তাই তো ওকে টাইম মেশিনটার কথা এখনও বলিনি! শুনলে ওর একেবারে তাক লেগে যাবে। দুনিয়ার লোককে বলে বেড়াবে।
হঠাৎ জিনিয়া এসে ঘরে ঢুকল। বোধহয় কংক্রিট এভিডেন্সের খোঁজে।
‘কী ব্যাপার? আমার পায়ের আওয়াজ পেয়েই ফোন কেটে দিলে?’
আমি যেন ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। মাথাটা কেমন ফাঁকা লাগছিল। জিনিয়ার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। কোনও উত্তর দিতে পারলাম না।
‘চমৎকার অভিনয় করতে পারো তো!’ জিনিয়া নাচের বিভঙ্গে একটা হাতের ভর কোমরের নীচে রাখল: ‘আমি ও-ঘরে রিহার্সাল করছি আর তুমিও বেডরুমে বসে রিহার্সাল চালিয়ে যাচ্ছ…?’
আমি জিনিয়ার দিকে শূন্য চোখে তাকিয়েই রইলাম। পাশের ঘর থেকে টেপরেকর্ডারের মিউজিক ভেসে আসছিল। আর সেই তালে-তালে আমি তিননম্বর মার্ডারটার কথা ভেবে চললাম। কবে, কখন, কী কায়দায় ফাইনাল মার্ডারটা এক্সিকিউট করব সেসবের মেজর পয়েন্টস হাতড়ে চললাম।
সোনি ঠিকই বলেছে। এবারে আগুনে সত্যি-সত্যি হাত দেব। আমি আর ছোট নেই।
‘…আর রিহার্সাল দিয়ে কী হবে? বহুদিন তো রিহার্সাল হল—এবার আসল কাজে নেমে পড়ো। তুমি তো জানো না…।’
জিনিয়া কথা বলেই যাচ্ছিল—তবে গলার স্বর তোলেনি। চাপা, হিসহিসে। কারণ, পাশের ঘরে ওর নৃত্য-ছাত্ররা রয়েছে।
আমি উদাসীন সাধুর চোখে ওকে দেখতে লাগলাম। আশ্চর্য! কী সহজেই না ও নিজের শেষ সুনিশ্চিত করছে!
যখন ও ঘর থেকে বেরিয়ে গেল তখন আমার মনে আর কোনও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই।
নেক্সট স্টেপ, মার্ডার নাম্বার টু। সেকেন্ড রিহার্সাল। তারপর ফাইনাল স্টেপ, মার্ডার থ্রি। পারফেক্ট মার্ডার। ব্যস। নৃত্যনাট্যের যবনিকা।
দ্বিতীয় মার্ডারের ভিকটিম হিসেবে আমি একটা লোমওয়ালা পোষা কুকুরকে বেছে নিলাম। প্রথমে পাখি। তারপর কুকুর। তারপর…।
আমাদের বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে একটা তিনতলা বড় বাড়ি আছে। বাড়ির নীচে একটা বড় মাপের ওষুধের দোকান। দোকানটার নাম ‘মেডিকো’। বাড়ি এবং দোকানের মালিক একই লোক। ভদ্রলোকের চেহারা বেশ ফুলবাবুর মতো। মাথায় বাবরি চুল, চোখে মেটাল ফ্রেমের চশমা, শৌখিন গোঁফ, কানে আতর মাখানো তুলো গোঁজা, পরনে সবসময় ধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবি।
এই বাবুটির একটি শখের কুকুর আছে। গায়ে বড়-বড় সাদা লোম, ঝিরকুটে চেহারা। সবসময়েই এদিক ওদিক চঞ্চলভাবে ঘুরঘুর করছে আর গন্ধ শুঁকছে।
আমি বাড়িটার খোঁজখবর নেওয়া শুরু করলাম। শুনলাম, রাতে কুকুরটা ছাড়া থাকে। ডবল তালা দেওয়া কোলাপসিবল গেটের ওপিঠের চৌকো চাতালে ওটা সারারাত পায়চারি করে।
প্ল্যান ছকে নিতে কোনও অসুবিধে হল না।
