একটু পরেই ওঁর মনে হল, অপারেশানটা হয়তো ইল্লিগাল—তাই এত সাবধান হতে চায় ওরা।
বিশ্বনাথ ওঁর মায়ের বিয়ের আগের পদবি বললেন।
তখন মেয়েটি ওঁকে একটা নম্বর দিয়ে বলল, ‘এটা আপনার রেফারেন্স নাম্বার। আমাদের অফিসের রিসেপশানে এসে এই রেফারেন্স নাম্বারটা বলবেন, আর আপনার ফোটো আই-ডি কার্ড দেখাবেন। তা হলেই আপনাকে একজন এক্সিকিউটিভ অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হবে। আপনার দেখা করার সময় হল সন্ধে সাতটা থেকে ন’টা। যদি আজ থেকে ঠিক সাতদিনের মধ্যে আপনি যোগাযোগ না করেন তা হলে আপনার সমস্ত রেকর্ডস আমাদের ডেটাবেস থেকে অটোমেটিক্যালি ইরেজড হয়ে যাবে। তখন আপনাকে পুরো কেসটা রিওপেন করতে হবে। ‘ইজ ইট ক্লিয়ার, মিস্টার বোস?’
এত কথা বলার সময় মেয়েটির গলায় এতটুকু ওঠা-পড়া হয়নি। মনে হচ্ছিল, টেলিফোনে মেয়েটি পড়া মুখস্থ বলছে।
এরপর মেয়েটি বিশ্বনাথকে ‘শটস অ্যান্ড কিকস’-এর ঠিকানা দিল। তারপর বলল, ‘উইশ ইউ অল দ্য বেস্ট ইন ইয়োর পসিবল নিউ লাইফ, মিস্টার বোস। থ্যাংক ইউ ফর কলিং। হ্যাভ আ নাইস ডে।’
টেলিফোনে কথা বলার পর বেশ কয়েকদিন তীব্র দোটানায় ভুগেছেন বিশ্বনাথ। অপারেশান করাবেন—না কি করাবেন না? রাতে বিছানায় শুয়ে-শুয়ে রেণুকণার সঙ্গে অনেক কাল্পনিক তর্ক-বিতর্ক করেছেন, নিজের সঙ্গেও অনেক লড়াই করেছেন। কারণ, এই সি. ভি. অপারেশানটা পারমানেন্ট—রিভার্সিবল নয়। একবার অপারেশান হয়ে গেলে আর ফেরা যায় না।
বিশ্বনাথ অনেক ভেবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে এলেন, তিনি আর ফিরতে চান না।
সুতরাং বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে ফিরে যাওয়ার কোনও ঝটকা টের পেলেন না বিশ্বনাথ। বরং মনে হল, সামনেই নতুন জীবন।
বাড়িটার রং চটে গেছে, নানান জায়গায় ফাটল। তার কোনও-কোনও জায়গা থেকে উঁকি মারছে বট-অশ্বত্থের চারা। রাস্তার ভেপার ল্যাম্পের কটকটে আলোয় বাড়িটাকে শতচ্ছিন্ন পোশাক পরা ভিখারি মনে হচ্ছে।
বাড়ির সদর দরজার মাথায় ছোট্ট ইলেকট্রনিক সাইনবোর্ড। তাতে ইংরেজি হরফে লেখা: ‘শটস অ্যান্ড কিকস’। তার নীচে ছোট-ছোট হরফে বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: ‘ড্রাগ অ্যাবিউজ ইজ ইনজুরিয়াস টু হেলথ।’
চারপাশে ড্রাগের নেশা কীরকম জাঁকিয়ে বসেছে সেটা বিশ্বনাথ ভালোই জানেন। সরকার ড্রাগ অ্যাবিউজের সমস্যা নিয়ে সবচেয়ে বেশি ব্যতিব্যস্ত। খবরের কাগজ কিংবা টিভি চ্যানেল খুললে ড্রাগের বিষয়ে খবর অন্তত শতকরা দশ ভাগ। চোদ্দো-পনেরো বছর বয়স থেকেই ঝাঁকে-ঝাঁকে ছেলেমেয়েরা ড্রাগের খপ্পরে পড়ছে। সেটা সামাল দিতে সরকার যে-স্পেশাল নারকোটিকস ডিপার্টমেন্ট খুলেছে তারা দিন-রাত হিমশিম খাচ্ছে। সেইসঙ্গে নাজেহাল হচ্ছে পুলিশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনীতির সমস্যা থেকেই এই সমস্যাটা মাথাচাড়া দিয়েছে। আর অর্থনীতির সমস্যার শিকড়ে রয়েছে তীব্র বেকার সমস্যা।
