তারপরই মেয়েটি কিবোর্ডের বোতাম টেপায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
বেশিক্ষণ বসতে হল না। সাদা অ্যাপ্রন পরা একটি ছেলে অফিসের ভেতর থেকে হেঁটে আসছিল রিসেপশানের দিকে। কাচের দরজা ঠেলে সে রিসেপশান জোনে এল। রিসেপশানিস্টের কাছে গিয়ে চাপা গলায় কী যেন জিগ্যেস করল। উত্তরে রিসেপশানিস্ট চোখের ইশারায় বিশ্বনাথকে দেখিয়ে দিল। সঙ্গে-সঙ্গে ছেলেটি স্মার্টভাবে চলে এল বিশ্বনাথের কাছে। নীচু গলায় বলল, ‘মিস্টার বোস?’
বিশ্বনাথ মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলে উঠে দাঁড়ালেন।
‘কাইন্ডলি আমার সঙ্গে আসুন—।’
ছেলেটির সঙ্গে এগোলেন বিশ্বনাথ। ওকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। চোখের আধুনিক পলিমার লেন্সের চশমা। ফরসা, রোগা চেহারা। এতই রোগা যে, চোয়াল এবং কণ্ঠা বিশ্রীভাবে নিজেদের জাহির করছে। তবে ছেলেটির মাথার চুল অস্বাভাবিক ফোলানে-ফাঁপানো। ওর রোগা চেহারার সঙ্গে ভীষণ বেমানান লাগছে। ওর পা ফেলার সঙ্গে-সঙ্গে ঝাঁকড়া চুলগুলো নড়ছে।
ছেলেটির সঙ্গে অনেকগুলো কাচের দরজা পেরোলেন বিশ্বনাথ। তারপর একটা পরদা ঘেরা কাচের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
ছেলেটি বিশ্বনাথের দিকে তাকিয়ে সুন্দর করে হাসল: ‘ভেতরে যান, মিস্টার বোস। ডক্টর মালাকার আপনার জন্যে ওয়েট করছেন।’
হাত বাড়িয়ে কাচের দরজা ঠেলে খুলল ছেলেটি। চোখের ইশারায় বিশ্বনাথকে ভেতরে যেতে ইশারা করল।
বিশ্বনাথ যখন ওকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকছেন তখন ছেলেটি চাপা গলায় বলল, ‘অল দ্য বেস্ট, স্যার—।’
ছেলেটি ‘স্যার’ বলায় বিশ্বনাথ অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালেন। ছেলেটি মুচকি হেসে চলে গেল।
এতক্ষণ বিশ্বনাথের বুকের ভেতরে হাতুড়ি পড়ছিল। যদিও জেদটা মনের ভেতরে ভালোমতোই জাঁকিয়ে বসেছিল। ছেলেটির বলা ‘স্যার’ শব্দটা বিশ্বনাথকে যেন নতুন এক ভরসা দিল। নতুন এক মর্যাদাও যেন অনুভব করলেন।
ভাবার সময় আর বেশি ছিল না। শক্ত পায়ে ঘরে ঢুকে পড়লেন বিশ্বনাথ। সঙ্গে-সঙ্গে ডক্টর মালাকার ওঁকে খুব চেনা আত্মীয়ের মতো অভ্যর্থনা জানালেন।
‘আরে, ‘আসুন…আসুন, বিশ্বনাথবাবু…’ একগাল হেসে দু-হাত বাড়িয়ে বিশ্বনাথের হাত চেপে ধরলেন মালাকার: ‘বলুন, কেমন আছেন? সব কুশল মঙ্গল তো!’
বিশ্বনাথ একটু অপ্রস্তুত হয়ে কাঠ-কাঠ হাসলেন। নীচু গলায় বললেন, ‘হ্যাঁ, ভালো আছি—।’
ডক্টর মালাকার কি অন্য কোনও সূত্রে ওঁকে চেনেন? এমনভাবে ভদ্রলোক কথা বলছেন যেন কতদিনের চেনা!
