাঁজা, চরস, হ্যাশিশ, এলএসডি, মারিজুয়ানা, কোকেন, মরফিন, মিথাডেন, মেস্কালাইন—এরকম কত নাম আর বলব! এর কোনওটা স্টিমুল্যান্ট, কোনওটা নারকোটিক, আবার কোনওটা বা হ্যালুসিনোজেন। এরকম আরও অনেক টাইপ আছে। কিন্তু লাস্ট পনেরো কি বিশ বছরে আরও অনেক নতুন-নতুন নেশা ইনট্রোডিউসড হয়ে গেছে…।’
ডক্টর মালাকারকে বাধা দিয়ে বিশ্বনাথ বললেন, ‘হ্যাঁ—যেমন সাপের ছোবল।’
হাসলেন মালাকার: ‘ঠিকই বলেছেন। তবে সাপের ছোবলেই ব্যাপারটা থেমে থাকেনি। সাপের পাশাপাশি চালু হয়েছে পাহাড়ি কাঁকড়াবিছে, গিরগিটি আর বেজির কামড়—এ ছাড়া যদিও খুব রেয়ার এবং কস্টলি, কেউ-কেউ নেশার জন্যে অ্যামেরিকার অ্যারো-পয়জন ফ্রগের বিষ ডাইলুট করে ব্যবহার করে। আপনি জানেন কি না জানি না—বহুবছর আগে কাফ সিরাপ আর ঘুমের ট্যাবলেটও এসব কাজে ব্যবহার হত—’
বিশ্বনাথ মাথা নাড়লেন। হ্যাঁ, তিনি শুনেছেন।
ডক্টর মালাকার ভুরু উঁচিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কিন্তু এখন সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে কোন নেশা জানেন?’
বিশ্বনাথ জানেন। সন্দীপনের কাছে শুনেছেন। কিন্তু তিনি চুপ করে রইলেন। ডক্টর মালাকারের কাছ থেকেই উত্তরটা শোনার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
‘ভ্যাম্পায়ারের ছোবল।’ চোখ বড়-বড় করে বললেন মালাকার, ‘এটাই এখন ট্রেন্ডি। বড়লোকের নেশা করা ছেলেমেয়েরা এই ছোবলের জন্যে পাগল। বুঝতেই পারছেন, এই নেশাটা কস্টলি—তাই একটু অ্যাফ্লুয়েন্ট ফ্যামিলির ছেলেমেয়েরাই এই নতুন নেশায় হ্যাবিচুয়েটেড…। চলতি কথায় এটাকে আমরা বলি ”ভি-স্টিং”। আফটার সি. ভি. অপারেশান স্টিং প্রোভাইড করাটাই হবে আপনার প্রফেশান। তাতে খুব একটা খারাপ ইনকাম হবে না আপনার। তা ছাড়া বোনাস হিসেবে কতকগুলো বাড়তি সুবিধে পাবেন…থাক—সেগুলো পরে জানবেন।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখে হাত বোলালেন মালাকার: ‘মোট কথা, আমি আপনাকে বলছি, আফটার অপারেশান, দিস নিউ লাইফ ইজ গোয়িং টু বি ভেরি-ভেরি ইন্টারেস্টিং। রিয়েলি ইট ইজ—কারণ, এ পর্যন্ত আমরা কোনও কমপ্লেইন পাইনি।’
টেবিলে রাখা মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। সেইসঙ্গে কেঁপে উঠে নড়তে লাগল টেবিলের ওপরে।
ডক্টর মালাকার ফোনটা তুলে কথা বললেন, ‘হ্যাঁ’, ‘হ্যাঁ’, করে কিছুক্ষণ কথা বলে শেষে বললেন, ‘হ্যাঁ, পেশেন্টের সঙ্গে ফাইনাল কথা বলে অপারেশানের ডেট ফিক্স করে নিচ্ছি। ও. কে.।’
মোবাইল ফোনের বোতাম টিপে ওটা টেবিলে আবার রেখে দিলেন মালাকার। তারপর স্থির চোখে তাকালেন বিশ্বনাথের দিকে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘মিস্টার বোস, লেট আস নাউ কাম ডাউন টু বিজনেস। লেট মি টেল ইউ দ্য ফ্যাক্টস অ্যান্ড ফিগারস অ্যাবাউট দ্য সি. ভি. অপারেশান…।’
ডক্টর মালাকার বলে গেলেন, বিশ্বনাথ শুনে গেলেন।
অপারেশানটার জন্য খরচ দু-ঘণ্টা সময়, আর চল্লিশ হাজার টাকা। তবে হিসেব করলে অপারেশানটা মোটেই কস্টলি নয়। কারণ, অপারেশনের পরে বিশ্বনাথ যখন ‘শটস অ্যান্ড কিকস’-এর মাধ্যমে নেশার ক্লায়েন্ট পাবেন, তখন ক্লায়েন্টপিছু এক-একটা রাতের জন্য তিনি পাবেন একহাজার টাকা। তার মধ্যে সার্ভিস চার্জ হিসেবে ‘শটস অ্যান্ড কিকস’ কেটে নেবে থার্টি পার্সেন্ট। সুতরাং অঙ্ক কষলে দেখা যাবে, মাত্র আটান্ন রাতের কাজ পেলেই বিশ্বনাথের অপারেশানের খরচ উঠে আসবে। তা ছাড়া অপারেশানের পর বিশ্বনাথ কিছু নতুন-নতুন ক্ষমতার মালিক হবেন। সেগুলো বোনাস বলেই ভাবেন।
‘আমাদের এই অপারেশান বা রিলেটেড ব্যাপারগুলো কিন্তু অ্যাবসোলিউটলি কনফিডেনশিয়াল। আমাদের যে-এগ্রিমেন্ট তৈরি হবে তার একটা মেজর কন্ডিশানই হচ্ছে সিক্রেসি। কারণ, জেনে রাখুন, এই সি. ভি. অপারেশানটা পানিশেবল আন্ডার ইন্ডিয়ান পিনাল কোড। যদি অপারেশানের পরে আমাদের সিক্রেট পুলিশ কিংবা সিকিওরিটি কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্ট আপনার খোঁজ পায়…যদি জানতে পারে যে, আপনি কনভার্টেড ভ্যাম্পায়ার, তা হলে সঙ্গে-সঙ্গে আপনাকে অ্যারেস্ট করবে। তা ছাড়া ভ্যাম্পায়ারের ছোবল দিয়ে নেশা করা বা করানো—দুটোই ইল্লিগাল।’ মালাকার আবার চওড়া হাসলেন। চেয়ারে হেলান দিয়ে হাত দুটো ভুঁড়ির ওপরে রাখলেন। একটু কেশে নিয়ে বললেন, ‘আপনি হয়তো ভাবছেন, ইল্লিগাল হলে এই কাজটা আমরা করছি কেন। করছি কারণ, এই অপারেশানটা বায়োটেকনোলজির একটা নতুন এক্সপেরিমেন্ট। তা ছাড়া আমরা ভালো কাজও তো করছি! এই যে, কত ছেলেমেয়েকে ড্রাগের সর্বনাশা নেশা থেকে বাঁচাচ্ছি! আসলে একগাদা পুণ্যের সঙ্গে ছিটেফোঁটা পাপ মিশে থাকলে ওটা হিসেবের মধ্যে আসে না।
