আমি আর দাঁড়ালাম না। সদর দরজার খিল-ছিটকিনি খুলে চট করে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। তোয়ালের ওপর দিয়েই পাখিটার গলা টিপে ধরলাম। কয়েক সেকেন্ডেই ওটার ছটফটানি শেষ। তোয়ালেসমেত পাখিটা রাস্তায় ফেলে দিলাম।
আমি বেশ অবাক হয়ে গেলাম। আমার মধ্যে এতটা হিংস্রতা লুকিয়ে ছিল আগে বুঝিনি। নিরীহ অবোলা জীবটাকে কী সহজেই না আমি নিকেশ করে দিলাম!
পথের একটা নেড়ি কুকুর আমাকে দেখতে পেয়ে ঘেউঘেউ করে উঠল। সঙ্গে-সঙ্গে আমার দশমিনিটের কোটাও শেষ হল। হুউস।
গ্যারাজের বদলে আমি বাড়ির ছাদে এসে ল্যান্ড করলাম।
সর্বনাশ করেছে! ছাদের দরজা তো বাড়ির ভেতর থেকে বন্ধ করা থাকে! তা ছাড়া বাড়তি সুরক্ষার জন্যে যে-কোলাপসিবল গেট আছে সেটাতেও তালা।
অগত্যা ছাদেই শুয়ে পড়লাম। সকালে জিনিয়ার সঙ্গে একপ্রস্থ লড়াইয়ের জন্যে মনে-মনে তৈরি হলাম।
কিন্তু আশ্চর্য! লড়াইটাকে এমনভাবে এড়িয়ে যেতে পারলাম যে, আমার বিশ্বাস হতে চাইছে না।
সকালে ধাক্কাধাক্কি করে বাড়ি মাথায় করতেই জিনিয়া ঘুম-চোখে এসে দরজা খুলল। ওকে বললাম যে, রাতে টাইম মেশিন দিয়ে উলটোপালটা এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়েই আমার এই দুর্দশা। মেশিনটা সবসময় গন্ডগোল করছে।
ও ঠান্ডা গলায় বলল, ‘মেশিনের আর দোষ কী! যেমন ইনভেন্টর, তেমনই ইনভেনশান।’
আমার সামনে অনেক বড় প্ল্যান। তাই খোঁচটা হজম করে গজগজ করে আপনমনেই মন্তব্য করলাম, ‘যদি আর একমাসের মধ্যে একে ঠিকঠাক করে তৈরি করতে না পারি তা হলে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে মডেলটাকে ডেসট্রয় করে ফেলব।’
‘বাঁচা যাবে।’ বলে জিনিয়া সিঁড়ি নামতে শুরু করল।
আমি তখন প্রথম খুনের সাফল্যে ভেতরে-ভেতরে টগবগ করে ফুটছি।
সতু পরদিন আমাকে টিয়াপাখি হত্যার করুণ কাহিনি শোনাল। বলল, বাড়ির কোনও জিনিস চুরি যায়নি—শুধু পাখিটাকে গলা টিপে মেরে বাইরের রাস্তায় কে যেন ফেলে দিয়ে গেছে। পাখিটার পাশে একটা বাদামি রঙের নতুন তোয়ালে পাওয়া গেছে।
‘খুনি’ কী করে বাড়িতে ঢুকল সেটা কারও মাথায় ঢুকছে না। আর কেনই-বা বেচারি পাখিটাকে গলা টিপে মারল সেটাও এক রহস্য।
আমি সতুর কাহিনি শুনছিলাম আর মনে-মনে ফুলছিলাম। ইগো বুস্ট বোধহয় একেই বলে! ক্ষমতায় নিজেকে ভগবানের কাছাকাছি মনে হচ্ছিল। আমার প্রথম মার্ডার সাকসেসফুল।
ঠিক করলাম, সিরিজের দ্বিতীয় খুনটা দিন-সাতেক পরে করব। তবে এবারে আর পাখি-টাখি নয়— বরং চারপেয়ে কিছু। আসলে একটু-একটু করে এগোনো দরকার। তারপর…।
সোনি আমাকে এক রবিবার সন্ধেবেলা ফোন করল।
‘হাই, ইনভেন্টর! কেমন আছেন?’