‘বসুন, বসুন—’একটা শৌখিন রিভলভিং চেয়ারের দিকে ইশারা করলেন ডক্টর মালাকার। তারপর একই ঢঙে উচ্চারণ করলেন, ‘হুম। তো আপনি ভ্যাম্পায়ার হতে চান? মানে, সি. ভি. অপারেশান করাতে চান—মানে, যেটাকে আমরা কনভার্টেড ভ্যাম্পায়ার বলি…।’
বিশ্বনাথ চেয়ারে বসলেন বটে, কিন্তু ওঁর গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।
মালাকার তাঁর চেয়ারে বসে হাসি-হাসি মুখে বিশ্বনাথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বোধহয় উত্তরের অপেক্ষা করছিলেন।
আশ্চর্য! কী সহজে কথাগুলো বললেন মালাকার! যেন ব্যাপারটা রোজকার দাড়ি কামানোর মতোই মামুলি।
ঠান্ডা ঘরের মধ্যেও ঘেমে গেলেন বিশ্বনাথ। অবাক চোখে মালাকার এবং তাঁর অফিসটাকে দেখতে লাগলেন। যেন পুরোটাই অন্য কোনও গ্রহের ব্যাপার।
ডক্টর মালাকার বেশ মোটাসোটা। কোমরের বেলটের ওপর থেকে মাঝারি মাপের ভুঁড়ি উপচে পড়ছে। মাথায় মসৃণ টাক—শুধু কানের ওপরটায় কয়েক খাবলা কাঁচাপাকা চুল। আর কানের পাশ দিয়ে অনেকটা গালপাট্টার মতন পাকা জুলপির জঙ্গল নেমে এসেছে।
মালাকারের রং ফরসা—তবে কিছুটা রোদে পোড়া। কপালে কয়েকটা ভাঁজ। ছোট মাপের ভুরু। তার নীচেই মেটাল ফ্রেমের বাইফোকাল চশমা। দু-দিকে ফোলা গানের মাঝে নাকটা বক্সারদের মতো থ্যাবড়ানো। গোঁফ-দাড়ি পরিষ্কার করে কামানো। থুতনির নীচে দু-থাক চর্বি। সবমিলিয়ে মুখে একটা কমিক ভাব আছে। ফলে এই লোক যে সি. ভি. অপারেশন করেন সেটা ভাবাটা বেশ কঠিন।
মালাকারের চেম্বারটা মাপে বেশ বড়। দেখে ডক্টরস চেম্বার বলেই মনে হয়। দু-দেওয়াল জুড়ে ‘এল’ কাউন্টার। তাতে বেশ কয়েকটা মোটা-মোটা বই আর কাগজপত্র রাখা। তার পাশেই একটা এলসিডি মনিটারওয়ালা কম্পিউটার। মনিটারে কারসর দপদপ করছে।
কাউন্টারের বাঁদিকে প্রচুর ডাক্তারি যন্ত্রপাতি। অপারেশানের জন্য সেগুলো ব্যবহার হয় কি না বিশ্বনাথ ঠিক বুঝতে পারলেন না। তার ঠিক ওপরেই কাচের দেওয়ালে একটা ইলেকট্রনিক ক্যালেন্ডার—তাতে আজকের তারিখটা লাল রঙে জ্বলছে।
ডক্টর মালাকারের সামনে রাবার উডের বড়সড় টেবিল। টেবিলের একপাশে ল্যাপটপ কম্পিউটার। হয়তো বিশ্বনাথ ঘরে ঢোকার আগে মালাবার এই কম্পিউটারেই কাজ করছিলেন।
কম্পিউটারের পাশে একটা বেঁটেখাটো প্ল্যাস্টিকের স্ট্যান্ড। স্ট্যান্ডের একইঞ্চি ওপরে একটা ডাম্বেল আকৃতির রোটর শূন্যে ঘুরছে। আর স্ট্যান্ডের একপাশে লেখা ‘এস. এ. কে’।
এ ছাড়া টেবিলে পড়ে আছে রঙিন কয়েকটা পেন, দুটো মোবাইল ফোন, আর চার-পাঁচটা খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিন।
মালাকার আবার জিগ্যেস করলেন, ‘আপনি সি. ভি. অপারেশানটা করাতে চান তো, বিশ্বনাথবাবু?’
বিশ্বনাথ মাইক টেস্ট করার মতো গলাখাঁকারি দিয়ে গলা টেস্ট করলেন। তারপর বললেন, ‘হ্যাঁ, চাই…যত তাড়াতাড়ি সম্ভব…।’
