আমি ঘামতে শুরু করেছিলাম। একে খাপছাড়া বর্ষার গুমোট, তার ওপর ডবল জামা ডবল প্যান্ট। আমার হাঁটতে-চলতেও বেশ অসুবিধা হচ্ছে।
দমবন্ধ করে আমি সময় কাটাতে লাগলাম। কখন সাতটা-আটটা বাজবে তার অপেক্ষা করতে লাগলাম। অন্যান্য গেস্ট তখন এসে পড়বে। বোতলের ছিপি খোলা হবে। পার্টির হইহই তখন তুঙ্গে উঠবে। আমার দিকে ততটা কেউ আর খেয়াল করবে না। সেই সুযোগে আমি…।
সময় গড়িয়ে সন্ধে হল। সন্ধে আরও গভীর হল। অতিথির ভিড়ে টনির ফ্ল্যাট একেবারে হাটবাজার হয়ে উঠল। সোনিও ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে এসে পড়েছে। সুবীর আমাকে ওদের কাছে নিয়ে গেল, পরিচয় করিয়ে দিল ‘গ্রেট ইনভেন্টর’ বলে। আর সোনি আমার নামে ওর বাবা-মায়ের কাছে এত প্রশংসা করতে লাগল যে, আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম।
সোনিকে দেখে আমার বারবার মনে হচ্ছিল, যে-পথে আমি পা বাড়িয়েছি সেই পথটাই একমাত্র সঠিক পথ।
এর মধ্যে জিনিয়া আমাকে তিনবার ফোন করেছে। দু-পাঁচমিনিট করে কথা বলেছে। আমিও ওকে পালটা দুবার রিং করেছি। সুবীরের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিয়েছি। পার্টির নেশা ধরানো মিউজিক নিশ্চয় জিনিয়ার কানে গেছে। ও বুঝেছে, আমি ওকে পার্টির ব্যাপারটা মোটেই ব্লাফ দিইনি।
রাত ন’টার সময় জিনিয়াকে ওর মোবাইলে আবার ফোন করলাম।
‘কী করছ?’
‘হঠাৎ জানতে চাইছ?’
‘এমনি জানতে ইচ্ছে হল।’
‘শুয়ে আছি। ম্যাগাজিন পড়ছি।’
আমি জানি, জিনিয়া অনেক সময় বিছানায় শুয়ে-শুয়ে নানান পত্রপত্রিকা পড়ে। তারপর সাড়ে দশটা নাগাদ আমরা একসঙ্গে খেতে বসি।
আমি বললাম, ‘তোমার কাছে যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু তুমি কোথায় সল্টলেকে নিজের বাড়িতে শুয়ে-শুয়ে আয়েস করছ, আর আমি সন্তোষপুরে তনুময় বোসের ফ্ল্যাটে পার্টি করছি। বিলিভ মি, ভীষণ বোর লাগছে। এক্ষুনি তোমার কাছে চলে যেতে পারলে হত।’
হাসল জিনিয়া: ‘চলে এসো। অভিনয় যখন করছ ভালো করেই করো।’
‘অভিনয়?’ ঠাট্টা করে বললাম, ‘এক্ষুনি তোমার কাছে যাচ্ছি। দেখাচ্ছি মজা।’
আমার ডায়লগগুলো আপনারা দয়া করে খেয়াল করবেন।
জিনিয়া খুন হলে পুলিশ অফিসাররা ওর মোবাইল ফোন নিয়ে পড়বে। ওর কল লিস্ট দেখবে। এমনকী কথাবার্তার রেকর্ডও শুনবে। তখন ওরা যাতে নিশ্চিত প্রমাণ পায় যে, খুন হওয়ার পাঁচ-সাত মিনিট আগেও আমার আর জিনিয়ার মধ্যে অন্তত বিশ কিলোমিটার ফারাক ছিল, সেইজন্যেই আমার ওই কথাগুলো বলা। আর এ তো জানা কথা, ওয়াইফ মার্ডার হলে সমস্ত সন্দেহের তির আগে ছোটে বেচারা হাজব্যান্ডের দিকে।
আর দেরি করলাম না। ফ্ল্যাটের চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখলাম সবাই নাচে, গানে আর গ্লাসে মত্ত। আমার দিকে কারও নজর নেই। তাই টুক করে টাইম মেশিন হাতে টয়লেটে ঢুকে পড়লাম। দরজা বন্ধ করে দিলাম ভেতর থেকে।
কোথায় যেন প্লাগ পয়েন্টটা? ওই তো!
