সত্যিই তো তাই! ক’দিন পরই তো এগুলো আর দেখতে পাব না!
সোনিকে নিয়েও আমি নতুনভাবে ভাবতে শুরু করলাম। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল ওকে টাইম মেশিনটার কথা বলি। এও ইচ্ছে হচ্ছিল, মাঝরাতে মেশিনে চড়ে ওর বেডরুমে হাজির হয়ে ওকে চমকে দিই। তারপর…।
নাঃ, ওসব বাজে চিন্তা থাক—কাজের চিন্তা করি। মার্ডার নাম্বার থ্রি। দ্য পারফেক্ট মার্ডার।
তিনদিন চিন্তার পর দিনক্ষণ ঠিক করে ফেললাম। সুবীরকে বললাম, আমি একটা পার্টি থ্রো করতে চাই। কিন্তু আমি যে পার্টি দিচ্ছি সেটা জিনিয়ার কাছে সিক্রেট রাখতে হবে—কারণ, ও এসব পছন্দ করে না।
পার্টি দেওয়ার কারণ একটা দেখাতে হয়। তাই সুবীরকে বললাম যে, লাস্ট দু-মাসে আমার ব্যবসায় যাচ্ছেতাইরকমের ‘মেগা’ প্রফিট হয়েছে। আর সোনির সঙ্গে পার্টিতে সময় কাটানোর সুযোগ পাওয়াটা একটা দারুণ ব্যাপার।
উত্তরে সুবীর আমাকে চোখ মারল, ভেংচে বলল, ‘হুঁ—দারুণ ব্যাপার!’
আমি ওর ঠাট্টাটা গায়ে মাখলাম না।
আমারই প্ল্যানমতো সুবীর আমাদের পাড়া থেকে বহুদূরে—সন্তোষপুরে—ওর এক বড়লোক কোলিগের ফ্ল্যাট সাজেস্ট করল। বলল, ‘শেয়ারে রিসক নিয়ে শালা প্রচুর টাকা করেছে। প্রায় তিনহাজার স্কোয়ার ফুটের নতুন এই ফ্ল্যাটটা রিসেন্টলি কিনেছে। তুই ওখানে ফুটবল খেলতে পারবি…।’
সুবীরের সেই কোলিগের নাম তনুময়—ডাকনাম টনি। তো আমি, সুবীর আর টনি মিলে পার্টির সব ব্যবস্থা করতে লাগলাম। জনাপঁচিশ লোককে নেমন্তন্ন করলাম। তার মধ্যে সোনি অবশ্যই ছিল। ওর বাবা-মা-কেও আসতে বললাম। সুবীর আর টনিও ওদের ক্লোজ সার্কেলের ইমপরট্যান্ট বন্ধুদের নেমন্তন্ন করল।
পার্টির চার-পাঁচদিন আগে থেকেই আমি জিনিয়ার সঙ্গে প্রেমিকের মতো ব্যবহার শুরু করলাম। যাতে কেউ বুঝতে না পারে আমাদের সম্পর্কটা আর ঠিকঠাক নেই। কোথাও একটা চোরা ফাটল ধরেছে।
জিনিয়া মাঝে-মাঝে ভুরু কুঁচকে আমাকে দেখত। কয়েকবার বলেও ফেলেছে, ‘তোমার কী হয়েছে বলো তো? সকাল-বিকেল এত মিষ্টি কথা! নিশ্চয় এর পেছনে কোনও মতলব রয়েছে।’
আমি হেসে বলেছি, ‘মতলব আছে। তোমাকে বদলে দেওয়ার মতলব। পুরোনো দিনগুলো আবার ফিরে পেতে চাই আমি।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে ও: ‘সে কি কখনও হয়! দিন বদলায়, মানুষ বদলায়। সেটাই নিয়ম।’
ওরে বাবা! এ যে একেবারে ফিলজফারের ডায়ালগ! যাকগে, হাতে তো আর মাত্র ক’টা দিন!
