কিন্তু আমি অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় হাত বাড়িয়ে ওর ঘাড়ের গোড়ায় হাতুড়ি বসিয়ে দিলাম। ছুটন্ত জিনিয়া এবং চিৎকার—দুটোকেই মাঝপথে থামিয়ে দিলাম।
‘আঁক’ শব্দ করে জিনিয়া মুখ থুবড়ে পড়ল মেঝেতে।
জিনিয়া উপুড় হয়ে পড়েছিল। ওকে আর চিত হওয়ার সুযোগ দিলাম না। চট করে ওর পাশে হাঁটুগেড়ে বসে পড়লাম। হাতুড়ি দিয়ে এলোপাথাড়ি কাজ করে চললাম। ওর নাচ, সন্দেহ, দ্রৌপদী সিনড্রোম, ফিগার—সব একসঙ্গে থেঁতো হয়ে যাচ্ছিল।
আমার ভেতরে বোধহয় একটা জন্তু ঢুকে পড়েছিল। কারণ, বেশ টের পাচ্ছিলাম, অন্ধ আক্রোশ, রাগ, ঘৃণা, হিংসা—সব আমার মাথার ভেতরে টগবগ করে ফুটছিল। আমি ফোঁস-ফোঁস করে হাঁপাচ্ছিলাম। জিনিয়াকে কখনও মনে হচ্ছিল টিয়াপাখি, কখনও-বা তুলতুলে কুকুর।
কিন্তু একই সঙ্গে আমি ঠান্ডা মাথায় ভাবছিলাম। বাড়ির সদর দরজা বন্ধ। বাড়িতে আর কেউ নেই। বারান্দার দরজাও ভেতর থেকে বন্ধ—খিল ছিটকিনি আঁটা। সুতরাং জিনিয়ার মার্ডার মিস্ট্রির সমাধান করতে পুলিশ হিমসিম খেয়ে যাবে। ইমপসিবল ক্রাইম। লকড রুম মিস্ট্রি। খুনি বাড়িতে ঢুকল কী করে, আর বেরোলই বা কী করে? ঢোকার সময় জিনিয়া যদিও বা দরজা খুলে দিয়ে থাকে, খুন করে চলে যাওয়ার পর জিনিয়ার পক্ষে তো আর দরজা বন্ধ করে খিল-ছিটকিনি এঁটে দেওয়া সম্ভব নয়!
মনে-মনে হাসি পেয়ে গেল আমার। পুলিশ আমাকে সন্দেহ করে প্রচুর জিজ্ঞাসাবাদ করবে, কিন্তু কিছুই করতে পারবে না। আমি হাতুড়িটা হাতে নিয়ে হাঁপাতে-হাঁপাতে উঠে দাঁড়ালাম। পকেট থেকে রুমাল বের করে ওটার হাতলটা ঘষে-ঘষে মুছে দিলাম। তারপর ওটাকে একপাশে ফেলে দিলাম।
জিনিয়ার বডিটা মেঝেতে উপুড় হয়ে লেপটে রয়েছে। ওর মাথা থেকে রক্ত চুঁইয়ে-চুঁইয়ে মেঝেতে গড়িয়ে যাচ্ছে। দু-তিনটে মাছি কোথা থেকে যেন এসে ওড়াউড়ি শুরু করেছে। ডিসগাস্টিং মেস।
রক্ত ছিটকে আমার জামা-প্যান্টেও লেগেছে। কিন্তু তার জন্যে চিন্তার কোনও কারণ নেই। ওই যে বলেছি, ডবল জামা-প্যান্ট।
টনির ফ্ল্যাটের টয়লেটে ফিরে ওপরের রক্ত মাখা জামা আর প্যান্ট খুলে ফেলব। ওগুলো টাইম মেশিনের বাক্সের মধ্যে লুকিয়ে রাখব। তারপর মেশিনের সঙ্গে প্যাক করে নিয়ে সোজা বাড়ি।
এবারে আর জামা-প্যান্ট পোড়ানোর গন্ধ পেয়ে কেউ আমাকে বিরক্ত করতে আসবে না।
জিনিয়ার ডেডবডির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হল, ওর নাচের প্রোগ্রামগুলোর এখন তা হলে কী হবে?