মেশিনটাকে তাড়াতাড়ি সেখানে নিয়ে গেলাম। সুইচ অন করলাম। প্ল্যাটফর্মটা পেতে তার ওপরে উঠে দাঁড়ালাম।
আমার বুকের ভেতরে ডুগডুগি বাজছিল। দমবন্ধ হয়ে আসতে চাইছিল।
মেশিনের ডায়াল সেট করলাম, কিবোর্ডে বোতাম ঠুকতে লাগলাম।
এত ঘামছি কেন কে জানে! আমার মার্ডার স্কিমে তো কোনও ফাঁকফোকর নেই! পারফেক্ট মার্ডার। পারফেক্ট।
এবার নব ঘোরালাম। ‘এন্টার’ বোতাম টিপলাম।
আমাকে দেখে জিনিয়া চমকে উঠল।
‘হাই, জিনি!’
‘তু-তুমি!’ ম্যাগাজিনটা ওর হাত থেকে খসে পড়ে গেল। ও ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল।
‘হ্যাঁ, আমি।’ হেসে ওর কাছে এগিয়ে গেলাম: ‘বললাম যে, এক্ষুনি তোমার কাছে যাচ্ছি। দেখাচ্ছি মজা।’
‘তুমি পার্টিতে যাওনি? সন্তোষপুরে?’
উত্তরে ঝুঁকে পড়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। কপালে একটা চুমু খেলাম। বললাম, ‘আমার টাইম মেশিনের ব্যাপারটা গল্প নয়—সত্যি, জিনি। এই দ্যাখো—’ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দুপাশে দু-হাত ছড়িয়ে দিলাম: ‘আমি—রিয়েল আমি। রক্ত-মাংসের দেবদত্ত রায়চৌধুরী—।’
বিছানার সেই জায়গাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। তোশকের নীচে হাত ঢুকিয়ে হাতুড়িটা বের করলাম।
বেশ ভারী হাতুড়ি। মুন্ডুটা প্রায় পাঁচশো গ্রাম হবে। কারও মুন্ডু গুঁড়ো করার পক্ষে বেশ নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার।
জিনিয়া হাঁ করেছিল। বোধহয় চিৎকার করবে বলে। কিন্তু সেটা করে ওঠার আগেই আমি শূন্যে হাত ঘুরিয়ে সাংঘাতিক মোমেন্টামে হাতুড়িটা ওর মাথায় নামিয়ে আনলাম।
কিন্তু রিফ্লেক্স যাবে কোথায়!
শেষ মুহূর্তে জিনিয়া মাথাটা ইঞ্চিচারেক সরাতে পেরেছিল। তাই আমি ব্রহ্মতালু তাক করলেও হাতুড়িটা শেষ পর্যন্ত ওর মাথার বাঁ-দিক ছুঁয়ে কান ঘেঁষে কাঁধে গিয়ে পড়ল।
ও বাঁ-দিকে কাত হয়ে গেল। ‘দেবু, কী করছ, কী করছ!’ বলে যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল। তারপরই আমাকে অবাক করে দিয়ে ঘরের দরজা লক্ষ্য করে ছুট লাগাল।
এটা আমার ছকের মধ্যে ছিল না। ও যে দৌড়ে পালাতে পারবে সেটা ভাবিনি।
আমি একমুহূর্তে হকচকিয়ে গেলেও পরক্ষণেই ওকে পাগলের মতো তাড়া করলাম। ডবল জামা-প্যান্টের জন্যে ছুটতে বেশ অসুবিধে হচ্ছিল। কিন্তু প্রচণ্ড গোঁ আমাকে ছুটিয়ে নিয়ে চলল। বেশ বুঝতে পারছিলাম, আমার ভেতরের ঠান্ডা খুনিটা আবার জেগে উঠেছে।
দরজার বাইরে বেরিয়ে ও ড্রইং-ডাইনিং-এর দিকে দৌড়তে শুরু করেছিল। তার সঙ্গে-সঙ্গে একটা চিৎকারও শুরু করেছিল।