বড়বাজারে গিয়ে একটা ছ’ইঞ্চি ফলার ছুরি কিনলাম। তারপর দোকান থেকে শিককাবাব কিনে তাতে র্যাটকিলার আর ঘুমের ওষুধ গুঁড়ো করে বেশ ভালো করে মাখিয়ে দিলাম। এবং রাত ঠিক একটার সময়ে টাইম মেশিনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে রওনা হলাম।
আমি ভবিষ্যতে পাড়ি দিলাম মাত্র কুড়ি সেকেন্ডের জন্যে। আর সেফটি ফ্যাক্টর বাড়ানোর জন্যে হালকা ছদ্মবেশ নিলাম। একটা পাওয়ার ছাড়া রেডিমেড চশমা কিনে এনেছিলাম। সেটা চোখে দিলাম। আর মাথায় পাগড়ির ধাঁচে একটা লাল গামছা জড়িয়ে নিলাম।
ছোট মাপের কুকুরগুলো লোক দেখলেই কেঁউকেঁউ করে চেঁচায়। তাই কুড়ি সেকেন্ডের বেশি সময় আমি কুকুরটার সামনে থাকতে চাইনি।
আমি অন্ধকারে চাতালে আচমকা হাজির হতেই কুকুরটা হকচকিয়ে গেল। তারপরই একটা ছোট্ট চিৎকার করল। সঙ্গে-সঙ্গে শিককাবাবের টুকরোগুলো সাদা প্রাণীটার সামনে ছড়িয়ে দিলাম। ওটা গন্ধ শুঁকতে মুখ নীচু করল। একটুকরো মাংস কপ করে মুখে তুলে চিমোতে শুরু করল।
আর দেরি করলাম না। আমার মধ্যে একটা কসাই জেগে উঠল। চোখের পলকে কুকুরটার গলায় ছুরি ঢুকিয়ে দিলাম। বাঁ-হাতে ওটার নরম শরীর চেপে ধরলাম মেঝেতে। ছুরিটা টেনে বের করে বসিয়ে দিলাম আবার। আর-একবার।
ছোট্ট একটা আর্তনাদ। রক্ত। সব শেষ।
বাড়ির মধ্যে কোথায় যেন একটা আলো জ্বলে উঠল।
ততক্ষণে আমার কুড়ি সেকেন্ডও শেষ। হুউস।
গ্যারাজে ফিরে দেখলাম আমার মাথায় গামছাটা নেই। কখন যেন খসে পড়ে গেছে। আর আমার জামা-প্যান্টে বেশ খানিকটা রক্তের ছিটে।
আমি উত্তেজনায় কাঁপছিলাম, হাঁপাচ্ছিলাম।
চশমাটা চোখ থেকে খুলে ফেললাম। একতলার গেস্ট রুমে ঢুকে রক্তের ছিটে লাগা জামা-প্যান্ট ছেড়ে ফেললাম। তারপর বাথরুমে স্নান করতে ঢুকলাম। কালো চশমা আর জামা-প্যান্ট দুটোর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করতে হবে। আগের বারের শার্ট পোড়ানোর মতো বোকামি আর আমি করছি না।
ফেলে আসা গামছাটা নিয়ে আমার একটু দুশ্চিন্তা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চিন্তাটাকে ঝেড়ে ফেলতে পারলাম।
দ্বিতীয় ‘খুন’টার পর বেশ টের পেলাম আমার ইগো আর কনফিডেন্স, দুটোই অনেক বেড়ে গেছে। আমি যেন এক নতুন ‘আমি’। কী সহজেই না আমি টিয়াপাখিটাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছি! তুলতুলে কুকুরটার গলায় নৃশংসভাবে ছুরি বসানোর সময়েও আমি কী অদ্ভুতভাবে মাথা ঠান্ডা রেখেছিলাম। তা হলে কি আমার ভেতরে একটা ঠান্ডা খুনি ঘুম থেকে ধীরে-ধীরে জেগে উঠছে?
নতুন করে আবার মনে হল, আমি ভগবানের কাছাকাছি। এবং সেই হাই লেভেল থেকে আমি রোজ জিনিয়াকে লক্ষ করে চললাম। ওর হাঁটা-চলা, কথা বলা, নাচের রিহার্সাল, বাথরুম থেকে স্নান সেরে বেরিয়ে আসার ভঙ্গি—সবই এক অদ্ভুত তৃষ্ণা নিয়ে দেখতে লাগলাম। যেন এই শেষবারের মতো দেখছি।