আর ঠিক তখনই ‘মিঁয়াও-মিঁয়াও’ ডাক শুনতে পেলাম।
আচমকা ডাকে চমকে তাকিয়ে দেখি গিনিপিগ। কোথায় ছিল কে জানে! আদরের মালকিনের খোঁজে বেরিয়ে এসেছে। তারপর জিনিয়ার রক্ত মাখা ডেডবডির কাছে গিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে গন্ধ শুঁকছে আর মিঁয়াও-মিঁয়াও’ করে ডাকছে।
হঠাৎই বেড়ালটা মেঝেতে পড়ে থাকা রক্তের ওপরে মাথা নামাল। জিভ বের করে চাটতে শুরু করল।
আমার গা ঘিনঘিন করে উঠল। ওটাকে ‘হুস-হুস’ করে তাড়াতে চেষ্টা করলাম।
বেড়ালটা সবুজ চোখে সরাসরি তাকাল আমার দিকে। এবং কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ ‘হোঁয়াও’ করে বিকট ডেকে উঠে আমার বুক লক্ষ্য করে হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
তারপরই হুউস।
টনির হলঘরে আমি সার্কাসের জোকারের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছি। রক্ত মাখা জামাকাপড়ে একটা বেড়ালের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছি। আমাকে ঘিরে ঝকঝকে পোশাক পরা গেস্টের দল। পাগল করা ছন্দে ঝিনচ্যাক মিউজিক বাজছে। সেই তালে তাল মিলিয়ে সবাই এলোমেলো পা ফেলে নাচছে।
আমাকে দেখামাত্রই পলকে মিউজিক থেমে গেল। নাচ থামিয়ে সবাই যেন ফ্রিজ শট হয়ে গেল। আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে সবাই। তাদের অবাক গোল-গোল চোখে নীরব প্রশ্ন।
আমার মাথা কাজ করছিল না। শুধু বুঝতে পারছিলাম আমার বাড়ির মাস্টার বেডরুম থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলাম বলে ফিউচারে পৌঁছে আমার পজিশান বদল গিয়েছিল। সেইজন্যে টাইম মেশিন আমাকে ঠিকঠাক টয়লেটের ভেতরে ফেরত নিয়ে আসার বদলে এই হলঘরে এনে হাজির করেছে।
এ ছাড়া সঙ্গে রয়েছে এই হতচ্ছাড়া পাগল বেড়ালটা। আঁচড়ে কামড়ে আমাকে অস্থির করে তুলেছে। আর আমার জামা-প্যান্টের এখানে ওখানে লেগে রয়েছে রক্ত—জিনিয়ার রক্ত।
ওদের সাফাই দেওয়ার চেষ্টা করে আর কোনও লাভ নেই। টয়লেটের দরজা ভাঙলেই টাইম মেশিনটা ওরা দেখতে পাবে। তারপর…।
সোনি হাঁ করে আমাকে দেখছিল। হঠাৎই ও তীক্ষ্ন গলায় চিৎকার করে উঠল। তার সঙ্গে আরও দু-একজন মহিলা গলা মেলাল।
অপমানে, ক্ষোভে, লজ্জায় আমার চোখে জল এসে গেল। এরই নাম পারফেক্ট মার্ডার! ছিঃ!
তাই আপনাদের হাতজোড় করে একটা রিকোয়েস্ট করছি। টাইম মেশিন হাতে থাকলেও কখনও খুন করবেন না। প্লিজ!
টিরা গ্রহের ভয়ংকর (নভেলেট)
০১. প্রথম দুর্ঘটনা
অন্ধকার মহাকাশে মিটমিট করে জ্বলছে অসংখ্য নক্ষত্র। যেন দেওয়ালির উৎসব শুরু হয়েছে চারিদিকে। মহাকাশযান সোলার ছুটে চলেছে অন্ধকারের বুক চিরে। লক্ষ্য পৃথিবীর কক্ষপথ। সুদীর্ঘ অভিযান শেষ করে সোলার ঘরে ফিরে চলেছে।
অশোক চিরিমার নেভিগেশান প্যানেলের দিকে তাকিয়ে বসে ছিল। মুখ-চোখ ফ্যাকাশে। মহাকাশ-মানচিত্র খুঁটিয়ে দেখতে চেষ্টা করছে ও। হঠাৎই ওর গোটা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। শরীরে কেমন একটা অস্বস্তি। বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠছে।