‘ভালো। আপনি কেমন আছেন?’
‘ফাইন। এখন কী করছেন?’
আমি বেডরুমে বিছানায় বসে খবরের কাগজের সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির পাতাটা খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে পড়ছিলাম। আমার আবিষ্কারগুলোর কথা যেদিন সবাইকে অফিশিয়ালি জানাব সেদিন এই পৃষ্ঠাতেই আমার ফটোগ্রাফ থাকবে, নিউজ থাকবে। টিভির নানান চ্যানেলে আমার ইন্টারভিউর লাইভ টেলিকাস্ট হবে।
আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। সোনি প্রশ্নটা আবার করতেই ঘোর কাটল। বললাম যে, আমি খবরের কাগজ পড়ছি।
‘বলুন না, নতুন কী ইনভেন্ট করছেন—মানে, কী নিয়ে এখন রিসার্চ করছেন।’
‘একটা ইনসেক্ট রোবট তৈরি করার চেষ্টা করছি—যেটা সাইজে সাবান-টাবানের মতো হবে, আর টুকিটাকি জিনিস কুড়িয়ে নিয়ে আসতে পারবে। যেমন, বোতলের ছিপি, খুচরো পয়সা, পেনের ক্যাপ বা কাগজের টুকরো—মেঝেতে পড়ে এসব জিনিস উড়ে গেলে বা ছিটকে গেলে মেশিনটা সেটা কুড়িয়ে নিয়ে আসবে। মানে, মেঝেতে জিনিসটা প্রথম যেখানে পড়ছে সেই ইমপ্যাক্ট পয়েন্টে জিনিসটাকে পৌঁছে দেবে।’
‘ওঃ, গ্রেট! খুশিতে ফেটে পড়ল সোনি: ‘এই রোবটটা দারুণ কাজের জিনিস হবে।’
‘আপনি এখন কী করছেন?’
‘কী আর করব, ফিস্ক্যাল পলিসি নিয়ে স্টাডি করছি। এত বোরিং টপিক—ভাবা যায় না।’
‘বোর হয়ে গেলে অন্য কোনও বই পড়ুন—ল্যাপটপ খুলুন, নয়তো টিভি দেখুন—।’
‘দুর! ওসব ভাল্লাগে না। আপনাকে আমার হিংসে হয়।’
‘কেন?’
‘আপনার কাজটা কী ইন্টারেস্টিং। আমাকে আপনার ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট করে নিন না।’
সোনি হালকাভাবে কথাটা বললেও আমার বুকের ভেতরে মেঘ ডেকে উঠল। জিনিয়া।
তখনই মনে পড়ে গেল, পাশের ঘরে—মানে ড্রইং-ডাইনিং-এ—জিনিয়ার রিহার্সাল চলছে। চারটে ছেলেমেয়ে এসেছে। সামনের মাসে কী একটা যেন জয়ন্তী টাইপের আছে। তার জন্যে প্রবল প্র্যাকটিস চলছে।
‘এসব কথা মুখেও আনবেন না, সোনি। আপনি আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট হলে আমার বাড়িতে আগুন জ্বলে যাবে। আপনাকে তো আগেই বলেছি—জিনিয়া-ম্যানিয়া…।’
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল সোনি। তারপর বেশ সিরিয়াস গলায় বলে উঠল, ‘আগুনে একটা হাত-টাত দিতে শিখুন। আপনি তো আর ছোট নেই।’
তারপরই ‘রাখছি’ বলে ফোন কেটে দিল।
এটা কী কথা বলল সোনি?
‘আগুনে একটু হাত-টাত দিতে শিখুন। আপনি তো আর ছোট নেই।’
আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। এভাবে কখনও আমি ভাবিনি। সোনি আমার খুব ভালো বন্ধু। আমার আবিষ্কারের জেনুইন অ্যাডমায়ারার। ওর সঙ্গে কথা বলে আমি কাজে নতুন উৎসাহ পাই। ও যেভাবে বলে ‘দেখবেন, আপনি একদিন ওয়ার্ল্ড ফেমাস হয়ে যাবেন—’ সেটা সত্যি-সত্যি বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। তার সঙ্গে সোনি অবশ্য এও বলে, ‘সেদিন আমাকে ভুলে যাবেন না তো?’