না, এতসব জটিলতা বিশ্বনাথ বোঝেন না। তিনি শুধু দেখছেন, চারপাশের ছেলেমেয়েরা দিন-দিন কেমন উচ্ছৃঙ্খল বেপরোয়া হয়ে উঠছে, নিত্যনতুন নেশার পিছনে পাগলের মতো ছুটছে। ওদের সামনে নির্দিষ্ট কোনও লক্ষ্য নেই।
বাড়ির ভেতরে ঢুকে ঝকঝকে তকতকে একটা অফিসের মুখোমুখি হলেন বিশ্বনাথ। চারপাশে শুধু কাচের দেওয়াল, সৌখিন রাবার উডের ফার্নিচার, ল্যাপটপ কম্পিউটার আর টেলিফোন। কোথাও-কোথাও মিহি সুরে ফোনের রিং বাজছে—এ ছাড়া এয়ার কন্ডিশান্ড অফিসটায় আর কোনও শব্দ নেই।
সব পার্টিশান কাচের হাওয়ায় অফিসের ভেতর অনেকটা দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল।
বিভিন্ন কাচের দেওয়ালে যেসব স্লোগান আর পোস্টার লাগানো রয়েছে তাতে মনে হবে ‘শটস অ্যান্ড কিকস’-এর আসল কাজ হল ড্রাগের মারাত্মক নেশা ছাড়ানো। প্রতিটি পোস্টারে ওদের লোগো—’এস’, ‘এ’, ‘কে’ অক্ষর তিনটে সুন্দর জড়ানো কায়দায় লেখা।
বিশ্বনাথের অবাক লাগছিল। মনে হচ্ছিল, এটাও আর-একটা ছদ্মবেশ।
রিসেপশানে অনেক লোকের ভিড়। বেশিরভাগই কমবয়েসি ছেলেমেয়ে—সঙ্গে ওদের বাবা-মা কিংবা গার্জেন। ওঁরা সত্যি-সত্যি হয়তো ছেলেমেয়ের ড্রাগের নেশা ছাড়াতে এসেছেন।
ওই ভিড়ের মধ্যে দুজন বয়স্ক মানুষকে দেখে বিশ্বনাথের সন্দেহ হল। ওঁরা দুজন সি. ভি. অপারেশানের জন্য আসেননি তো!
কে জানে, ‘শটস অ্যান্ড কিকস’ হয়তো ড্রাগের দু-দিকেই কাজ করে: ড্রাগের নেশা ধরানো এবং ছাড়ানো।
রিসেপশানিস্ট মেয়েটি ফুটফুটে দেখতে। ঠোঁটে টকটকে লাল লিপস্টিক। লম্বা-লম্বা নখে একই রঙের নেইলপালিশ। কানের লতিতে বিশাল মাপের দুটো রুপোলি রিং। ওর পিছনের দেওয়ালে জ্বলন্ত সিগারেটের ওপরে লাল কাটা চিহ্ন দেওয়া একটা পোস্টার।
রিসেপশানে বিশ্বনাথ নিজের নাম লেখা স্লিপ জমা দিয়ে দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করতে লাগলেন। পালা আসতেই রিসেপশানিস্ট মেয়েটি ওঁর নাম ধরে ডাকল।
বিশ্বনাথ চেয়ার ছেড়ে উঠে মেয়েটির কাছে গেলেন। নিজের রেফারেন্স নম্বর বললেন, ফটো আই-ডি কার্ড দেখালেন।
মেয়েটি ভাবলেশহীন মুখে ল্যাপটপের বোতাম টিপতে লাগল। কালো কিবোর্ডের ওপরে ওর নড়েচড়ে বেড়ানো লাল নখগুলোকে ফুলের পাপড়ি বলে মনে হচ্ছিল।
ল্যাপটপের পরদায় মেয়েটি কী দেখল কে জানে! শুধু চোখ তুলে বিশ্বনাথের দিকে কয়েকপলক তাকাল। তারপর বলল, ‘আপনি বসুন, মিস্টার বোস। আপনাকে নিতে লোক আসবে।’