মার্ডার নাম্বার থ্রি-র পারফেকশানের কথা ভেবে আমি আরও একটা কাজ করেছিলাম। হুবহু একইরকম দেখতে দুটো জামা আর দুটো প্যান্ট কিনেছিলাম। দু-সেটই আমার জন্যে— তবে একটা সেটের সাইজ একটু ছোট, আর-একটা একটু বড়।
ঘটনার দিন জিনিয়াকে বললাম যে, আমার একটা পার্টিতে নেমন্তন্ন আছে—অনেক দূরে, এক্সট্রিম সাউথে। সুবীরের এক বন্ধুর বাড়িতে। ফিরতে রাত হবে।
জিনিয়ার চোখে সন্দেহের ছায়া ফুটে উঠবে জানতাম। তাই উঠল।
আমি হেসে বললাম, ‘যখন খুশি আমাকে ফোন কোরো। যতবার খুশি। আমিও তোমাকে ফোন করব।’
জিনিয়া অবাক হল। খুশিও হল।
ও তো আর জানে না, এই ফোন করার ব্যাপারটাও আমার অ্যালিবাই এস্টাবলিশ করার একটা প্ল্যান!
জিনিয়াকে খুন করার জন্যে আমি এমন একটা দিন বেছে নিয়েছিলাম যেদিন ওর কোনও নাচের রিহার্সাল থাকে না। কারণটা খুবই সহজ। আমি খুনের কোনও সাক্ষী চাই না। খুনের যদি কোনও আই উইটনেস থাকে তা হলে টাইম মেশিনের বাবাও আমাকে বাঁচাতে পারবে না।
আসল দিনটা দেখতে-দেখতে এসে গেল।
সকালবেলা আমি জিনিয়ার চোখ এড়িয়ে একটা হাতুড়ি আমাদের মাস্টার বেডরুমে তোশকের নীচে লুকিয়ে রাখলাম।
বিকেল হতে-না-হতেই টাইম মেশিনটাকে বাক্সে ঢুকিয়ে ভালো করে প্যাক করলাম। তারপর নতুন কেনা ডবল জামা-প্যান্ট পরে প্যাক করা মেশিনটা নিয়ে ট্যাক্সি করে রওনা দিলাম।
টনির বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে ফোনে সুবীরকে ধরলাম। শুনলাম, ও আর টনি খানাপিনার আয়োজন অনেকটা এগিয়ে নিয়েছে।
টনির ফ্ল্যাট তিনতলায়। মেশিনটা সঙ্গে করে লিফটে তিনতলায় উঠলাম। তারপর ফ্ল্যাটের খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। আমার সামনেই টনি আর সুবীর।
প্যাক করা বাক্সটা দেখে ওরা খুব অবাক হল। একগাল হেসে বললাম যে, এর ভেতরে একটা হাই পাওয়ার জেনারেটার আছে। আমার লেটেস্ট ইনভেনশান। আজকের পার্টিতে এই যন্ত্রটার আবিষ্কার আমি অ্যানাউন্স করব।
টনির অনুমতি নিয়ে যন্ত্রটা আমি টয়লেটের কাছাকাছি একটা কোণে রাখলাম। বললাম, যন্ত্রটা এখানে থাক। ওটাকে মাঝে-মাঝে জল ঢালার দরকার হয়—ব্যাটারির মতো। সেরকম কেস হলে ওটা নিয়ে টয়লেটে ঢুকে পড়তে আমার সুবিধে হবে।
ওঃ, কত মিথ্যেই না বলতে হচ্ছে! একটা পারফেক্ট মার্ডারের ঝক্কি কি কম! লাস্ট দশদিন ধরে শুধু মনে-মনে হাজার একটা প্ল্যান ভেঁজে চলেছি। চলেছি আর চলেছি। অবশেষে…।
সুবীর হঠাৎ বলল, ‘অ্যাই, তোর সেই টাইম মেশিনের খবর কী? কদ্দূর এগোলি?’
পলকে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। সামনে আয়না থাকলে নিশ্চয়ই দেখতে পেতাম মুখের সব রক্ত উধাও হয়ে গেছে।
কয়েক সেকেন্ড মরিয়া চেষ্টার পর গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল।
‘ওটা থিয়োরিতেই বস আটকে গেছি। মালটা এখনও তৈরি করতে পারিনি। তোর জেঠুর কাছে আমাকে আবার যেতে হবে।’
